তপেশবাবু কিছু বলার আগেই আমি বলে উঠলুম,–কর্নেল! কর্নেল! আপনি সামরিক জীবনে অনেকবার বিষাক্ত সাপের পাল্লায় পড়েছেন, তা জানি। কিন্তু এখন আপনার হাতে শুধু একটা স্পটলাইট আর রিভলভার। আপনি আমাকে বলেছিলেন, একটা লাঠির সাহায্যে কতবার বিষাক্ত সাপ ধরেছেন। কিন্তু এখন লাঠিও তো নেই।
তপেশবাবু ব্যস্তভাবে বললেন,–খেলা করে সময় নষ্ট করার অর্থ হয় না কর্নেলসায়েব! আমরা এখানে সাপের সঙ্গে খেলা করতে আসিনি!
কর্নেল তার কথা গ্রাহ্য করলেন না। বললেন, আপনার বেটনটা কোমরে ঝুলিয়ে রেখেছেন। ওটাই সাপ ধরার পক্ষে যথেষ্ট! বেটনটা দিন আমাকে।
ও.সি. তপেশ সান্যাল বিরক্ত হয়ে বললেন,–এই নিন। কিন্তু এটা লাঠির চেয়ে ছোট।
কর্নেল বললেন,–কেরালার বেদেরা এইটুকু লাঠি দিয়েই বিষাক্ত সাপ ধরে। দেখুন না আপনি শুধু স্পটলাইটটা নিয়ে আমার পাশে এসে সাপটার ওপর আলো ফেলুন।
এতক্ষণে আমি চিত্রবিচিত্র ফণা তোলা সাপটাকে দেখতে পেলুম। ফণাটা একটু-একটু দুলছে। শিউরে উঠলুম।
কর্নেল গুঁড়ি মেরে বাঁ-হাতে বেটন এবং ডান হাতে রিভলভার নিয়ে সাপটার সামনে প্রায় দুমিটার তফাতে হাঁটু ভাজ করে বসলেন। তারপর আমাদের অবাক করে হেসে উঠলেন। বললেন, –এটাকে এমনভাবে দেখতে পেয়েছিলুম, যেন ঝাঁপ দিয়ে এগিয়ে আসছে। তা এগিয়ে আসতেই পারে। কারণ সাপটা চড়াই থেকে উতরাইয়ে নেমেছে।
কথাগুলো বলেই তিনি এগিয়ে গিয়ে সাপটার মাথা ধরলেন। তপেশবাবু বললেন,– এ কী!
কর্নেল সহাস্যে বললেন, সত্যিকার সাপ নয়। রবারের তৈরি খেলনা সাপ! কেউ অন্ধকার থেকে জোরে এই খেলনা সাপটা আমাদের দিকে ছুঁড়ে ফেলেছে, যাতে আমরা ভয় পাই। হাসে আমাদের দেরি করিয়ে দিতে চেয়েছে। সে জানে, আমরা গুলি করে সাপটা মারব। কিন্তু সে জানে না, জঙ্গলের মধ্যে সুড়ঙ্গের অন্য দরজার আড়ালে আমাদের লোক ওত পেতে আছে।
কর্নেল বেটনটা ও.সি. তপেশবাবুকে ফেরত দিয়ে স্পটলাইট নিয়ে দ্রুত হাঁটতে থাকলেন। তপেশবাবু বললেন,–একটা কথা বুঝতে পারছি না। জন্তুটা তো জঙ্গলে সুড়ঙ্গের দরজায় গিয়ে দেখে আসতে পারে, কেউ সত্যি ওত পেতে আছে কি না।
কর্নেল বললেন,–জঙ্গলে এখনও দিনের আলোে আছে। সে দিনের আলোয় বেরুতে চায় না। অবশ্য তার মালিক কৃষ্ণকান্ত অধিকারী থাকলে অন্য কথা!
তপেশবাবু বললেন,–ওটা কেষ্টবাবুর পোষা জন্তু?
–হ্যাঁ! এবার কিন্তু সাবধান! মনে হচ্ছে, সামনে এবার ওপরে ওঠার সিঁড়ি আছে! কর্নেল কয়েক পা এগিয়ে গিয়ে স্পটলাইট জ্বেলে উপরদিকে আলো ফেললেন। ওদিকের মতো এদিকেও সিঁড়ি দেখতে পাচ্ছিলুম।
তপেশবাবু উপরদিকে তাকিয়ে বললেন,–কর্নেল! শিম্পাঞ্জি বা গরিলাটাকে দেখতে পাচ্ছি। কিন্তু ব্যাটাচ্ছেলে আর গর্জন করছে না কেন?
কর্নেল সিঁড়ির ধাপে সাবধানে পা ফেলে উঠতে-উঠতে বললেন,–গর্জন করছে না, তার কারণ গর্জন করে-করে তার গলা ফেঁসে গেছে। ওই দেখুন, সে উঠে যাচ্ছে।
সিঁড়ি বেয়ে দশ-বারোটা ধাপ উঠেছি, উপরে আচমকা গুলির শব্দ এবং হইহল্লার শব্দ শোনা গেল। কর্নেল বললেন,–সর্বনাশ! সাব-ইন্সপেক্টর মিঃ রক্ষিত বা কনস্টেবল ওটাকে গুলি করে মারল নাকি?
তপেশবাবু বললেন,–ওঁদের গুলি করতে নিষেধ করে গেছি। সম্ভবত শূন্যে গুলি ছুঁড়ে জন্তুটাকে ভয় দেখালেন মিঃ রক্ষিত। রিভলভারের গুলির শব্দ মনে হল।
কর্নেল বললেন,–বেচারা হাড়মটমটিয়া বিপদে পড়ে গেছে। ওই দেখুন! সিঁড়িতে দাঁড়িয়ে আমাদের কাছে করজোড়ে প্রাণভিক্ষা করছে।
অবাক হয়ে দেখলুম,–গরিলা বা শিম্পাঞ্জির মতো প্রাণীটা দু-হাত জোড় করে দাঁড়িয়ে আছে। স্পটলাইটের আলোয় তার দু-হাতের ধারাল নখগুলো ঝকমক করছে। দুটো দাঁত মুখের দুধারে বেরিয়ে আছে। দাঁতদুটো বাঁকা ধারাল তীক্ষাগ্ৰ ছুরির মতো।
তপেশবাবু বললেন,–কর্নেলসায়েব! পোষা জন্তুরা মালিকের হুকুমে অনেক কসরত দেখাতে পারে। ব্যাটাচ্ছেলের প্রণামের ভঙ্গিটাও শেখানো। কিন্তু আমরা ভুল করেছি। ল্যাসো বা দড়ির ফঁস কিংবা খাঁচার ব্যবস্থা করা যেত, যদি বন্যপ্রাণীসংরক্ষণ বিভাগে খবর দিয়ে আসতুম। এই অবস্থায় ওটাকে কীভাবে ধরবেন বুঝতে পারছি না।
কর্নেল একটু হেসে বললেন,–ধরা দেওয়া ছাড়া উপায় নেই, তা সে বুঝে গেছে। এখন সে নিজের প্রাণভিক্ষা চাইছে। আসুন! রিভলভার তৈরি রেখে আমার পিছনে আসুন। বাবা হাড়মটমটিয়া আমাদের ওপর ঝাঁপ দিতে এলেই তিনটে গুলি তাকে যমের বাড়ি পাঠিয়ে দেব, এটুকু কি সে জানে না?
বলে তিনি জন্তুটার দিকে মুখ তুলে হাসলেন,–ঠাকুরবাবা! ওহে বাবা হাড়মটমটিয়া! ওপরে উঠে যাও। তোমাকে কেউ গুলি করে মারবে না। তুমি ওঠে গিয়ে মিঃ রক্ষিতের সামনে নমো করো গে! ওঠো! ওঠো!
মনে হল, কৃষ্ণকান্ত অধিকারীর পোয্য প্রাণী। তাই মানুষের কথা বোঝে। প্রাণীটা ওপরে উঠে গেল। মিঃ রক্ষিতের গর্জন শুনতে পেলুম,–এক পা এগিয়ো না বলছি! আশ্চর্য তো এটা কি বনমানুষ!
কর্নেল সুড়ঙ্গের দরজার মুখে গিয়ে বললেন,–মিঃ রক্ষিত! আশ্চর্যই বটে! না-না ও পালাবে না। ও জানে, এবার পালানোর চেষ্টা করলেই ওর ঠ্যাং ভেঙে যাবে।
কর্নেল বেরিয়ে যাওয়ার পর তপেশবাবু, তারপর আমি বেরোলুম। জঙ্গলে এখন দিনের শেষে বিবর্ণ আলো আর ঠান্ডা হিম বাতাস। চির অন্ধকারের জগত থেকে প্রাণ নিয়ে ফিরতে পেরেছি এবং চেনা পৃথিবীতে ফিরে এসেছি। বুকভরে নিশ্বাস নিলুম। তারপর জন্তুটার দিকে তাকালুম।
