এই স্তূপটা একটা ছোট্ট ঘরের ধ্বংসাবশেষ। ছাদের একটা অংশ টিকে আছে। ছাদের ওপর থেকে ঘন লতাপাতা নেমে এসেছে। কর্নেল ইশারায় তপেশবাবুকে ডেকে কী একটা দেখালেন। উঁকি মেরে দেখলুম, লতাপাতার নিচে কাশঝোঁপের ওপর কয়েকটা কালো লোম। এরকম লোম কর্নেলের সঙ্গে এসে একটা গুহার মতো জায়গায় দেখেছিলাম।
তপেশবাবু কাশঝোঁপের দিকে তাকিয়ে চাপাস্বরে বললেন,–জন্তুটার পায়ের চাপে কাশঝোঁপের মাঝখানটা বেঁকে গেছে।
কর্নেল ঠিকই বলেন, জয়ন্ত! তুমি বোঝো সবই। তবে বড্ড দেরিতে।
আজ বিকেলের রোমাঞ্চকর অ্যাডভেঞ্চারের উদ্দেশ্য এতক্ষণে স্পষ্ট হল আমার কাছে। কিন্তু অজানা আতঙ্কে বুকের ভেতরটা কেমন করে উঠল।
কর্নেল চাপাস্বরে বললেন,–আর কোনও কথা নয়। আপনারা সবাই সশস্ত্র। কিন্তু একটা কথা বলে রাখি, যা কিছু ঘটুক, গুলি ছুড়বেন না। স্পটলাইটটা আমাকে দিন। আমি আগে নামব। আমার পাশে তপেশবাবু থাকবেন। পিছনে কনস্টেবল নরসিংহ আর জয়ন্ত। সবার পিছনে সুরেন। জয়ন্ত! তোমার আর্মস বের করো। কিন্তু গুলি ছুড়বে না।
লতাপাতার ঝালর সরিয়ে দিলেন কর্নেল। দেখলুম, প্রায় ছফুট উঁচু এবং ফুট চারেক চওড়া একটা চতুষ্কোণ পাথরের দরজা। কিন্তু কপাট নেই। কর্নেল একটু থেমে খুব চাপাস্বরে বললেন,–কত ফুট নামতে হবে জানি না। এই সুড়ঙ্গপথটা নদীর তলা দিয়ে গেছে।
তপেশবাবু আস্তে বললেন, আমার অনুমান, অন্তত তিরিশ ফুট নামতে হবে। সিঁড়ি কিছুটা খাড়া হতে পারে।
কর্নেল উঁকি মেরে দেখে বললেন,–হ্যাঁ। পঁয়তাল্লিশ ডিগ্রি কোণ সৃষ্টি করেছে সিঁড়ি। সাবধান! যেন পা স্লিপ করে না কারও। তাড়াহুড়োর দরকার নেই। আমরা খুব আস্তেসুস্থে আর যতটা সম্ভব নিঃশব্দে নামব। একটানা আলো জ্বালব না। দুপাশের দেওয়ালে একটা হাত রেখে নামতে হবে। পাশাপাশি দুজন।
আমি বুঝতে পারছিলুম না কেন কর্নেল বারবার গুলি ছুঁড়তে নিষেধ করছেন। সেই ভয়ঙ্কর হিংস্র শিম্পাঞ্জি জাতীয় প্রাণীটার নখ যে তীক্ষ্ণ, তার প্রমাণ পাওয়া গেছে। সে আক্রমণ করলেও কি চুপ করে থাকতে হবে?
কর্নেল ও তপেশবাবু নামবার মুখে পিছু ফিরে সুরেনকে দেখে নিলেন। সে ধারালো লম্বা দা হাতে নিয়ে নির্বিকার মুখে এগিয়ে এল। কর্নেল একবার স্পটলাইট ফেলে নিচের ধাপগুলো দেখে নিয়ে শুধু বললেন,–বাঃ!
মসৃণ এবং ফুটখানেক চওড়া কালো পাথরের সিঁড়ি একঝলক দেখে নিয়ে আবার গা শিউরে উঠল। কুয়োর মধ্যে নামলে হয়তো মানুষের এমন একটা অস্বস্তিকর অনুভূতি হয়। তারপর নামছি তো নামছি। প্রতিমুহূর্তে আশঙ্কা হচ্ছে, সুড়ঙ্গটা ধসে যাবে না তো?
গুনে-গুনে চল্লিশটা ধাপ নামার পর কর্নেল কয়েক সেকেন্ডের জন্য স্পটলাইটটা আবার জ্বাললেন। এবার সমতল মসৃণ পাথরের পথ। তারপর কর্নেল আবার স্পটলাইট জ্বাললেন। চোখে পড়ল দেওয়াল ঘেঁসে কয়েকটা কাঠের পেটি সাজানো। তপেশবাবু ফিসফিস করে বললেন,–এ কার গোডাউন?
তারপরই কানে তালা ধরে গেল বিকট সেই গর্জনে–আঁ—আঁ—আঁ–আঁ!
.
দশ
সেই গভীর সুড়ঙ্গের অমানুষিক ভয়ঙ্কর গর্জন প্রতিধ্বনিত হয়ে একটা বিভীষিকা সৃষ্টি করেছিল। আমরা থমকে দাঁড়িয়ে গিয়েছিলুম। কিন্তু তারপরই গর্জনটা থেমে গেল। কর্নেল স্পটলাইটের আলো ফেলেছিলেন সামনের দিকে। জন্তুটা শিম্পাঞ্জিই হোক, কিংবা আদিবাসীদের ‘ঠাকুরবাবা’ হাড়মটমটিয়া থোক, তীব্র আলোর নাগাল থেকে সম্ভবত দূরে সরে গেল।
কর্নেল স্পটলাইট নিভিয়ে দিলে ও.সি. তপেশবাবু টর্চ জ্বালালেন। তারপর তিনি সুড়ঙ্গপথে বাঁদিকের দেওয়াল ঘেঁসে রাখা থাক-বন্দি পেটিগুলো পরীক্ষা করে চাপাস্বরে বললেন,–চোরাই মাল তো বটেই! কিন্তু এগুলো ফেলে রেখে আমরা এগিয়ে গেলে সেই সুযোগে স্মাগলাররা সব লোপাট করতে পারে।
কর্নেল প্লাইউডের পেটিগুলোতে চোখ বুলিয়ে বললেন,–তপেশবাবু! আপনি ঠিকই বলেছেন। এগুলোতে সুইডেনের একটা কোম্পানির নাম ছাপা আছে।
বলেন কী!–বলে তপেশবাবু উপরের একটা পেটি নামানোর চেষ্টা করলেন। কিন্তু পারলেন না।
কর্নেল সামনে স্পটলাইটের আলো আর একবার ফেলে বললেন,–বাবা হাড়মটমটিয়া এদিকে আর আসবে না। একটা ব্যাপার স্পষ্ট। ওই প্রাণীটা আগ্নেয়াস্ত্রকে ভয় পায়। বরং ঝটপট একটা কাজ করা যাক। সুরেনের দা-এর সাহায্যে একটা পেটি খুলে দেখা যাক, ওতে কী আছে। জয়ন্ত! তুমি
স্পটলাইটটা নাও। মাঝে-মাঝে জ্বেলে সামনে আর পিছনে আলো ফেলবে।
তপেশবাবু বললেন,–ঠিক বলেছেন! এমন হতেই পারে, স্মাগলারদের লোক আড়ি পেতে আমাদের এই সুড়ঙ্গে নামতে দেখেছে।
কর্নেল ততক্ষণে ওপরের পেটিটা নামিয়ে ফেলেছেন। তপেশবাবুর কথাটা শুনে আমার আতঙ্ক বেড়ে গেছে। এই সুড়ঙ্গের ভিতরে কেষ্ট অধিকারীর দল বন্দুক পিস্তল নিয়ে আমাদের অতর্কিতে আক্রমণ করলে প্রাণে বাঁচার চান্স নেই। ওই প্রাগৈতিহাসিক ভয়ংকর জন্তুটার চেয়ে স্মাগলাররা আরও বিপজ্জনক।
সুরেনের দা-এর সাহায্যে পেটির একটা দিক খুলে দিতেই কর্নেল বললেন,–যন্ত্রাংশে ভর্তি।
তপেশবাবু জিগ্যেস করলেন,–যন্ত্রাংশ? কী যন্ত্র?
কর্নেল বললেন,–আমার অনুমান এগুলো আগ্নেয়াস্ত্রের টুকরো। পার্টগুলো জোড়া দিলে বোঝা যাবে অটোমেটিক রাইফেল কিংবা আরও সাংঘাতিক কোনও অস্ত্র।
কী সর্বনাশ!–তপেশবাবু চমকে উঠে বললেন : কর্নেল! তাহলে আগে এই পেটিগুলো সিজ করে থানায় পাঠানোর ব্যবস্থা করা দরকার। জন্তুটার ব্যবস্থা পরে করা যাবে।
