—তাহলে কাজে বাগড়া দিচ্ছেন কেন?
—হ্যালো, হ্যালো, হ্যালো।
—শুনছি, বলুন।
—তোমার কলম চালনার শব্দ শোনা যাচ্ছে। কলম থামিয়ে মন দিয়ে শোনো। জ্বালাতন! কাগজ থেকে ফোনের দূরত্ব অন্তত হাফ মিটার। আপনার কি পাঁচটা কান আছে?
–না। কিন্তু তুমি লেখার সময় কাগজের ওপর মুখটা ঝুঁকিয়ে রাখো দেখছি। এখনও তাই রেখেছ। লেখা বন্ধ করে হাসতে হাসতে বললুম-বেশ। এবার বলুন আপনার অবতার তত্ত্বটা কী?
—ডার্লিং, অবতারের সংখ্যা কত এবং কী তাদের নাম নিশ্চয় জানো?
—হুঁউ। দশ অবতার। যথা : মৎস্য, কূর্ম, বরাহ, বামন, নৃসিংহ…
—এনাফ জয়ন্ত, এনাফ! আমার বক্তব্য শুধু নৃসিংহ সম্পর্কে। তুমি কাহিনিটা নিশ্চয়ই জানো?
–খুউব জানি। দৈত্যরাজ হিরণকশিপু কৃষ্ণভক্ত বালক প্রহ্লাদকে বললেন, কোথায় থাকে তোমার কৃষ্ণ? প্রহ্লাদ বলল, সর্বত্র। দৈত্যরাজ বললেন, তাহলে এই স্তম্ভেও আছে সে? প্রহ্লাদ বলল, নিশ্চয় আছেন। তখন দৈত্যরাজ স্তম্ভের গয়ে মুন্সরের আঘাত করলেন, আর স্তম্ভ বিদীর্ণ হয়ে নৃসিংহ মূর্তির আবির্ভাব ঘটল। বড় ভয়ঙ্কর সেই মূর্তি। অর্ধেক সিংহ, অর্ধেক মানুষ।
-–খাসা! অর্ধেক সিংহ, অর্ধেক মানুষ!
–কর্নেল, আসলে এই অবতারের ব্যাপারটা ডারউইন সাহেবের সেই থিওরি অফ এভোলশান, অভিব্যক্তিবাদ। নানান প্রাণী থেকে আকার বদলাতে বদলাতে শেষে বাঁদর জাতীয় প্রাণী থেকে মানুষের উৎপত্তি। আমাদের ভারতীয় ঋষিরা কিন্তু সায়েবদের চেয়ে চার হাজার বছর আগেই ব্যাপারটা জানতেন। সেটাই অবতারতত্ত্বের মধ্যে ঠারেঠোরে বলেছেন। দেখুন নাগোড়ার অবতাররা নিছক প্রাণী। তারপর আদ্ধেক প্রাণী, আদ্ধেক মানুষ। শেষের অবতাররা খাঁটি মানুষ।
—এই অভিনব ব্যাখ্যা শুনে চমকৃত হলুম, বৎস! কিন্তু কিন্তু ব্যাখ্যাটি তোমার নিজস্ব কি?
–মোটেও না। প্রখ্যাত পুরাতত্ত্ববিদ ডঃ হরিহর গড়গড়ির কাছে শুনেছি।
–কী অপূর্ব যোগাযোগ! ডার্লিং ডঃ গড়গড়ি এখন আমার পাশেই বসে আছেন।
-–তাই বলুন। সেই তো ভাবছিলুম, আপনার মাথায় খুলির ভেতরকার নরম বস্তুটিতে হঠাৎ মৎস্য-কূর্ম-বরাহ-নৃসিংহ-বামনরা হঠাৎ কিলবিল করে ঢুকে পড়ল কী ভাবে? হাই ওল্ড ম্যান! যদি মঙ্গল চান, ওঁকে বিদেয় করুন। নইলে শীগগির আপনাকে লুম্বিনী পার্ক, কিংবা গোবরা, কিংবা সেই রাঁচি দৌড়ুতে হবে। খবর এসেছে, সব বেডে পেশেন্ট ভর্তি। সাবধান!
—হাঃ হাঃ হাঃ!
–হাসবেন না। একবার আমি ডঃ গড়গড়ির বক্তৃতা শোনার পর সত্যি হাফ পাগল হয়ে গিয়েছিলুম!
—চুপ, চুপ! আমার ফোন খুব সেন্সিটিভ। অন্যেরাও শুনতে পায়।
—যা গে। যথেষ্ট হল। এবার ছাড়ি। এক্ষুনি প্রেসে কপি পাঠাতে হবে।
—জয়ন্ত, তুমি ইউনিৰ্কন নামে কোনও প্রাণীর কথা শুনেছ?
—হে বৃদ্ধ ঘুঘু! সত্যি আপনি বড় বাড়াবাড়ি করছেন।
প্রাচীন গ্রিক ও রোমান পুঁথিতে ইউনিকনের কথা আছে। এ প্রাণী একটা-শিংওলা ঘোড়ার মতো। এই প্রাণী নাকি ভারতে ছিল। তাছাড়া বাইবেলেও এমনি সব বিঘুটে জন্তুর কথা আছে। কিন্তু নৃসিংহ সত্যি অভিনব। আদিম পৃথিবীতে টেরাডাকটিল, ডাইনোসরাস ইত্যাদি প্রাগৈতিহাসিক প্রাণীর কথা বিজ্ঞানীরা বলেছেন। তারা কবে লুপ্ত হয়ে গেছে। এখন কথা হচ্ছে, নৃসিংহরূপী কোনও প্রাণী যদি নিছক কল্পনা না হয়, তাহলে বলতে হবে যে এই প্রাণী ডাইনোসরাসদের পরবর্তী যুগে দেখা দিয়েছিল। এমনকী, মানুষ অর্থাৎ হোমোসেপিয়েন প্রাণীদের আবির্ভাবের পরেও দুচারটে নৃসিংহ টিকে গিয়েছিল। নৃসিংহ অবতারের গল্পে তারই আভাস রয়েছে।
—সর্বনাশ! ডঃ গড়গড়ি আপনার মাথাটি খেয়েছেন।
—জয়ন্ত, ধর যদি এমন হয়, বর্তমান যুগেও কোথাও কোনও দুর্গম জায়গায় নৃসিংহ নামক জীব টিকে রয়েছে?
—থাকলে খুব ভাল হয় নিশ্চয়। দৈনিক সত্যসেবক সে-খবর ছেপে হই-চই ফেলে দেয়। তবে ফোটো চাই। নইলে লোকে গুলতাপ্পি বলে উড়িয়ে দেবে। ইয়েতি-টিয়েতি নিয়ে অনেক দেখা গেল না?
—ডার্লিং, তবে শোন! আমার কাছে নৃসিংহের ফোটো রয়েছে।
—অ্যাঁ!
—অ্যাঁ নয় বৎস, হ্যাঁ।
–নিশ্চয় ডঃ গড়গড়ি এনেছেন আপনার কাছে?
–দ্যাটস রাইট।
—ফোটোটা যে ক্যামেরার কারিকুরি নয়, তার প্রমাণ কী? ডঃ গড়গড়ি কোথায় দেখলেন নৃসিংহ?
–টোরা আইল্যান্ডে। আন্দামান থেকে একশো সাঁইত্রিশ কিলোমিটার দক্ষিণে একটা ছোট্ট দ্বীপে গিয়েছিলেন সম্প্রতি।
—একা?
—মোটেই না। পাঁচজনের একটা বিজ্ঞানী টিম ভারত সরকার ওই এলাকায় পাঠিয়েছিল। একজন পুরাতত্ত্ববিদ—ডঃ গড়গড়ি, একজন ভূতত্ত্ববিদ—ডঃ গজরাজ মালহোত্র, একজন প্রাণীবিজ্ঞানী—ডঃ মুজফফর আমেদ, একজন নৃতাত্ত্বিক পণ্ডিত-ডঃ রঘুনাথ সিং এবং প্রখ্যাত জার্মান উদ্ভিদ বিজ্ঞানী—ডঃ গুটেনবার্গ!
-কর্নেল, কর্নেল! আমি এখনই যাচ্ছি। উত্তেজনায় অস্থির হয়ে ফোন নামিয়ে রাখলুম।
নৃসিংহাবতারের অন্তর্ধান
ইলিয়ট রোডে কর্নেল নীলাদ্রি সরকারের ফ্ল্যাটটি যেন দিনে দিনে একটি ল্যাবরেটরি হয়ে উঠেছে। কর্নেল বুড়ো রাজ্যের পোকামাকড় নিয়ে কী সব গবেষণা করেন এবং মাঝে মাঝে মাঝে বিদেশি পত্রিকায় প্রবন্ধ লেখেন। ইদানীং গোয়েন্দাগিরির দিকে আর তত মনোযোগ নেই।
সেই শীতের সন্ধ্যায় বুড়ো ঘুঘুর বাসায় ঢোকার আগে টের পাইনি যে টোরাদ্বীপে নৃসিংহ নামক প্রাণীর খবর শুধু নয়, আরও সাংঘাতিক খবর আমার জন্য অপেক্ষা করছে।
ভারত সরকার টোরাদ্বীপে নানা ষিয়ে খোঁজ-খবরের জন্য যে পাঁচজন বিশেষজ্ঞ পণ্ডিত ব্যক্তিকে পাঠিয়েছিল, নৃসিংহের কবলে পড়ে তাদের তিনজন প্রাণ হারিয়েছেন। বেঁচে অক্ষত দেহে ফিরতে পেরেছেন শুধু ডঃ হরিহর গড়গড়ি এবং গুটেনবার্গ। তবে ডঃ গুটেনবার্গের শরীর একেবারে অক্ষত নেই। কিছু আঁচড়ের দাগ নিয়ে ফিরেছেন। নার্সিং হোমে চিকিৎসার পর সেরে উঠেছেন তিনি।
