ইতিমধ্যে চা এনেছিল চৌকিদার। চা খেতে-খেতে হালদারমশাই তার কথা শেষ করে বললেন, –আদিবাসী ভদ্রলোকেরে পীতাম্বর রায়ের কথা জিগাইলাম। ও নামে রায়গড়ে কেউ নাই শুনিয়া ওনারে কইলাম, রায়গড়ের এক ভদ্রলোক কলকাতায় থাকতেন। তিনি মারা গেছেন হঠাৎ। তখন ভদ্রলোক কইলেন, একজন জঙ্গলে কী সাংঘাতিক জানোয়ারের পাল্লায় পইড়া মারা গেছে বটে। তার নাম উপেন দত্ত। তখন গোবিন্দর কথা বললাম। ভদ্রলোক কইলেন, গোবিন্দ একজন গুণ্ডা। উপেন দত্ত লোকটাও ভালো ছিল না। গোবিন্দ ছিল তার এক চেলা!
এবার আমি উপেন দত্তের মৃত্যুর ঘটনা হালদারমশাইকে বললুম। এ-ও বললুম, উপেন দত্ত সত্যিই পীতাম্বর রায়। তবে গতরাতের ঘটনা বললুম না। বলতে হলে কর্নেলই বলবেন।
কর্নেল একা ফিরলেন, তখন নটা বাজে। তিনি হালদারমশাইকে দেখামাত্র বলে উঠলেন, সুপ্রভাত হালদারমশাই! আমি কিছুক্ষণ আগে বাইনোকুলারে আপনাকে আবিষ্কার করে অবাক হয়েছিলুম। আপনার গোয়েন্দাগিরির তুলনা নেই!
গোয়েন্দাপ্রবর জিভ কেটে বললেন,–লজ্জা দ্যান ক্যান কর্নেলস্যার? গোবিন্দ আর তার এক সঙ্গীরে ফলো করিয়া আইয়া পড়ছি!
কর্নেল নাখুলালকে ডেকে বললেন, আমাদের এই গেস্টের থাকার ব্যবস্থা করতে হবে নাখুলাল! আমি রেঞ্জারসায়েবকে খবর দেব। তোমার চিন্তার কারণ নেই। পাশের ঘরটা খুলে দাও। আর আমাদের তিনজনের জন্য ব্রেকফাস্টের ব্যবস্থা করো!
নাখুলাল পাশের ঘরের তালা খুলে দিল। তারপর ব্রেকফাস্টের আয়োজন করতে গেল। হালদারমশাই পাশের ঘরে উঁকি মেরে এসে বললেন,–নতুন ঘর! পেন্টের গন্ধ পাইলাম। ইলেকট্রিসিটি নাই?
কর্নেল বললেন,–নাঃ! তবে এখন শীতকালে অসুবিধে নেই। হ্যামশা আছে! তাই মশারিও আছে।
কিছুক্ষণের মধ্যে নাখুলাল ট্রেতে সাজিয়ে ঘিরে ভাজা লুচি, আলুর তরকারি আর সন্দেশ দিয়ে গেল। এখানে ভালো পাঁউরুটি পাওয়া যায় না। তবে ঘি নাকি নির্ভেজাল। সন্দেশও উৎকৃষ্ট। ব্রেকফাস্টের পর কফি এল। নাখুলালকে বাজার করার টাকা দিলেন কর্নেল। সে সাইকেলে চেপে চলে গেল।
কফি খেতে-খেতে কর্নেলকে জিগ্যেস করলুম–দুর্গের ধ্বংসস্তূপে সুরেনকে নিয়ে ঘুরছিলেন দেখেছি। ওখানে কি কিছু আবিষ্কার করলেন?
কর্নেল বললেন,–আবিষ্কার করার অনেক কিছু এখনও থাকতে পারে ওখানে। তবে সেটা প্রত্নতত্ত্ব বিভাগের কাজ। আমি দেখতে গিয়েছিলুম, কাল কৃষ্ণকান্ত অধিকারী আর ডঃ চট্টরাজ ওখানে কী কারণে গিয়েছিলেন। ঘুরতে-ঘুরতে একটা ধ্বংসস্তূপের ভেতর গুহার মতো জায়গা চোখে পড়ল। ছোটো গুহার সামনে লতার ঝালর ছিল। সুরেন বলল, একবার দীপু তাকে এই গুহাটা দেখাতে নিয়ে এসেছিল। গুহার ভেতর কালো লোম পড়ে থাকতে দেখে তারা ভেবেছিল ওখানে ভালুক থাকে। তাই তখনই সেখান থেকে দুজনে পালিয়ে গিয়েছিল। দৈবাৎ ভালুকটা যদি এসে পড়ে! তো আমিও ওখানে ভালুকজাতীয় জন্তুর নোম পড়ে থাকতে দেখলুম।
বললুম,–উপেনের মৃতদেহ যেখানে পড়েছিল, সেখানেও তো লোম কুড়িয়ে পেয়েছিলেন?
–হ্যাঁ। এদিকে নাখুলালও কাল ভালুক দেখে চিৎকার করছিল। কিন্তু আমার এখনও ধারণা জন্তুটা ভালুক নয়।
হালদারমশাই কান খাড়া করে শুনছিলেন। বললেন,–ভালুক যদি অ্যাটাক করতে আসে, গুলি করুম।
কর্নেল হাসলেন,–না হালদারমশাই! জন্তুটা সম্ভবত ভালুক নয়। তবে দৈবাৎ আপনি জন্তুটাকে দেখতে পেলে গুলি ছুড়বেন না। আপনার রিভলভার দেখাতে পারেন! তাতেই জন্তুটা ভয় পাবে।
–রিভলভার দেখলে ভালুক ভয় পাবে? কন কী কর্নেলস্যার? পাবে।
–বলে কর্নেল উঠে দাঁড়ালেন : আপনি ঘুমিয়ে নিন। আমাদের ঘরে তালা এঁটে দিয়ে আমরা এবার বেরুব। আপনি নিশ্চিন্তে ঘুমিয়ে নিন। আমরা বারোটা নাগাদ ফিরব।
বাংলোর নিচের রাস্তায় নেমে কর্নেল বললেন,–সুরেনকে কুমুদবাবুর কাছে আমাদের আসার খবর দিতে পাঠিয়েছি। আমরা আদিবাসী বস্তির ভেতর দিয়ে শর্টকাটে যাব।
অদিবাসী বস্তিটি বেশ পরিচ্ছন্ন। কর্নেলের পিঠে কিটব্যাগ আঁটা, গলা থেকে বাইনোকুলার আর ক্যামেরা ঝুলছে। তারা তাকে বিদেশি ট্যুরিস্ট ভেবে তাদের গির্জাঘর, স্কুল, এমনকী জঙ্গলে তাদের পূর্বপুরুষের ঠাকুরবাবার থান দেখাতে চাইছিল। কিন্তু কর্নেলের মুখে বাংলা শুনে তাদের আগ্রহ কমে গেল।
বস্তি পেরিয়ে বাঁদিকে সেই খেলার মাঠে পৌঁছুলুম। মাঠের পূর্বপ্রান্তে সেই পিচরাস্তা দেখা গেল। খেলার মাঠের ওপর দিয়ে আমরা কিছুটা গেছি, তখন সুরেনকে দেখতে পেলুম। সুরেন বলল,–মাস্টারমশাই বাড়িতে আছেন। আপনার আসার কথা শুনে খুব খুশি হয়েছেন।
কর্নেল বললেন,–ওঁর বাড়ি কি এখান থেকে দেখা যাচ্ছে?
সুরেন আঙুল তুলে বলল,–ওই তো! শেষ দিকটায় বটগাছের ফাঁক দিয়ে একতলা পুরনো বাড়ি।
কর্নেল বাইনোকুলারে উত্তরদিকে অবস্থিত রায়গড় খুঁটিয়ে দেখে নিয়ে বললেন,–চলো!
কুমুদ ভট্টাচার্য তার বাড়ির উঁচু বারান্দায় দাঁড়িয়ে ছিলেন। আমাদের দেখে অভ্যর্থনা করে বসার ঘরে ঢোকালেন! তিনি বললেন, আপনি দয়া করে এসেছেন। আমার মনে আশা জেগেছে, দীপুকে আপনি উদ্ধার করতে পারবেন। কিন্তু ওদিকে একটা অদ্ভুত ব্যাপার! কেষ্টবাবুর সঙ্গে সেদিন কলকাতায় আপনার কাছে গিয়েছিলুম, সেদিনকার একটা খবরের কাগজে দীপুর ছবি ছাপিয়ে কে লিখেছে–
