তারপর তিনি আরও একটা মোড়ক খুলে ফেললেন। কুচকুচে কালো, চৌকো, ইঞ্চি চারেক প্রস্থ এবং ইঞ্চি ছয়েক দৈর্ঘ্যের এক অদ্ভুত জিনিস দেখতে পেলুম। জিনিসটার উচ্চতাও প্রায় চার ইঞ্চি। সব দিকেই সুন্দর কারুকার্য করা। তবে ওটার একদিকে খুদে গোল বোতাম সারিবদ্ধভাবে বসানো আছে। কর্নেল বললেন,–বেশ ওজন আছে। হাতে নিয়ে দেখতে পারো!
হাতে নিয়ে অনুমান করলুম ওজন প্রায় হাফ কিলোগ্রাম হবে। আগাগোড়া উলটে পালটে দেখার পর বললুম,–এট্টা পাথর মনে হলেও পাথরের নয় কর্নেল!
কর্নেল আমার হাত থেকে ওটা নিয়ে বললেন, না। এটা অজানা কোনও ধাতুতে তৈরি। জয়ন্ত! আমাদের ভাগ্য সুপ্রসন্ন। প্রত্নতত্ত্ববিদ ডঃ চট্টরাজের ক্যাম্প থেকে এই জিনিসটাই চুরি গিয়েছিল, সে-বিষয়ে আমি নিশ্চিত। পীতাম্বর রায় ওরফে উপেন দত্তই এটা চুরি করে জঙ্গলে পুঁতে রেখেছিল। কোনও কারণে গতরাতে সে এটা খুঁড়ে বের করতে এসেছিল। কিন্তু সে তাড়াহুড়ো করতে গিয়ে ভুল জায়গা খুঁড়ছিল। সেই সময় তার ওপর ঝাঁপিয়ে পড়ে আততায়ী। সম্ভবত সে উপেনের অজ্ঞাতসারে তাকে অনুসরণ করে এসেছিল!
বললুম,–কিন্তু আততায়ী যদি কোনও মানুষ হয়, তাহলে তাকে ওভাবে ক্ষতবিক্ষত করে মারল। কেন?
কর্নেল একটু হেসে বললেন, তোমার এটুকু বোঝা উচিত জয়ন্ত। দীপুকে কোনও জন্তু মেরে ফেলেছে বলে গুজব রটেছিল। তা ছাড়া এই জঙ্গলে নাকি হাড়মটমটিয়া নামে সাংঘাতিক ভূত বা পেতনি আছে বলে আদিবাসীরা বিশ্বাস করে। কাজেই আততায়ী এবং তার পেছনে যারা আছে, তারা উপেন দত্তের মৃত্যু কোনও অদ্ভুত জন্তুর আক্রমণেই হয়েছে, এটা দেখাতে চেয়েছিল।
–কিন্তু ওই অমানুষিক গর্জন কি সত্যিই কোনও জন্তুর!
–জানি না।
–কর্নেল! আপনি আমাদের ছুটে পালিয়ে বাংলোয় আশ্রয় নিতে বলেছিলেন!
–হ্যাঁ। রাতবিরেতে জঙ্গলে শুধু রিভলভার দিয়ে আত্মরক্ষা করা যায় না। যাই হোক, এবার শুয়ে পড়া যাক। কাল সকালে আমরা কুমুদবাবুর বাড়ি যাব।
পরদিন ঘুম ভেঙে দেখি, নাখুলাল বেড-টি হাতে দাঁড়িয়ে আছে। বাইরে আজ উজ্জ্বল রোদ ফুটেছে। কালকের মতো কুয়াশা নেই। জিগ্যেস করলুম,–কর্নেলসায়েব কোথায় নাখুলাল?
নাখুলাল বলল,উনি ভোরে উঠে সুরেনকে সঙ্গে নিয়ে বেরিয়েছেন।
–কোনদিকে গেছেন দেখেছ?
নাখুলাল উত্তর-পশ্চিম কোণে দূরের দিকে আঙুল তুলে বলল,–পুরনো গড়ের খণ্ডহরের দিকে যেতে দেখেছি সার!
বেড-টি বিছানায় বসে আমার খাওয়ার অভ্যাস। কিন্তু বাইরে রোদ দেখে বারান্দায় গিয়ে বসলুম। কুয়াশা আজ যেন দূরে সূরে গেছে। দক্ষিণ-পূর্ব কোণে পিচের সড়কে মাঝে মাঝে যানবাহন যাতায়াত করছে।
নাখুলাল বলে গেল, বাথরুমে গরম জল দিয়েছে। এখনই মুখ না ধুলে জলটা ঠান্ডা হয়ে যাবে। তাই বাথরুমে ঢুকলুম। তারপর প্যান্ট-শার্ট-জ্যাকেট পরে বাংলোর পশ্চিমদিকে গেলুম। প্রাচীন দুর্গের ধ্বংসস্তূপে কুয়াশা ঘন হয়ে আছে। কিছুক্ষণ পরে দক্ষিণ-পশ্চিমে অনুর্বর রুক্ষ মাঠ এবং নদীর দিকে তাকাতে গিয়ে চোখে পড়ল, কেউ হনহন করে এগিয়ে আসছে। অস্পষ্ট একটা মূর্তি। কাঁধে ঝোলানো একটা ব্যাগ আছে। লোকটা নদী পেরিয়ে কিছুটা এগিয়ে আসার পর চিনতে পারলুম।
লোকটা প্রাইভেট ডিটেকটিভ কে. কে. হালদার–আমাদের প্রিয় হালদারমশাই! কিন্তু উনি কী করে জানলেন আমরা এই বনবাংলোতে উঠেছি?
আরও কাছাকাছি এসে তিনি আমাকে দেখতে পেয়ে হাত নাড়লেন এবং চলার গতি বাড়িয়ে দিলেন। বাংলোর সদর গেটের কাছে গিয়ে দাঁড়ালুম। একটু পরে গোয়েন্দাপ্রবর এসে গেলেন। বললুম,–আসুন হালদারমশাই! আপনাকে কে বলল আমরা এখানে আছি?
হালদারমশাই আড়ষ্টভাবে হেসে বললেন,–সেই গোবিন্দরে ফলো করছিলাম। মেসের ম্যানেজারেরে ফোন করছিলাম কাইল বিকালে। তিনি কইলেন, গোবিন্দ তারে কইছে, পীতাম্বরবাবু মারা গেছেন। পীতাম্বরবাবুর ভাগনা খবর আনছে। সেই ভাগনারে ম্যানেজারবাবু চেনেন। সে মাঝে-মাঝে মেসে গিয়া মামার লগে থাকত। তো দুইজনে পীতাম্বরবাবুর জিনিসপত্র লইয়া হাবড়া স্টেশনে গেছে।
বললুম–আপনি তাহলে তখনই হাওড়া স্টেশনে ছুটে গিয়েছিলেন?
–ঘরে চলেন। সব কমু। কর্নেলসায়েব কই গেলেন?
–মর্নিংওয়াকে।
হালদারমশাই বারান্দায় বসে মাথায় জড়ানো মাফলার খুললেন। নাখুলাল এসে দাঁড়িয়েছিল। তাকে বললুম,–নাখুলাল! ইনি কর্নেলসায়েবের বন্ধু। শিগগির এঁর জন্য চায়ের ব্যবস্থা করো!
নাখুলাল চলে গেলে হালদারমশাই যা বললেন, তার সারমর্ম হল : হাওড়া স্টেশনে গিয়ে সন্ধ্যা সাতটা পর্যন্ত খোঁজাখুঁজি করে গোবিন্দদের আবিষ্কার করতে পারেননি। অগত্যা ফিরে আসবেন ভাবছেন, সেই সময় তার চোখে পড়ে, গোবিন্দ আর তার বয়সি এক যুবক বোঁচকা-কুঁচকি নিয়ে ট্যাক্সি থেকে নামছে। অমনি তিনি আড়ালে গিয়ে তাদের দিকে লক্ষ রাখেন। কিন্তু রায়গড় যাওয়ার ট্রেন রাত বারোটায়। এনকোয়ারিতে খবর নিয়ে টিকিট কেটে হালদারমশাই তাদের চোখের আড়ালে অপেক্ষা করেন। অবশেষে ট্রেন প্ল্যাটফর্মে ভিড়লে তিনি গোবিন্দদের পিছনের কামরায় ওঠেন। ভোরবেলা রায়গড় স্টেশনে নেমে গোবিন্দ আর তার সঙ্গী একটা ট্রাকে জায়গা পেয়ে চলে যায়। হালদারমশাই বেশ কিছুক্ষণ পরে স্টেশনচত্বরে নেমে কীভাবে যাবেন, তার খোঁজ নিচ্ছিলেন। একদল আদিবাসী সেই সময় হাঁটতে-হাঁটতে স্টেশনচত্বরে ঢুকছিল। তাদের জিগ্যেস করে তিনি জানতে পারেন, হাঁটাপথে রায়গড় তো দূরে নয়। নাকবরাবর এগিয়ে তাদের বসতির ভেতর দিয়ে গেলে মাত্র দেড় কিলোমিটার দূরত্ব। সেই আদিবাসীদের মধ্যে শিক্ষিত লোকও ছিল। তাদের সঙ্গে কথা বলে তিনি জানতে পারেন, রায়গড়ে কোনও হোটেল নেই। এদিকে ষষ্ঠীচরণ তাকে জানিয়েছিল আমরা রায়গড়ে এসেছি। কথায়-কথায় এক দাড়িওয়ালা সায়েবের খোঁজ নেন তিনি। প্রাইভেট ডিটেকটিভের বুদ্ধি! তাছাড়া তিনি প্রাক্তন এক জাঁদরেল পুলিশ অফিসার। কর্নেল যে বনবাংলোয় উঠেছেন, সেই খবরও তিনি পেয়ে যান।
