কর্নেল তার কথার ওপর বললেন, হ্যাঁ। আপনারা চলে যাওয়ার পর বিজ্ঞাপনটা আমি দেখেছি।
কুমুদবাবু বললেন,–বাড়ি ফিরে খবরের কাগজে বিজ্ঞাপন দেখে আমি তো অবাক। কেষ্টবাবুর বাড়ি গিয়ে ব্যাপারটা তাকে বলেছিলুম। উনি বললেন, কর্নেলসায়েবের নিশ্চয়ই এটা চোখে পড়েছে। উনি পীতাম্বর রায়ের ঠিকানায় খোঁজ নেবেন।
–নিয়েছি। সে এই রায়গড়ের লোক। তাছাড়া আপনি শুনলে আরও অবাক হবেন, তার নাম উপেন দত্ত, যে হাড়মটমটিয়ার জঙ্গলে মারা পড়েছে।
কুমুদবাবু ফ্যালফ্যাল করে তাকিয়ে থাকলেন।
কর্নেল ঘরের ভেতরটা চোখ বুলিয়ে দেখে বললেন, আমার ধারণা, এটাই দীপুর পড়ার ঘর!
–আজ্ঞে হ্যাঁ। এক মিনিট। আমি আসছি।
বলে কুমুদবাবু ভেতরে চলে গেলেন। ঘরের একধারে একটা ছোটো তক্তপোশে বিছানার ওপর বেডকভার চাপানো আছে। তার পাশে দেওয়াল ঘেঁসে এবং চেয়ার। টেবিলের ওপর পড়ার বই এবং খাতাপত্র সাজানো। টেবিলসংলগ্ন দেওয়ালে কাঠের র্যাক। চারটে র্যাকে বই ঠাসা আছে। কর্নেল উঠে গিয়ে সেই র্যাকের নতুন ও পুরনো বই দেখতে থাকলেন। বললেন,–নানা বিষয়ের বই পড়ত দীপু। বিজ্ঞান আর ইতিহাসের বই-ই বেশি। খেলাসংক্রান্ত বইও দেখছি।
বলে কর্নেল খেলাসংক্রান্ত একটা বই টেনে নিলেন। পাতা উলটে দেখতে থাকলেন। সেটা দেখার পর আর-একটা খেলার বই টেনে বের করলেন। তারপর লক্ষ করলুম, এই বইটার ভেতর থেকে কর্নেল একটুকরো কাগজ বের করে জ্যাকেটের ভেতর চালান করলেন।
সেই সময় কুমুদবাবু এসে গেলেন। বললেন,–দীপুর খেলাধুলোয় যেমন, তেমনই নানারকম বই পড়ার আগ্রহ ছিল।
কর্নেল বইটা র্যাকে ঢুকিয়ে বললেন,–হ্যাঁ। তা-ই দেখছিলুম।
একজন ফ্রক পরা কিশোরী চায়ের ট্রে রেখে গেল। কুমুদবাবু বললেন,–গরিব মানুষ। আপনার সেবাযত্ন করার ক্ষমতা নেই। নেহাত চা-বিস্কুট দিয়ে আপ্যায়ন করছি।
কর্নেল বললেন,–আমরা এইমাত্র ব্রেকফাস্ট করে বেরিয়েছি। আপনার অ্যাপায়নের দরকার নেই। অবশ্য চা খেতে আপত্তি নেই। কফির পর চা খেতে মন্দ লাগে না।
সুরেনকে কুমুদবাবু চায়ের কাপ-প্লেট নিজের হাতে তুলে দিয়ে বললেন,–সুরেন দীপুর ঘনিষ্ঠ বন্ধু। দীপু নিখোঁজ হওয়ার পর দীপুর বন্ধুদের মধ্যে একমাত্র সুরেনই খুব ছোটাছুটি করে বেড়িয়েছে।
চা খেতে-খেতে কর্নেল বললেন, আপনি তো স্কুলে সংস্কৃত শিক্ষক ছিলেন?
–আজ্ঞে হ্যাঁ।
–তার আগে আপনি রায়গড় রাজবাড়ির পারিবারিক লাইব্রেরি দেখাশুনা করতেন শুনেছি?
কুমুদবাবু কর্নেলের দিকে তাকিয়ে আস্তে বললেন,–একটা কথা আপনাকে কেষ্ট অধিকারীর সামনে বলার সুযোগ পাইনি। সুরেনের সামনে বলা যায়। রাজবাড়ির লাইব্রেরিতে একখানা সংস্কৃত ভাষায় লেখা প্রাচীন পাণ্ডুলিপি ছিল। কুমারবাহাদুর অজয়ে রায় সেই পাণ্ডুলিপির অনুবাদ করতে বলেছিলেন আমাকে। পাণ্ডুলিপিটা আমি দেখেছিলুম। কিন্তু কদিন পরে গিয়ে শুনি, ওটা খুঁজে পাওয়া যাচ্ছে না।
কুমুদবাবু চুপ করলেন। তাকে অন্যমনস্ক দেখাচ্ছিল। কর্নেল বললেন,–তারপর?
কুমুদবাবু আরও চাপাস্বরে বললেন, আমার সন্দেহ হয়েছিল, রাজবাড়ির এক কর্মচারী মাখন দত্ত রাজবাড়ির অনেক জিনিস চুরি করে তার ভাই উপেন দত্তের সাহায্যে বিক্রি করত। আমার দৃঢ় বিশ্বাস, মাখনই পাণ্ডুলিপি চুরি করেছিল। মাখনকে কুমারবাহাদুর বিশ্বাস করতেন। আমার সামনেই তাকে উনি বলেছিলেন, ওতে তার পূর্বপুরুষের একটা গোপন কাহিনি আছে। মোগল বাদশাহ আকবরের সেনাপতি রাজা মানসিংহ নাকি তাঁর পূর্বপুরুষকে একটা আশ্চর্য জিনিস উপহার দিয়েছিলেন। তার ভেতরে ছিল অমূল্য কী একটা রত্ন। কিন্তু কীভাবে সেই জিনিস খুলে রত্নটা বের করতে হয়, তা মানসিংহ বলেননি। তিনি বলেছিলেন, নিজের বুদ্ধি খাঁটিয়ে অঙ্ক কষে রত্নটা বের করে নেবেন।
-তারপর?
-মানসিংহের সেই উপহার কোথায় হারিয়ে গিয়েছিল, রাজবংশের কেউ তার হদিশ পাননি। শুধু পাণ্ডুলিপিতে হয়তো তার হদিশ ছিল। আমি খুঁটিয়ে পড়ার সুযোগ পাইনি। হাতের লেখা। তার ওপর নাগরি লিপি। তবে একটা শ্লোকে চোখ বুলিয়ে দেখেছিলুম একটা জটিল অঙ্কের কথা আছে। অঙ্কটা অদ্ভুত।
–আপনার কি মনে আছে অঙ্কটা?
–হ্যাঁ। এক থেকে পনেরো পর্যন্ত পনেরোটি সংখ্যা চার সারিতে এমনভাবে সাজাতে হবে, যাতে ওপরে, নিচে এবং দুধারে যোগ করলে যোগফল হবে বত্রিশ।
কর্নেল হাসলেন,–হ্যাঁ। বত্রিশের ধাঁধা! তা আপনি কি দীপুকে অঙ্কটার কথা বলেছিলেন?
–বলেছিলুম। দীপু অঙ্কে খুব পাকা।
–কবে বলেছিলেন?
–যখন শ্লোকটা পড়ি, তখন দীপুর জন্মই হয়নি। কিন্তু অঙ্কটা আমার মনে ছিল! গত পুজোর সময় একদিন উপেন দত্ত আমার বাড়িতে এসেছিল। সে দীপুর খোঁজ করছিল। দীপুকে সে ডেকে নিয়ে গিয়েছিল। পরে দীপু নিখোঁজ হলে উপেনের ওপর আমার সন্দেহ হয়েছিল। কিন্তু আশ্চর্য ছেলে দীপু; উপেন তাকে ডেকে নিয়ে গিয়ে কী বলেছিল, আমাকে জানায়নি। উপেন তাকে কলকাতা থেকে অনেকগুলো বই কিনে এনে উপহার দিয়েছিল। তাই আমি ভেবেছিলুম, দীপুর যেসব বই পড়ার ইচ্ছে, তা আমি কিনে দিতে পারি না। তাই দীপু হয়তো উপেনকাকুকে সেইসব বইয়ের কথা বলেছিল। দীপু উপেন দত্তকে উপেনকাকু বলত। কিন্তু তারপর দীপু কেন যেন উপেনকে এড়িয়ে চলত। বলত, লোকটা ভালো নয়।
