—তাহলে কি সিংহরায় মিথ্যে বলছেন? খবরের কাগজেও কি উনি নিজেই খবরটা দিয়েছেন? কিন্তু এসবের উদ্দেশ্য কী কর্নেল? সিংহরায় কেন এমন আজগুবি ঘটনা রটাচ্ছেন?
—সব কিছু জানতেই ওঁর বাড়ি যাচ্ছি আমরা। চলো, বেরিয়ে পড়া যাক।…
নিউ আলিপুরে সিংহরায়ের ইভনিং লজে যখন আমরা পৌঁছলুম, তখন সন্ধ্যা ছটা। বিশাল বাড়ি। চওড়া লন। ফলবাগিচা, টেনিস কোর্ট আছে। আমাদের অভ্যর্থনা করে প্রকাণ্ড ড্রয়িংরুমে নিয়ে গিয়ে বসালেন। টুপিটা কর্নেলের হাতে ছিল। সোফার এককোণে রেখে পাশেই বসলেন। তারপর কথাবার্তা শুরু হল। দেখলুম, কর্নেল টুপির কথা মোটেও তুললেন না। ঘরের নানান শিল্পসামগ্রী নিয়ে পুরাতত্ত্বে চলে গেলেন। ওসব পণ্ডিতি ব্যাপার আমি বুঝিনে। চুপচাপ বসে রইলুম।
হঠাৎ আমার চোখে পড়ল টুপিটা নড়ছে। নড়তে নড়তে সোফার পিছনে চলে যাচ্ছে। ঘরে আলো খুব উজ্জ্বল নয়। হাল্কা ধূসর আলো জ্বলছে। আমি নিজের চোখকে বিশ্বাস করতে পারলুম না। এত অবাক, আর ভয়ে কাঠ হয়ে গেছি যে মুখ দিয়ে কথা বেরুচ্ছে না। টুপিটা সোফার পিছন দিয়ে মাতালের মত টলতে টলতে এগোচ্ছে। ডগার থুপিটা ঝাকুনি খাচ্ছে। দেখতে দেখতে ওটার গতি বাড়ল। দরজার কাছে যেতেই আমি এতক্ষণে চেচিয়ে উঠলুম-কর্নেল! কর্নেল! টুপি! টুপিটা পালাচ্ছে!
সিংহরায় হাঁ করে তাকিয়ে আছেন। কর্নেলকে দেখলুম, মিটিমিটি হেসে এবার উঠে দাঁড়ালেন। তারপর দরজার দিকে এগিয়ে গেলেন। তখন টুপিটা দরজার বাইরে অদৃশ্য হয়েছে!
কর্নেল দেখলুম দরজার কাছে গিয়েই আচমকা লাফ দিলেন। তারপর উনিও অদৃশ্য। এতক্ষণে আমার হুশ হল যেন। দৌড়ে বেরিয়ে ডাকলুম-কর্নেল! কর্নেল!
অমনি লনের ওদিকে গেটের কাছে দুড়ুম দুড়ুম আওয়াজ হল। নিশ্চয় কেউ গুলি ছুড়ল। দারোয়ান চাকর-বাকর চেঁচিয়ে উঠল। দৌড়াদৌড়ি শুরু হল! গেটে গিয়ে দেখি, কর্নেল একহাতে টুপি অন্য হাতে পিস্তল নিয়ে দাঁড়িয়ে আছেন। মুখে সেই মিটিমিটি হাসি। রুদ্ধশ্বাসে বললুমকী ব্যাপার কর্নেল?
কর্নেলের সামনে নুড়িবিছানো রাস্তায় একটা ছোট্ট বিলিতি কুকুর মরে পড়ে আছে। বুকের কাছে রক্তের ছোপ। সিংহরায় এসে ঝাপিয়ে পড়ে আর্তনাদ করে উঠলেন—জিমি। জিমি! কে তোকে খুন করল?
কর্নেল ওঁর কাঁধে হাত দিয়ে ডাকলেন—মিঃ সিংহরায়, জিমিকে ওর আসল মালিকরা এইমাত্র গুলি করে মেরে গেল। জিমিকে আপনি নিশ্চয় সদ্য কিনেছেন! তাই না?
সিংহরায় উঠে দাঁড়ালেন। —হ্যাঁ। যেদিন টুপিটা কিনি সেদিনই বিকেলে একটা লোক বেচতে এসেছিল। কিন্তু আমি তো এসব কিছু বুঝতে পারছি না!
দেখুন, এই টুপির মধ্যে নিশ্চয় কিছু দামি মণিমুক্তো লুকোনো আছে। টুপিটা হাতানোর জন্যেই জিমিকে ওরা আপনার কাছে বেচেছিল। টুপিতে একরকম গন্ধ মাখানো আছে। মাকাসিকো দ্বীপের একজাতের ফুলের গন্ধ। বহুকাল টিকে থাকে এই গন্ধ। ওরা এই গন্ধ জোগাড় করে জিমিকে শুকিয়ে খুব ট্রেনিং দিয়েছিল বোঝা যাচ্ছে। তবে ট্রেনিং জিমির তেমন রপ্ত হয়নি। সময় যথেষ্ট পায়নি। তাই টুপিটা ওদের কাছে পৌঁছে দেওয়ার চেষ্টা ব্যর্থ হয়েছে। ওরা এই কদিন রাস্তায় ওত পেতে অপেক্ষা করেছে বেচারা জিমির!
সিংহরায় হতভম্ব হয়ে বললেন—তাহলে টুপির তলায় জিমিটাই ঘুরে বেড়াত?
—অবশ্যই। ভুতুড়ে টুপির রহস্য হচ্ছে এই। আর খবরের কাগজে খবর দিয়েছিল ওরাই—যাতে টুপিটা হারালে ভূতের ঘাড়েই দোষটা চাপানো যায়। বুঝলেন তো? অটুকুন কুকুর-খাড়াই মোট ছইঞ্চি। টুপির তলায় ঢুকলে তো ওকে দেখা যাবে না।
এর পর আমরা ড্রইংরুমে ফিরে গেলুম। ছুরি দিয়ে টুপির ভেতরটা চিরে দিতেই গুচ্ছের রঙিন পাথর ঠিকরে পড়ল। চোখ-ধাঁধানো রং সব। আমি লাফিয়ে উঠলুম-কর্নেল! রাজা অনুহিটিক, পালানোর সময় অনেক ধনরত্ন নিয়ে যান। পথে অনেক খোওয়া গিয়েছিল নাকি। এই টুপিটার মধ্যেও কিছু ছিল দেখা যাচ্ছে।
কর্নেল চুরুট জ্বেলে শুধু বললেন—হুম!
মনে মনে বললুম—ওহে বুড়োঘুঘু! সত্যি, তোমার তুলনা নেই।…
১.১২ টোরাদ্বীপের ভয়ংকর
ফোনে দশাবতার
কাজের সময় কোনও ফোন বাজলে বড় বিরক্ত লাগে। দৈনিক সত্যসেবক পত্রিকার অফিসে বসে খুব মন দিয়ে বিদ্যুত্মন্ত্রীর ভাষণ লিখছি, কাল সকালের কাগজে যেটা পড়ে ললাকেরা এই ভয়াবহ বিদ্যুৎ সঙ্কটের অন্ধকারে অন্তত আশার আলোটি দেখতে পাবে—এমন সময় ফোন বাজল ক্রিরিরিরিরিং…
খাপ্পা হয়ে ফোন তুলেই বললুম-স্পেশাল রিপোর্টার জয়ন্ত চৌধুরীকে চাই তো? নেই। ছুটিতে গেছে।
—ডার্লিং, অবতার কাকে বলে জানো কি?
অপ্রস্তুত ও ভ্যাবাচ্যাকা খেয়ে গেলুম। তারপর বললুম-খুব জানি। পাপীতাপী উদ্ধারে ভগবান নানারূপে পৃথিবীতে অবতরণ করেন। সেই রূপের নাম অবতার। ইদানীংকালে যেমন এক অবতার কর্নেল নীলাদ্রি সরকার। রাজ্যের চোর ডাকাত খুনির হাত থেকে পৃথিবীকে উদ্ধার করতে উঠে পড়ে লেগেছেন। তো হে গোয়েন্দারূপী অবতার মশাই! হঠাৎ এই সন্ধ্যাবেলায় অবতার নিয়ে জ্বালাতন কেন?
-মাইডিয়ার ইয়ংম্যান! কারণ ছাড়া কার্য হয় না।
—ভাল কথা। বেশি বকবক না করে সোজা সেই কারণটা জানিয়ে দিন। আমার হাতে জরুরি কাজ রয়েছে। তাছাড়া আপনার জানা উচিত, এই সন্ধ্যাবেলাটাই হল গিয়ে খবরের কাগজের পিক আওয়ার্স। সারাদিনের সব ঘটনার খবর এখন বন্যার মতো এসে টেবিল ড়ুবিয়ে দিয়েছে। অতএব…
–জয়ন্ত, জয়ন্ত! এ বৃদ্ধ সবই অবগত।
