বললুম—শুধু তাই নয় কর্নেল। বাগানে গিয়ে গোলাপগাছে চড়ে চমৎকার দোল খায় ব্যাটা।
কর্নেল খুব হাসলেন। তারপর বলন—বোসো। এক্ষুনি টুপির মালিক মিঃ গজেন্দ্রকিশোর সিংহরায় এসে পড়বেন। একটু আগে আমায় ফোন করেছিলেন।
কর্নেলের পরিচারিকা মিস অ্যারাথুন একটা ট্রেতে কফি রেখে গেল। কফির পেয়ালায় সবে মুখ দিয়েছি, দরজায় ঘন্টা বাজল। তারপর এক প্রকাণ্ড দশাসই চেহারার স্যুট পরা ভদ্রলোক ঢুকলেন। ওঁর হাতে একটা কিটব্যাগ। আমাকে নমস্কার করলেন, আর কর্নেলের সঙ্গে করলেন হ্যান্ডশেক। আমার সঙ্গে পরিচয় করিয়ে দিলেন কর্নেল। সোফায় গম্ভীর মুখে উনি বসলে কর্নেল বললেন—মিং সিংহরায়, বলুন কী করতে পারি আপনার জন্যে?
সিংহরায় বললেন—আপনাকে ফোনে তো সবই বলেছি, কর্নেল। নতুন করে কিছু বলার নেই। ব্যাপারটা আজ তিনদিন ধরে সত্যি সত্যি ঘটছে। খবরের কাগজে তো দূরের কথা, বাড়ির কাউকে আমি বলিনি। অথচ কীভাবে ফাঁস হয়ে গেল, কে জানে! খবরের কাগজেই বা কে, খবরটা দিল—কিছু বুঝতে পারছিনে! সেজন্যেই তো আপনার সাহায্য চাইছি।
কর্নেল মুখ খোলার আগে আমি অবাক হয়ে বললুম-খবরটা নিশ্চয় কোনও রিপোর্টারকে কেউ দিয়েছে! না দিলে কাগজে বেরোতেই পারে না।
সিংহরায় উদ্বিগ্নমুখে বললেন—সেটাই তো আশ্চর্য লাগছে।
কর্নেল ভুরু কুঁচকে কী ভাবছিলেন। বলেন—হুম। কিন্তু টুপিটা যে ওইসব অদ্ভুত কাণ্ড করছে, তা তো সত্যি?
সিংহরায় জবাব দিলেন—একেবারে হুবহু সত্যি। টুপিটা কিনেছি গত বিষ্যত্বর চৌরঙ্গির একটা নিলামের দোকানে। অদ্ভুত-অদ্ভুত জিনিস কিনে ঘরে সাজিয়ে রাখা আমার বাতিক। টুপিটা দেখতে অদ্ভুত লাগল। পঁচিশ টাকা থেকে দর হাঁকাহাঁকি শুরু হল। তিরিশে উঠেই অন্যরা ছেড়ে দিল। শুধু একজন..
—হুম! বলুন।
—একজন অবাঙালি ভদ্রলোক ছাড়ল না। দর চড়াতে থাকল। তাই আমারও জেদ চড়ে গেল। শেষ অব্দি রোখের মাথায় তেরোশো টাকা হাঁলুম। তখন লোকটা সরে গেল। টুপি নিয়ে বিজয়গর্বে বাড়ি ফিরলুম। এবং তারপর সন্ধ্যাবেলা থেকেই টুপি খেল দেখানো শুরু করল। ড্রয়িংরুমের কোনায় একটা ছোট্ট টেবিলে ওটা রেখেছিলুম। বন্ধুদের সঙ্গে গল্প করছি, হঠাৎ দেখি টুপিটা টেবিলের ওপরে চলতে চলতে নিচে পড়ে গেল। তখনও সন্দেহ হয়নি। ওটা সেখানেই তুলে রেখে ওপরের ঘরে গেছি, খাওয়াদাওয়া করেছি। শুতে গিয়ে দেখি, আশ্চর্য। টুপিটা বিছানায় শুয়ে আছে। বাড়ির সব্বাইকে জিগ্যেস করলুম—কেউ কিছু জানে না। সবচেয়ে আশ্চর্য কাণ্ড ঘটল শুক্রবার রাতে। টুপিটা শোওয়ার ঘরেই রেখেছিলুম। রাত দুটোয় হঠাৎ ঘুম ভেঙে গেল। ঘরে খসখস শব্দ শুনে সুইচ টিপে টেবিলল্যাম্প জ্বালালুম। দেখি—টুপিটা মেঝেতে দিব্যি হাঁটছে। হাঁটতে হাঁটতে জানলার দিকে যাচ্ছে। তারপর চোখের সামনে সেটা জানলা গলিয়ে লাফ দিল। বিশ্বাস করুন কর্নেল, যা বলছি—এর মধ্যে এর মধ্যে এতটুকু মিথ্যে নেই।
-হুম! বলুন, বলুন!
মিঃ সিংহরায়ের মুখে ভয়ের ছাপ ফুটে উঠল। দম নিয়ে বললেন—তক্ষুণি টর্চ আর পিস্তল নিয়ে নিচে গেলুম। দেখলুম, টুপিটা বুগনভিলিয়ার গাছে কাত হয়ে যেন ঘুমোচ্ছে। সবচেয়ে অবাক কাণ্ড হল গত রাতে। টুপিটা কখন ঘর থেকে বেরিয়ে গেছে। একটা গোলাপ গাছে চড়ে বসেছে। আজ ভোরবেলা মালি দেখতে পেয়ে…
কর্নেল বাধা দিয়ে বলেন—হুম, বুঝেছি। টুপিটা কি এনেছেন?
—এনেছি! এই বিদঘুটে জিনিস আর কাছে রাখতে একটুও ইচ্ছে নেই কর্নেল।…বলে সিংহরায় কিটব্যাগ খুলে একটা চোঙার মতো টুপি বের করলেন। প্রকাণ্ড টুপি। কালোরং। চলো ডগায় একটা রেশমি টুপি আছে। দুপাশে দুটো দুষ্টুহাসিভরা মুখ—একদিকেরটা ছেলের, অন্যদিকেরটা মেয়ের। আমার নাকে কড়া গন্ধ লাগল। নিশ্চয় টুপির গন্ধ।
কর্নেল টুপিটা নিয়ে পরীক্ষা করতে করতে বললেন—হুম, বেশ ওজন আছে দেখছি। শক্ত-সমর্থ মাথা না হলে ঘাড় ব্যথা করবে। কিন্তু এ পি তো প্রশান্ত মহাসাগরের মাকাসিকো দ্বীপপুঞ্জের বাসিন্দারা পরে। বুনো বেড়ালজাতীয় পশুর চামড়ায় তৈরি।
আমি ব্যস্ত হয়ে বললুম-কর্নেল কর্নেল! গত বছর মাকাসিকোতে রাজাকে হটিয়ে এক সেনাপতি সিংহাসন দখল করেছিল না? রাজা অনুহিটিক পালিয়ে গিয়ে আমেরিকায় আশ্রয় নিয়েছিলেন! খুব খুনোখুনি আর লুটপাট হয়েছিল রাজপ্রাসাদে।
কর্নেল আমার দিকে তাকিয়ে বললেন—অপুর্ব জয়ন্ত, অপুর্ব! তাই-ই তো বটে। হাজার হলেও তুমি খবরের কাগজের লোক! ইয়ে মিঃ সিংহরায়, তাহলে টুপিটা আমার কাছে আপাতত থাক। আপত্তি আছে?
সিংহরায় যেন স্বস্তির নিশ্বাস ফেলে বাঁচলেন।—মোটেও না! বরং বেঁচে গেলুম, কর্নেল! বা! এখনও আমার বুক ঢিপ ঢিপ করছে! ওই ভূতুড়ে টুপি এবার হয়তো গলা টিপে মেরেই ফেলবে মশাই!
কর্নেল বললেন—ঠিক আছে। আমি সন্ধ্যার দিকে আপনার বাড়িতে যাচ্ছি। জয়ন্তও যাবে আমার সঙ্গে। কেমন!
সিংহরায় মাথা দুলিয়ে সায় দিলেন।
কথামতো সাড়ে পাঁচটায় আবার কর্নেলের ফ্ল্যাটে গেলুম। দেখি, আমারই অপেক্ষা করছেন উনি। একটু হেসে বললুম—টুপিটা নিশ্চয় আপনাকে খুব জ্বালিয়েছে কর্নেল?
কর্নেল গম্ভীরভাবে মাথা নেড়ে বললেন—না জয়ন্ত। এবং সেটাই আশ্চর্য!
—কেন, কেন?
—টুপিটা যদি সত্যি ভূতুড়ে হবে, তাহলে সবখানেই ভূতুড়ে কাণ্ড করবে! অথচ আমার ঘরে এসে একেবারে শান্ত খোকাবাবুটি বনে গেল! কোনও মানে হয় না জয়ন্ত!
