–আপনি বলছিলেন, সম্ভবত বত্রিশের ধাঁধার সঙ্গে ওটার সম্পর্ক আছে।
–সম্ভবত বলার কারণ, ডঃ চট্টরাজ বলেছিলেন, চৌকো গড়নের কালো জিনিসটার গায়ে খুদে হরফে কী সব লেখা ছিল। দেখতে নাকি নাগরি লিপির মতো। ওটা পরিষ্কার করার সময় দেয়নি চোর। তবে ডঃ চট্টরাজ ওটার ওপরের দিকে নাগরি লিপিতে ৩ এবং ২ এদুটো সংখ্যা অনুমান করেছিলেন। নেহাতই অনুমান। কিন্তু এখন মনে হচ্ছে তিনি ঠিকই পড়েছিলেন।
–ডঃ চট্টরাজ এই চুরির কথা পুলিশকে জানাননি?
–আমি নিষেধ করেছিলুম। কারণ এতে একটা হইচই শুরু হত। ডঃ চট্টরাজকেও পুরাতত্ত্ব দফতরের কাছে কৈফিয়ত নিতে হতো। তার সুনামহানিরও আশঙ্কা ছিল।
–আপনি তো তখন সেখানে ছিলেন!
কর্নেল একটু চুপ করে থাকার পর বললেন, আমি সেদিন ওখানে ছিলুম না। কৃষ্ণকান্ত অধিকারীর সঙ্গে হাড়মটমটিয়ার জঙ্গলে ঘুরে বেড়াচ্ছিলুম। তবে ওখানে থাকলেও চোরধরা আমার পক্ষে সম্ভব ছিল না। ডঃ চট্টরাজের দলে ছিলেন দশ-বারো জন লোক। আর খোঁড়াখুঁড়ির কাজে স্থানীয় কয়েকজন মজুরের সাহায্য দরকার হয়েছিল। মিঃ অধিকারীই সেইসব মজুর জোগাড় করে দিয়েছিলেন। কিন্তু তারা নিরক্ষর। এছাড়া এলাকার লোকেরাও রোজ এসে ভিড় করত। কাজেই বুঝতে পারছ, আমার পক্ষে ব্যাপারটা ছিল খড়ের গাদায় সূচ খোঁজার মতো। তার চেয়ে বড়ো কথা, চুরি যাওয়া জিনিসটাকে তত গুরুত্ব দেননি ডঃ চট্টরাজ।
হাসতে-হাসতে বললুম,–তাহলে এবার জিনিসটার গুরুত্ব খুব বেড়ে গেল।
কর্নেল হাসলেন না। তেমনই গম্ভীরমুখে বললেন, তুমি ঠিকই বলেছ। ডঃ চট্টরাজ গত বছর রিটায়ার করেছেন। যাদবপুরে থাকেন। দেখি, ওঁকে পাই কি না।
বলে কর্নেল টেলিফোনের রিসিভার তুলে ডায়াল করলেন। তারপর সাড়া পেয়ে বললেন, –ডঃ চট্টরাজ আছেন?… আমার নাম কর্নেল নীলাদ্রি সরকার। ইলিয়ট রোড থেকে বলছি।… বাইরে গেছেন? মানে, কলকাতার বাইরে?… কবে ফিরবেন?… বলে যাননি? আপনি কে বলছেন? হ্যালো! হ্যালো! হ্যালো!
রিসিভার রেখে কর্নেল বিরক্ত মুখে বললেন,–অদ্ভুত লোক! সম্ভবত নতুন কোনও কাজের লোক। ডঃ চট্টরাজের পুরাতন ভৃত্য পরেশ আমাকে চেনে। এই লোকটার গলার স্বর যেমন কর্কশ, কথাবার্তাও তেমনই উদ্ধত প্রকৃতির লোকের মতো।
–ডঃ চট্টরাজের স্ত্রী বা ছেলেমেয়ে তো আছেন। আপনি—
কর্নেল আমার কথার ওপর বললেন,–ওঁর স্ত্রী বেঁচে নেই। ছেলে থাকে আমেরিকায়। মেয়ের বিয়ে দিয়েছিলেন দিল্লিতে। মেয়ে-জামাই দুজনেই বিজ্ঞানী। যাদবপুরের বাড়িতে ডঃ চট্টরাজ একা থাকেন।
বলে তিনি আবার হেলান দিয়ে বসে চোখ বুজলেন। দাঁতের ফাঁকে রাখা জ্বলন্ত চুরুটের নীল ধোঁয়া আঁকাবাঁকা হয়ে তার চওড়া মসৃণ টাকের ওপর নাচতে-নাচতে মিলিয়ে যাচ্ছিল। তবে এতক্ষণে বুঝলুম,–বৃদ্ধ রহস্যভেদী পাঁচ বছর আগেকার রায়গড়ের স্মৃতির মধ্যে আরও কোনও সূত্র খোঁজাখুঁজি করছেন।
বললুম,–আমি এবার উঠি। দেড়টা বাজে।
কর্নেল আগের মতো গলার ভেতর বললেন,–ওঁ?
আপনি ধ্যান করবেন। আমি চুপচাপ বসে থাকব। এর মানে হয় না। বলে আমি উঠে দাঁড়ালুম।
সেই সময় ষষ্ঠীচরণ ভেতরের দরজায় পরদার ফাঁকে মুখ বের করে সহায্যে বলল,– দাদাবাবু? আপনার এবেলা নেমন্তন্ন।
অমনই কর্নেলের ধ্যানভঙ্গ হল। চোখ কটমটিয়ে ষষ্ঠীর দিকে তাকিয়ে বললেন,–আমরা খাব।
ষষ্ঠী বলল,–সব রেডি বাবামশাই!
কর্নেল বললেন,–জয়ন্ত কি স্নান করতে চাও? আমার মতে, এই শীতের অবেলায় স্নান করলে ঠান্ডা লেগে জ্বর-জ্বালা হবে। চলো, খেয়ে নেওয়া যাক।
খাওয়ার পর ড্রয়িংরুমে এসে কর্নেল বললেন, কিছুক্ষণ পরে আমরা বেরুব।
বললুম,–পীতাম্বর রায়ের সেই মেসে যাবেন নাকি?
কর্নেল হাসলেন,–নাঃ! ওই ব্যাপারটা হালদারমশাইয়ের হাতেই থাক। চাকু হারিয়ে সেই গোবিন্দ এখন ভোজালি জোগাড় করে ফেলেছে।
–গোবিন্দের ব্যাপারটা আমি বুঝতে পারছি না। হালদারমশাইয়ের ওপর সে আচমকা চড়াও হল কেন?
–প্রশ্নটা আমার মাথাতেও এসেছিল। কিন্তু ওই অবস্থায় ওঁকে ডিটেলস জানাবার জন্য পীড়াপীড়ি করিনি। আমার ধারণা, মেসের ম্যানেজার আদিনাথ ধাড়াকে হালদারমশাই নিশ্চয়ই মুখ ফসকে এমন কোনও কথা বলে ফেলেছিলেন, যা গোবিন্দের কানে গিয়েছিল। হালদারমশাইয়ের হঠকারী স্বভাবের কথা তুমি তো জানো!
একটু পরে বললুম,–আচ্ছা কর্নেল, আমার মাথায় একটা প্রশ্ন জেগেছে।
–বলো!
–রায়গড়ের ধ্বংসস্তূপ খুঁড়ে যে চৌকো কালো জিনিসটা পাওয়া গিয়েছিল, সেটার কথা কি ডঃ চট্টরাজের কলিগরা জানতেন না? জানলে তো তারা সরকারি রিপোর্টে কথাটা উল্লেখ করতে বলতেন! আমি যতটা জানি, এসব রিপোর্টে পুরো টিমের সই থাকে।
–তুমি ঠিক বলেছ। উৎখননে পাওয়া প্রতিটি জিনিসের তালিকাও করা হয়। তাতেও পুরাতাত্ত্বিক দলের সদস্যদের সই থাকে। কিন্তু ডঃ চট্টরাজ আমাকে গোপনে জানিয়েছিলেন, ওই জিনিসটা উনি দৈবাৎ কুড়িয়ে পান। ওটার কোনও গুরুত্ব আছে বলে ওঁর মনে হয়নি। তাই দলের কাকেও বলেননি।
–অথচ ওটা ওঁর ক্যাম্প থেকে চুরি গেল!
–হ্যাঁ। স্মৃতিটা ঝালিয়ে নিতে-নিতে আজ আমার মনে হল, এটা একটা আশ্চর্য ঘটনা।
–আপনি তখন বলছিলেন বটে! কিন্তু আশ্চর্য কেন?
–ডঃ চট্টরাজ তারপর যখন জিনিসটার গুরুত্ব টের পেলেন, তখন ওটা অসাবধানে রাখলেন কেন?… ঠিক এই কথাটা ওঁকে জিগ্যেস করে কোনও সদুত্তর পাইনি।
