–প্রাইভেট ডিটেকটিভ হিসেবে আপনার তো লাইসেন্স আছে। দরকার মনে করলে আপনি পুলিশের সাহায্য নিতে পারবেন।
হালদারমশাই একটু হেসে বললেন,–পুলিশের সাহায্য আমার লাগবে না কর্নেলস্যার! আমার প্ল্যান কী, তা আপনারে জানাইয়া দিই।
–হ্যাঁ। আমাকে না জানিয়ে কিছু করবেন না যেন।
কখনও করছি কি? বলে হালদারমশাই সোয়েটারের ভিতরে হাত ঢুকিয়ে একটা ছোট্ট নোটবই বের করলেন। তারপর বললেন,–পীতাম্বরবাবুর মেসের ফোন নম্বর লইছি। কাল সোমবার রাত্রে ওনারে ফোন করব। তারপর ওনারে বলব, নিখোঁজ দীপককুমার রায়ের খোঁজ আমি পাইছি। আপনি শিগগির সাক্ষাৎ করুন। আমি ওনারে গণেশ অ্যাভেনিউয়ে আমার প্রাইভেট ডিটেকটিভ এজেন্সিতেই আইতে বলব।
কর্নেল নিভে যাওয়া চুরুট জ্বেলে বললেন,–তার মানে, আপনি যে একজন প্রাইভেট ডিটেকটিভ, তা পীতাম্বরবাবুকে জানাবেন?
–হঃ!
–বাঃ! আপনার প্ল্যানটা চমৎকার। এ ধরনের কেসে প্রাইভেট ডিটেকটিভের নাক গলানো তো স্বাভাবিক।
বললুম,–পীতাম্বরবাবু আপনার কাছে যাবেন বলে মনে হয় না!
হালদারমশাই হাসলেন,–না আইতে চাইলে অরে থ্রেটন করব। পুলিশের ভয় দেখাব।
কর্নেল বললেন, আপনি প্রাইভেট ডিটেকটিভ হিসেবে মক্কেলের ফোটো তুলে রাখেন। তাই না? আমার দরকার পীতাম্বর রায়ের একটা ছবি।
গোয়েন্দাবর আশ্বাস দিলেন,–পীতাম্বর রায়ের ছবি আপনি পাইবেন কর্নেলস্যার! যে ভাবেই হোক, অরে মিট করব। ছবিও তুলব।
–ওঁদের মেসের ফোন নাম্বারটা আমাকে দিন।
হালদারমশাই নোটবই থেকে নাম্বারটা কর্নেলকে দিলেন। তারপর মুচকি হেসে বললেন, বর্ধমান জেলার রায়গড়ের নাম কইলেন তখন। ব্যাপারটার এটুকখানি হিন্ট দিন কর্নেলস্যার!
কর্নেল চুরুটে কয়েকটা টান দিয়ে সেটা অ্যাশট্রেতে ঘরে নেভালেন। তারপর বললেন, আপাতত আপনাকে শুধু এটুকু জানিয়ে রাখছি, রায়গড়ে আমি বার-দুয়েক গিয়েছিলুম। প্রথমবার গিয়েছিলুম প্রায় পাঁচবছর আগে। ওখানে একটা প্রাচীন দুর্গের ধ্বংসাবশেষ আছে। আর আছে একটা গভীর জঙ্গল। তো আমি গিয়েছিলুম আমার এক বন্ধু ডঃ দেবব্রত চট্টরাজের সঙ্গে। ডঃ চট্টরাজ কেন্দ্রীয় পুরাতত্ত্ববিভাগের একজন কর্মকর্তা। দুর্গের ধ্বংসাবশেষ খোঁড়াখুঁড়ি করে তার একটা টিম প্রাচীন ইতিহাস উদ্ধারের চেষ্টা করছিল। আপনি তো জানেন, এ বিষয়ে আমারও কিছু বাতিক আছে। যাই হোক, সেখানে গিয়ে আলাপ হয়েছিল কৃষ্ণকান্ত অধিকারী নামে একজন বড়ো ব্যবসায়ীর সঙ্গে। তার হেড অফিস আসানসোলে। রায়গড়ে তাঁর পৈতৃক বাড়ি। রায়গড়ের জঙ্গলে তার সঙ্গে অনেক ঘোরঘুরি করেছিলুম। মিঃ অধিকারী তরুণ বয়সে দক্ষ শিকারি ছিলেন। তার সঙ্গে ঘুরে বিরল প্রজাতির কিছু পাখির ছবি তুলেছিলুম। পরের বছর মিঃ অধিকারী কলকাতায় নিজের কাজে এসে আমার সঙ্গে দেখা করেছিলেন। এবার আসল কথাটা বলি। ওই জঙ্গলটার নাম হাড়মটটিয়ার জঙ্গল। কারণ রাতবিরেতে ওই জঙ্গলে হাড়-মট-মট করে কোনও অদ্ভুত জন্তু অথবা ভূতপ্রেত নাকি ঘুরে বেড়ায়। এই রহস্য ফাঁস করার উদ্দেশ্যেই আমি মিঃ অধিকারীর সঙ্গে আবার রায়গড়ে গিয়েছিলুম।
হালদারমশাই কান খাড়া করে শুনছিলেন। বললেন,–হাড়মটমটির শব্দ শুনছিলেন নাকি?
কর্নেল হাসলেন,–গিয়েছিলুম মার্চ মাসে। তখন রাতবিরেতে জোরে বাতাস বয়। অনেক অদ্ভুত শব্দ শুনেছিলুম, তা ঠিক। তবে হাড়মটমটিয়ার রহস্য রহস্যই থেকে গেছে।
–পীতাম্বর রায়ের বাড়ি রায়গড়ে–আপনিই কইলেন। অরে চেনেন?
নাঃ। তবে নামটা যেন শুনেছিলুম।-বলে কর্নেল আমার দিকে অর্থপূর্ণ দৃষ্টে তাকালেন।
বুঝলুম, আমি যেন এখনই ব্যাপারটা হালদারমশাইয়ের কাছে ফঁস না করি। আমি একটা পত্রিকা পড়ার ভান করলুম।
হালদারমশাই বললেন, আমি এবার যাই কর্নেলস্যার! যেভাবে হোক, পীতাম্বর রায়েরে মিট করব। আর ছবি তুলব।
–কিন্তু এবার একটু সতর্ক থাকবেন যেন!
–হঃ। লাইসেন্সড রিভলভার আছে। সাথে রাখুম।
প্রাইভেট ডিটেকটিভ সবেগে বেরিয়ে গেলেন। তারপর বললুম,–ব্যাকগ্রাউন্ডটা আপনি হালদারমশাইকে জানালেন না কেন?
কর্নেল গম্ভীরমুখে বললেন,–জানালে উনি এখনই রায়গড়ে ছুটে যেতেন। আপাতত আমি পীতাম্বর রায়ের ব্যাকগ্রাউন্ড জানতে চাই। কেন সে অমন বিজ্ঞাপন দিল, তা আমার জানা দরকার।
এইসময় আমার মাথায় একটা প্রশ্ন জেগে উঠল। বললুম,–আচ্ছা কর্নেল! আপনি রায়গড়ে একটা প্রাচীন ধ্বংসাবশেষ খুঁড়ে প্রাচীন ইতিহাস উদ্ধারের কথা বললেন। দীপুর অন্তর্ধানরহস্যের সঙ্গে সেখানকার কোনও দামি প্রত্নদ্রব্যের সম্পর্ক নেই তো?
কর্নেল আমাকে চমকে দিয়ে বললেন,–আছে। সম্ভবত সেটাই বত্রিশের ধাঁধা।
.
তিন
রায়গড়ের প্রাচীন দুর্গের ধ্বংসস্তূপ থেকে আবিষ্কৃত কোনও প্রত্নদ্রব্যের সঙ্গে দীপুর অন্তর্ধানরহস্যের সম্পর্কে আছে শুনে কর্নেলের দিকে অবাক হয়ে তাকিয়ে ছিলুম। তাকে এখন বড়ো বেশি গম্ভীর দেখাচ্ছিল। কথাটা বলে তিনি ইজিচেয়ারে হেলান দিয়ে চোখ বুজে চুরুট টানছিলেন।
একটু পরে বললুম,–দীপুর অন্তর্ধানের কারণ সম্পর্কে আপনি তাহলে দেখছি একেবারে নিশ্চিত?
কর্নেল গলার ভেতরে বললেন,–হুঁ।
–কিন্তু সেই প্রত্নদ্রব্যটা কী?
ওটা দেখার সৌভাগ্য আমার হয়নি। ডঃ চট্টরাজের কাছে শুনেছিলুম। একটা ছোটো বাকসের মতো জিনিসটার গড়ন। কিন্তু বাকসো নয়। তাছাড়া ওটা কোনও অজানা ধাতুতে তৈরি। বলে কর্নেল চোখ খুলে সোজা হয়ে বসলেন, আশ্চর্য ঘটনা! ওটা ডঃ চট্টরাজের ক্যাম্প থেকেই চুরি হয়ে গিয়েছিল।
