–আজ কি তাই ওঁকে তখন ফোন করলেন?
–হ্যাঁ। তুমি বুঝতেই পারছ, এতদিন পরে সেই চুরি যাওয়া জিনিসটাকে কেন্দ্র করে একটা জমজমাট রহস্য ঘনীভূত হয়েছে। কাজেই ডঃ চট্টরাজের সঙ্গে কথা বলা এখন কত জরুরি। অথচ উনি নাকি বাইরে গেছেন।
কর্নেলকে উত্তেজিত দেখাচ্ছিল। আধপোড়া চুরুটটা অ্যাশট্রেতে ঘষে নিভিয়ে রেখে তিনি উঠে দাঁড়ালেন। বললেন,–এক মিনিট। আমি পোশাক বদলে আসি।
বেলা আড়াইটে নাগাদ আমরা বেরিয়ে পড়লুম। আমার গাড়ি নিচে পার্ক করা ছিল। কর্নেল সামনের সিটে আমার বাঁদিকে বসে বললেন, হাজরা রোডের দিকে চলো। তারপর আমি পথ দেখিয়ে নিয়ে যাব।
গাড়ি স্টার্ট দিয়ে বললুম,–অ্যাপয়েন্টমেন্ট না করেই যাচ্ছেন। কার কাছে?
কর্নেল হাসলেন,–চলো তো!
হাজরা রোডে পৌঁছে কর্নেলের নির্দেশে কিছুদূর চলার পর ডানদিকে একটা সংকীর্ণ আঁকাবাঁকা রাস্তায় এগিয়ে গেলুম। তারপর এক জায়গায় তিনি আমাকে গাড়ি দাঁড় করাতে বললেন, দেখলাম বাঁদিকে একটা চওড়া গেট। ওপারে বুগেনভিলিয়ার ঝাপি। কর্নেল নেমে গিয়ে গেটের সামনে দাঁড়ালেন। তারপর একটা লোক গেট খুলে দিল। কর্নেল ইশারায় আমাকে গাড়ি ভেতরে ঢোকাতে বললেন।
গাড়ি ঘুরিয়ে ঢালু ফুটপাত দিয়ে ভেতরে ঢোকার সময় চোখে পড়ল, মার্বেলফলকে লেখা আছে ‘রায়গড় রাজবাটি’। দেখামাত্র উত্তেজিত হয়ে উঠলুম।
নুড়িবিছানা লনের অবস্থা, আগাছায় ঢাকা ফুলের গাছ, শুকনো ফোয়ারার শীর্ষে ভাঙাচোরা একটা মূর্তি এবং দোতলা পুরোন বাড়িটা দেখে মনে হচ্ছিল যেন একটা ইতিহাসের মধ্যে ঢুকে পড়েছি। বাড়িটার স্থাপত্য ইতালীয় ধাঁচ। বড়ো-বড়ো থাম এবং জানালা। পোর্টিকোর তলায় গাড়ি রেখে নেমে দাঁড়ালুম। কর্নেল ততক্ষণে সেই লোকটির সঙ্গে কথা বলতে-বলতে কয়েকধাপ সিঁড়ি বেয়ে প্রকাণ্ড দরজার সামনে পৌঁছে গেছে। লোকটা ঘরের ভেতর দ্রুত উধাও হয়ে গেল।
বললুম,–কী আশ্চর্য!
কর্নেল বললেন,–তোমাকে একটু চমক দিয়ে আনন্দ পেলুম। এসো।
ওপরতলায় এতক্ষণে কুকুরের গর্জন শুনতে পেলুম। বললুম,–সর্বনাশ! কুকুরটা ছেড়ে দেওয়া নেই তো?
কর্নেল কী বলতে যাচ্ছিলেন, সেই লোকটি হলঘরের সিঁড়িতে নামতে-নামতে বলল,–যান সার! কুমারবাহাদুর ওপরের বারান্দায় আছেন। উনি আপনাকে দেখতে পেয়েছিলেন।
কাঠের সিঁড়িতে বিবর্ণ লালচে কার্পেট পাতা আছে। হলঘরের মেঝেতেও আছে। এ ধরনের অনেক বনেদি অভিজাত পরিবারের বাড়িতে কর্নেলের সঙ্গে কতবার এসেছি।
চওড়া এবং লম্বাটে বারান্দার মাঝখানে বৃত্তাকার একটা অংশ। সেখানে এক বৃদ্ধ ভদ্রলোক হুইলচেয়ারে বসে ছিলেন। কর্নেলকে দেখে সহায্যে বললেন,–আসুন! আজ ঘুম থেকে ওঠার পর কেন যেন মনে হচ্ছিল, আপনি আসবেন।
বলে তিনি হাঁক দিলেন,–মধু! রেক্সিটা বড্ড চাঁচাচ্ছে। ওকে নিচে নিয়ে যা। আর সাবিত্রীকে বল, কর্নেলসায়েব এসেছেন। কফিটফি চাই।
কোণের একটা ঘর থেকে কালো দানোর মতো একটা গুফো লোক বেরিয়ে এসে কর্নেলকে সেলাম ঠুকল। তারপর কুকুরটার চেন খুলে নিচে নিয়ে গেল।
আমরা কুমারবাহাদুরের মুখোমুখি বসলুম। কর্নেল আমার সঙ্গে তাঁর আলাপ করিয়ে দিলেন। কুমারবাহাদুরের নাম অজয়েন্দ্রনারায়ণ রায়। একসময় এঁরই পূর্বপুরুষ রায়গড় পরগনার রাজা ছিলেন। চেহারায় আভিজাত্যের ছাপ আছে। কথায়-কথায় জানতে পারলুম, বছর দশেক আগে সিঁড়ি থেকে পা হড়কে নিচে পড়ে গিয়েছিলেন। দুটো পা-ই অকেজো হয়ে গেছে। তাই হুইলচেয়ারে বসে দোতলায় চলাফেরা করেন। নিচে নামেন না।
মধুর মতো তাগড়াই চেহারার এক প্রৌঢ়া কফি আর স্ন্যাক্সের ট্রে রেখে গেল। সে কর্নেলের দিকে ঝুঁকে প্রণামও করল। কর্নেল বললেন,–কেমন আছ সাবিত্রী? দেশে যাও-টাও তো?
সাবিত্রী আস্তে বলল,–আর কার কাছে যাব কর্নেলসায়েব? একটা ভাই ছিল। সে দুর্গাপুরে চাকরি পেয়ে চলে গেছে।
সে চলে গেলে কুমারবাহাদুর বললেন,–আর সে রায়গড় নেই। মাঝেসাঝে ওখানকার কেউ-কেউ এসে দেখা করে যায়। হা–আগের চেয়ে উন্নতি হয়েছে। বিদ্যুৎ এসেছে। কলেজ হয়েছে। কিন্তু দলাদলি হাঙ্গামা নাকি বেড়ে গেছে।
কর্নেল বললেন,–গত লক্ষ্মীপুজোর সময় হাড়মটমটিয়ার জঙ্গলের কাছে ফুটবল খেলতে গিয়ে
হাত তুলে কর্নেলকে থামিয়ে কুমারবাহাদুর, বললেন,–শুনেছি। গতমাসে কেষ্ট অধিকারী এসেছিল। আপনার সঙ্গে নাকি তার আলাপ হয়েছে বলছিল। খুব পয়সা করেছে কেষ্ট। বলছিল, হংকং ঘুরে এসেছে সদ্য।
–দীপু নামে যে ছেলেটি নিখোঁজ হয়েছে, তার বাবা কুমুদ ভট্টাচার্যকে কি আপনি চেনেন?
–চিনব না মানে? আমার সুপারিশেই তো কুমুদ মাস্টারি পেয়েছিল। তা প্রায় তিরিশ-পঁয়ত্রিশ বছর আগের কথা। তখন আমি রায়গড়ের এম.এল.এ. ছিলুম। কেষ্ট বলছিল, কুমুদ রিটায়ার করেছে। এদিকে ওর ছেলে হঠাৎ জঙ্গলের ভেতর নিখোঁজ হয়ে গেল। তখন আমিই কেষ্টকে বলেছিলুম, কুমুদকে নিয়ে আপনার সঙ্গে শিগগির দেখা করো। দেখা করেনি ওরা?
–আজ সকালে ওঁরা এসেছিলেন।
কুমারবাহাদুর হেসে উঠলেন,–তাই কি আপনি আমার কাছে কোনও কু খুঁজতে এসেছেন?
কর্নেল হাসতে-হাসতে বললেন,–যদি তা-ই ভাবেন, তাহলে আপনার ধারণা কী বলুন।
–কুমুদের ছেলের ব্যাপারে?
–হ্যাঁ।
কুমারবাহাদুর একটু চুপ করে থাকার পর বললেন, আমাদের বাড়িটা সরকারকে কলেজ করতে দিয়েছিলুম। এতদিন সেখানে কলেজ হয়েছে। ওই বাড়িতে আমাদের পারিবারিক লাইব্রেরি ছিল। কুমুদ যখন বেকার, ওকে একটা দায়িত্ব দিয়েছিলুম। লাইব্রেরি আমার ঠাকুরদার আমলের। বইপত্র অগোছাল অবস্থায় ছিল। বহু দুষ্প্রাপ্য বই নষ্ট হয়ে যাচ্ছিল। তাকে সব বইয়ের ক্যাটালগ তৈরির দায়িত্ব দিয়েছিলুম। সেই সময় আমার পূর্বপুরুষের লেখা একটা সংস্কৃত কুলকারিকার খোঁজ পাওয়া যায়নি। ওতে আমাদের পূর্বপুরুষের ইতিহাস এবং প্রাসঙ্গিক বহু তথ্য ছিল।
