ভোলা ফুঁসে উঠল,–আমি স্বচক্ষে দেখেছি মঘার সঙ্গে গোপীবাবু গাবতলায় বসে কথা বলছে।
–তাই তুমি সাহস পাওনি গোপীবাবুকে চ্যালেঞ্জ করতে। অথচ তুমি ঠিক বুঝেছিলে কে বাঁয়াতবলার ভেতর থেকে আংটি হাতিয়েছে। তাছাড়া তোমার এক পায়ে জোর নেই। তাই
অবশেষে তুমি তোমার দাদার ভূত সেজে ভয় দেখাতে শুরু করলে!
জয়কুমারবাবু বললেন,–ফেলারামের মুখে গোঁফদাড়ি ছিল!
কর্নেল হাসলেন,–ভোলা নকল গোঁফদাড়ি পরলে তাকে দাদার মতো দেখাবে। তাই না?
জয়কুমারবাবু ছড়ি তুলে গর্জন করলেন,–ওরে বজ্জাত! ওরে নেমকহারাম!
কর্নেল তাকে থামিয়ে দিয়ে বললেন, আমি এখনই আসছি। কাল বিকেলে বটতলায় ঘোরাঘুরি করে আমি কিছু জিনিস আবিষ্কার করেছি। নিয়ে আসছি।
জয়কুমারবাবু বললেন,–আর কি তা আছে? ভোলার দজ্জাল বউ শৈল এতক্ষণে তা লুকিয়ে ফেলেছে।
হেমেনবাবু বললেন,–বটতলায় প্রাইভেট ডিটেকটিভ মিঃ হালদার পাহারা দিচ্ছেন।
কর্নেল বেরিয়ে গেলেন। লাইব্রেরি ঘরে কিছুক্ষণ ঘোর স্তব্ধতা এল। কালীনাথ ভোলার পাশে দাঁড়িয়ে আছে। দরজায় চারজন কনস্টেবল। সেই স্তব্ধতা না এলে জানালা দিয়ে মেয়েলি গলার কর্কশ চ্যাঁচামেচি আমরা শুনতে পেতুম না। জয়কুমারবাবু বললেন,–কালী! শৈল কাকে গালাগালি করছে দেখে আয়!
ও.সি. তপনবাবু বললেন,–কালী নয়। মনোরঞ্জনবাবু! আপনি যান। ভোলার স্ত্রীকে এখানে ডেকে আনুন।
ডাকবার দরকার হল না। কর্নেল জলকাদা মাখা একটা ছোটো চটের থলে নিয়ে ঘরে ঢুকলেন। হালদারমশাইও এসে গেলেন। তাদের পিছনে মধ্যবয়সিনী রোগা ফর্সা এক মহিলাও চাঁচাতে-চাঁচাতে ঘরে ঢুকল। সে হালদারমশাইয়ের দিকে আঙুল তুলে বলল,–ওই বাঙাল মিনসের কী সাহস! বামুনের মানতের থলেয় হাত দেয়। শাপ লাগবে না? মুখে রক্ত উঠে মরবে না? আমি আমার ভাসুরের আত্মার মুক্তির জন্য মানত দিয়েছিলুম। সেই থলে ছুঁয়ে দিল? ও বুড়োসায়েব! মানতের থলে খুললে মুখে রক্ত উঠবে বলে দিচ্ছি।
কালীনাথ হাঁকল,–চো-ও-প! তুলে বিলের জলে ছুঁড়ে ফেলব।
ততক্ষণে থলে খুলে কর্নেল প্রথমে বের করেছেন একটা ছেঁড়া দড়ির ফঁস। তারপর বের করলেন কাগজের মোড়ক। তা থেকে বেরুল নকল গোঁফদাড়ি। তারপর কর্নেল নিরেট লোহার ছোটো একটা প্যাচালো রড বের করলেন। একটু হেসে তিনি বললেন, এটাই মার্ডার উইপন। ধুয়ে ফেললেও আতশ কাঁচে দেখেছিলুম, খাঁজে-খাঁজে রক্তের চিহ্ন আছে। এই থলেটা পাঁচিলের কাছে মানকচুর ঝোঁপের ভেতর লুকোনো ছিল। নকল গোঁফদাড়ি গত রাতে বৃষ্টির সময় পরার জন্য ভিজে গিয়েছিল। এখনও ভিজে আছে। থলেতে ঘটা করে সিদুরের ছোপ দেওয়া হয়েছে। মানতের জিনিস কিনা! আসলে ফেলারাম মুখুজ্জের ভূতের হামলা চালিয়ে যাওয়ার দরকার ছিল।
কালীনাথ বলে উঠল,–ওই লোহার ডাঙস দিয়ে গাইগরুর খুঁটি পোতা হয়। গোপীবাবু খুন হওয়ার দিন বিকেলে ভোলা গাবতলার কাছে গরুকে ঘাস খাওয়াতে নিয়ে গিয়েছিল।
মনোরঞ্জনবাবু উঠে গিয়ে ভোলার দু-হাত পিছনে টেনে হাতকড়া পরিয়ে দিলেন। জয়রামবাবু ফ্যালফ্যাল করে তাকিয়ে ছিলেন। তিনি বললেন,–ভোলার হাতে এত জোর যে গোপীর খুলি ফাটিয়ে মেরেছে?
কর্নেল বললেন,–প্রতিদিন যাকে গাইগরু নিয়ে গিয়ে এই লোহার রড দিয়ে খুঁটি বসাতে হয়, তার হাত এই ওজনদার দুরমুসের ঘা মারতে পোক্ত হওয়াই স্বাভাবিক। কথা বলতে-বলতে আচমকা ভোলারাম গোপীবাবুর মাথার পেছনে দুরমুসের ঘা মেরেছিল। আংটি হরণের প্রতিশোধ নয়। খুনের উদ্দেশ্য ছিল গোপীবাবুর বেহালার ভেতর লুকিয়ে রাখা আংটি উদ্ধার। কিন্তু আংটি বেহালার ভেতর ছিল না।
.
উপসংহার
ও.সি. তপন বিশ্বাসের নির্দেশে সাবইন্সপেক্টর মনোরঞ্জনবাবু সেই থলেসহ ভোলাকে এবং দুজন কনস্টেবল শৈলবালাকে নিয়ে গেল। তপনবাবু বললেন, আমি হেমেনবাবুর গাড়িতে ফিরব। জায়গা হবে তো?
হেমেনবাবু বললেন,–নিশ্চয়ই হবে।
জয়কুমারবাবুর হাত কঁপছিল। আস্তে বললেন,–কী সাংঘাতিক কাণ্ড! কর্নেলসায়েব! আপনি কি আংটির খোঁজ পেয়েছেন?
কর্নেল পকেট থেকে একটা কাগজের মোড়ক বের করে খুললেন। মন্দিরে তখন সন্ধ্যারতি শুরু হয়েছে। বিদ্যুতের আলো ক্ষীণ! কালীনাথ হ্যাঁজাগ জ্বালতে গেল। টর্চের আলোয় ঝলমলিয়ে উঠল অভয়কুমার রায়চৌধুরির সংগৃহীত ‘রাজা সলোমনের আংটি। কর্নেল সংক্ষেপে ডাকিনীতলার ঘটনা শুনিয়ে বললেন,–এই আংটি উদ্ধার করেছেন প্রাইভেট ডিটেকটিভ মিঃ কে. কে. হালদার। আমাদের প্রিয় হালদারমশাই!
হালদারমশাই বললেন,–আংটির কথা ভাবি নাই। চরণ কইছিল, কোনও-কোনও রাত্রে গোপীবাবু গাঁজা খাইয়া একটা ডালে গিয়া বইতেন। সেখানে উনি বেহালা বাজাইতেন। এই কথায় আমার খটকা বাধছিল। ক্যান ওই ডালে বইয়া গোপীবাবু বেহালা বাজাইতেন?
কর্নেল বললেন,–এবার ভোজবাজি দেখুন! আংটির মধ্যে একটা খুবই ছোটো আর সূক্ষ্ম চাবি লুকানো আছে। এই চাবি দিয়ে সম্ভবত রুদ্রদেবের বিগ্রহের বেদি খোলা যায়। সন্ধ্যারতি শেষ হোক। তারপর আমরা মন্দিরে যাব।
জয়কুমারবাবু হাসবার চেষ্টা করে বললেন,–ঠাকুরদা তার বইয়ের শেষে ছড়া লিখেছিলেন : ‘রুদ্রদেবের পায়ের তলে। লক্ষহীরা মানিক জ্বলে।‘ হ্যাঁ–সেই রত্নহার বেদির তলায় লুকানো ছিল। আমার জামাই সুভদ্র কলকাতায় একটা ট্রেডিং কোম্পানি খুলে ব্যাংক থেকে পাঁচ লক্ষ টাকার ঋণ নিয়েছিল। ঋণের দায়ে কোম্পানি নীলাম হওয়ার মুখে আমার মেয়ে নীলা এসে আমাকে ধরল। জমিজমা বেচে সুভদ্রের ঋণ শোধ করে তাদের কাছে গিয়ে আমাকে থাকতে হবে। ছেলেদুটো তো বিদেশে। কদাচিৎ আসে। চিঠিপত্র লিখেও বাবার খোঁজ নেয় না। নীলা আর সুভদ্র প্রায়ই আসে। খোঁজখবর নেয়। তো আমি সেই রত্নহার গোপনে বের করে নীলাকে দিয়েছিলুম। বলেছিলুম–এই রত্নহার আমার ঠাকুরদার লুঠের জিনিস। রুদ্রদেবের তাই অভিশাপ লেগেছে এ বাড়িতে। এটা নিয়ে তোরা আমাকে অভিশাপ থেকে বাঁচা। তোরাও বাঁচ। রুদ্রদেবের কৃপা হয়েছিল। সে বছর জমিতে ফসলও প্রচুর পেয়েছিলুম। আমার জামাইয়ের কোম্পানি ঋণের ধাক্কা সামলে মোটামুটি ভালোই চলছে।
