কর্নেল চুরুট ধরিয়ে বললেন,–তাই ‘রাজা সলোমনের আংটি সম্পর্কে আর আপনার মাথাব্যথা ছিল না?
–ঠিক বলেছেন। এই আংটিতে বড়োজোর একভরির মতো সোনা আছে। তার দাম আর কতটুকু? গোপীটা বোকা। বেচে দিয়ে কোথাও পালিয়ে গেলে প্রাণে বাঁচত। গুপ্তধনের লোভে পড়েছিল হতভাগা!
ও.সি. তপন বিশ্বাস বললেন,–জয়কুমারবাবু! খুনের মামলার স্বার্থে এই আংটিটা আমি সিজ করতে বাধ্য হচ্ছি। কর্নেলসায়েবরা আছেন। আপনার শুভাকাঙ্ক্ষী হেমেনবাবু আছেন। আমি তাদের সামনে আংটিটা নিচ্ছি। থানায় গিয়ে সিজার লিস্টের কপি পাঠিয়ে দেব।
আপনার অভিরুচি!–বলে জয়কুমারবাবু কালীর দিকে ঘুরলেন। সে হ্যাঁজাগ জ্বেলে এনেছিল। জয়কুমারবাবু হঠাৎ আর্তকণ্ঠে বলে উঠলেন : ওরে কালী! আমরা দুজন এই পোড়োবাড়ি পাহারা দেব। এ কী হয়ে গেল রে কালী?
নকুলঠাকুর ঘরে ঢুকে বললেন,–কর্তামশাই! আমিও তো আছি। আমার কথা ভুলে গেলেন? কর্নেল উঠে দাঁড়িয়ে বললেন,–চলি জয়কুমারবাবু! আশা করি, আর আপনার বাড়িতে ভূতের উপদ্রব হবে না।
৩.১২ বত্রিশের ধাঁধা
প্রাইভেট ডিটেকটিভ কে. কে. হালদার আমাদের প্রিয় ‘হালদারমশাই’ খবরের কাগজ পড়ছিলেন। হঠাৎ তিনি কাগজটা ভাঁজ করে রেখে একটিপ নস্যি নিলেন। তারপর বললেন, –জয়ন্তবাবু তো সাংবাদিক। তাই কথাটা আপনারে জিগাই।
বললুম,–বলুন হালদারমশাই।
গোয়েন্দাপ্রবর একটু হেসে বললেন, আপনাগো কাগজে বিজ্ঞাপনে দেখি, কোনওটার হেডিং নিরুদ্দেশ। আবার কোনওটার হেডিং নিখোঁজ। ক্যান? মানে তো এক।
–এটা বিজ্ঞাপন বিভাগের লোকেদের খেয়াল। তারাই তো বিজ্ঞাপনের হেডিং দেন।
কর্নেল ইজিচেয়ারে হেলান দিয়ে একটা ইংরেজি পত্রিকা পড়ছিলেন। দাঁতে কামড়ানো চুরুটের নীল ধোঁয়া তার টাকের ওপর ঘুরপাক খেতে খেতে মিলিয়ে যাচ্ছিল। তিনি পত্রিকাটা বুজিয়ে রেখে বললেন,–জয়ন্তের জবাব হালদারমশাইয়ের মনঃপুত না হওয়ারই কথা।
হালদারমশাই সায় দিলেন,–ঠিক কইছেন কর্নেলস্যার! নিরুদ্দেশ আর নিখোঁজ। দুইরকম হেডিং অথচ একই মানে। ক্যান দুইরকম?
কর্নেল আমার দিকে তাকালেন। মিটিমিটি হেসে বললেন,–হালদারমশাই একটা গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন তুলেছেন জয়ন্ত! এটা হালকাভাবে নিও না। রীতিমতো ভাষাবিজ্ঞানের শব্দার্থতত্ত্বের মধ্যে ব্যাপারটা পড়ে।
বললুম, সর্বনাশ! এই সুন্দর সকালবেলায় ওইসব গুরুগম্ভীর তত্ত্ব আওড়াবেন না প্লিজ!
–মোটেও গুরুগম্ভীর তত্ত্ব নয় জয়ন্ত! হালদারমশাই তোমাদের দৈনিক সত্যসেবক পত্রিকার দ্বিতীয় পৃষ্ঠার বিজ্ঞাপন পড়ছিলেন। তুমিও একবার পড়ে নিলে পারো!
এবার একটু অবাক হতে হল। আজকের দ্বিতীয় পৃষ্ঠার বিজ্ঞাপনে কর্নেল কোনও রহস্যের লেজ দেখতে পেয়েছেন নাকি? কাগজটা তুলে নিয়ে কিন্তু তেমন কিছু চোখে পড়ল না। নিরুদ্দেশ শিরোনামে পর-পর দুটো বিজ্ঞাপন আছে। প্রথমটা এই :
‘বাবা অমু! তুমি শীঘ্র বাড়ি ফিরে এসো। তোমার মা মৃত্যুশয্যায়। টাকার দরকার হলে টেলিফোনে জানাও।–বাবা’
দ্বিতীয়টা এই :
‘পুঁটুদা, তুমি যা চেয়েছিলে তা-ই হবে। যেখানেই থাকো, ফিরে এসো। –ভুঁটু’
এরপর ‘নিখোঁজ শিরোনামের তলায় একটি প্যান্ট-হাফশার্ট-পরা বলিষ্ঠ গড়নের ছেলের ছবি। তার নিচে ছাপা হয়েছে :
‘এই ছবিটি শ্রীমান দীপক কুমার রায়ের। বয়স প্রায় ১৪ বছর। গায়ের রং ফর্সা। চিবুকে একটু কাটা দাগ আছে। কেউ এর সন্ধান দিতে পারলে নগদ ১০ হাজার টাকা পুরস্কার।
পীতাম্বর রায়, ৮-১ সি ঘোষপাড়া লেন, কলকাতা – ৪৬’
এরপর জ্যোতিষী এবং তান্ত্রিকদের ছবিসহ বিজ্ঞাপন। কাগজ থেকে মুখ তুলে বললুম-নাঃ! বিজ্ঞাপনের লোকেদের খেয়াল-খুশিমতো হেডিং।
কর্নেল দাড়ি থেকে চুরুটের ছাই ঝেড়ে বললেন,–হালদারমশাই ঠিক ধরেছেন। নিরুদ্দেশ আর নিখোঁজ একই ব্যাপার। কিন্তু বিজ্ঞাপনগুলো পড়ে কথাদুটোর মানেতে যে একটা তফাত আছে, তা তোমার বোঝা উচিত ছিল।
হালদারমশাই একটু উত্তেজিত হলেই ওঁর ছুঁচলো গোঁফের দুই ডগা তিরতির করে কঁপে। লক্ষ করলুম উনি উত্তেজিত। হঠাৎ সোজা হয়ে বসে বললেন,–হঃ! বুঝছি। যে স্বেচ্ছায় বাড়ি থেকে পালায়, তার হেডিং দিচ্ছে নিরুদ্দেশ। আর কোনওভাবে নিজের ইচ্ছার বিরুদ্ধে যারে বাড়িছাড়া, কইর্যা কেউ বা কারা গুম করে, কিংবা ধরেন, মার্ডার কইর্যা ফ্যালে
ওঁর কথার ওপর বলে উঠলুম–কী সর্বনাশ! হালদারমশাই; ওসব অলুক্ষুণে কথা প্লিজ বলবেন না।
কর্নেল বললেন,–নিখোঁজ ছেলেটির ছবি দেখার পর মার্ডার কথাটা শুনলে সত্যি খারাপ লাগে। কাজেই হালদারমশাই, এ প্রসঙ্গ থাক। হেডিং দুটোর প্রচলিত অর্থ বুঝেছেন, এই যথেষ্ট।
প্রাইভেট ডিটেকটিভদ্রলোককে তখনও উত্তেজিত এবং অন্যমনস্ক দেখাচ্ছিল। একটু পরে তিনি আস্তে বললেন,–কর্নেলস্যার! কর্নেল হাসলেন, আপনি কী বললেন, বুঝতে পেরেছি হালদারমশাই। নিখোঁজ ছেলেটি সম্পর্কে আপনার উৎসাহ জেগেছে।
হালদারমশাই হাসবার চেষ্টা করে বললেন,–দশ হাজার টাকার জন্য না। আমার ডিটেকটিভ এজেন্সির হাতে এখন কোনও কেস নাই, এ জন্যও না। কথাটা হইল গিয়া, এমন বিজ্ঞাপন মাইনষে দেয় কখন? যখন পুলিশ দিয়াও কাম হয় না, তখন।
–ঠিক বলেছেন।
–ভদ্রলোকের লগে সাক্ষাৎ করতে ইচ্ছা হয়।
–বেশ তো। ঠিকানা দেওয়া আছে। টুকে নিয়ে গিয়ে সাক্ষাৎ করুন।
