কর্নেল একটু হেসে বললেন, বইয়ের শেষপাতায় শেষ বাক্যের নিচে দু’লাইন ছড়া আছে। পড়েছেন?
–হ্যাঁ। ‘রুদ্রদেবের পায়ের তলে/লক্ষ হীরামানিক জ্বলে’
এই সময় কালীনাথ চা আনল ট্রেতে। ভোলা ল্যাংচাতে-ল্যাংচাতে এসে বলল,–গরুগুলো আজ খাবে কী কর্তামশাই? এখনও গ্যাদা ঘাস দিয়ে গেল না। দেখে আসব নাকি?
কর্নেল বললেন,–আচ্ছা ভোলা! তোমার স্ত্রী শৈলর হাতে তৈরি চা কি নকুলঠাকুর খান? কাল তোমাদের কর্তামশাইকে বলতে শুনলুম, ঠাকুরমশাইকে শৈল গরম চা করে দেবে। তাই জিগ্যেস করছি।
জবাব দিলেন জয়কুমারবাবু। বললেন,–খাবে না কেন? স্বজাতি যে। এ বাড়িতে তিন মুখুজ্জে ছিল। নকুল মুখুজ্জে, ফোরাম মুখুজ্জে আর এই ভোলারাম মুখুজ্জে। ফেলারাম লেখাপড়া শিখেছিল। চাকরি পেয়েছিল। ঘুষ খেতে গিয়ে হাতে-নাতে ধরা পড়ে চাকরি গেল। তখন এসে আমার কাছে আশ্রয় নিলে। ভোলাকে বাবা লেখাপড়া শেখাতে পারেননি। ওরা দু’ভাই। ওদের বাবা-ঠাকুরদা আমাদের জমিদারি সেরেস্তায় কর্মচারী ছিল। ভোলা টেনেটুনে নাম সই করতে পারে!
ভোলা গাল চুলকোচ্ছিল। মুখে বিব্রত হওয়ার ছাপ। এবার বলল,–গ্যাঁদাকে দেখে আসি।
কালীনাথ বলল, ওই গাদা ঘাসের বোঝা মাথায় নিয়ে আসছে।-বলেই সে পা বাড়াল। ফের বলল,–কর্তামশাই! থানা থেকে পুলিশের গাড়ি এসেছে। বড়ো দারোগাবাবু আসছেন। সঙ্গে ছোটো দারোগাবাবু।
একজন হাফপ্যান্টপরা উদোম গা বালক মাথায় ঘাসের বোঝা নিয়ে বারান্দার নিচে দিয়ে চলে গেল। ভোলা বলল,–এত দেরি কেন রে? গোয়ালঘরে ধোঁয়া দিতে হবে।
সে বারান্দা থেকে নামছিল। কর্নেল বললেন,–ভোলা! শোনো! তোমার সঙ্গে কথা আছে।
ভোলা হকচকিয়ে গিয়ে বলল, আমার সঙ্গে স্যার?
–হ্যাঁ। তুমি বারান্দায় একটু বসো।
ভোলা বারান্দায় একটা থামের কাছে বসল। ও.সি. তপন বিশ্বাস, এস.আই. মনোরঞ্জন পাল এবং চারজন কনস্টেবল এল। দু’জন কনস্টেবলের হাতে রাইফেল। অন্য দু’জনের হাতে দুটো ছোটো লাঠি। জয়কুমারবাবু তাঁদের আপ্যায়ন করে কালীনাথকে বললেন,–লাইব্রেরিঘরে গিয়ে বসা যাক। কালী! লাইব্রেরি খুলে দে।
লাইব্রেরিঘরে যাওয়ার সময় কর্নেল ভোলাকে ডাকলেন, তুমিও এসো ভোলা। তোমাকে কয়েকটা কথা জিগ্যেস করব।
ভোলা তবু নড়ছে না দেখে কালীনাথ তার হাত ধরে টানল। –এসো ভোলারামবাবু! তোমাকে সায়েব ডাকছেন। হাজার হলেও বামুনের ছেলে। সায়েব তোমাকে খাতির করে ডাকছেন। এসো!
লাইব্রেরিঘরে আমরা ঢুকলুম। দরজায় কনস্টেবলরা এসে দাঁড়াল। ভোলা গম্ভীরমুখে দেয়ালে ঠেস দিয়ে দাঁড়াল। কর্নেল বললেন,–আচ্ছা ভোলা! তুমি গতবছর জুন মাসে কর্তাবাবুর হুকুমে বটের ডাল কাটতে উঠেছিলে?
–আজ্ঞে হ্যাঁ।
–পা ফসকে পড়ে গিয়ে তোমার পায়ের হাড় ভেঙেছিল?
–আজ্ঞে ।
–হঠাৎ তোমার পা ফসকে গেল কেন? কোনও কারণে নিশ্চয় অন্যমনস্ক হয়েছিলে। তুমি তো আগেও কতবার বটের ডাল দালান ছুঁলে কর্তার হুকুমে কেটেছিলে। কোনওবার পা ফসকায়নি। তাই মনে হচ্ছে, নিশ্চয়ই তুমি কিছু দেখে চমকে উঠেছিলে। আর তাড়াহুড়ো করতে গিয়ে
হঠাৎ ঘুরে কর্নেল জয়কুমারবাবুকে বললেন, তার আগেই আপনার আংটি হারিয়েছিল। তাই না?
জয়কুমারবাবু বললেন, হ্যাঁ। কাল কাকের স্বভাবের কথা আপনি বলছিলেন!
কর্নেল হাসলেন–হ্যাঁ। একটা কাক বাথরুমে উঁচু জানালায় রাখা আপনার আংটি তুলে নিয়ে গিয়ে বটগাছে তার বাসায় রেখেছিল। প্রসঙ্গত বলি, আংটিতে জলস্পর্শ বারণ ছিল। তার কারণ, আংটির ভেতরে একটা লুকোনো জিনিসে মরচে ধরার সম্ভাবনা ছিল। যাই হোক, ভোলা ডাল কেটে নামবার সময় কাকের বাসায় আংটি দেখে চমকে উঠেছিল। তার দাদা ফেলারামের কাছে সে ওই আংটির গোপনকথা শুনেছিল। তাই উত্তেজনায় সে কেঁপে উঠেছিল। আংটিটা হাতিয়ে উত্তেজনার চোটে সে পা ফসকে পড়ে গিয়েছিল। কি ভোলা? তাই না?
ভোলা মুখ নামিয়ে গাল চুলকোতে থাকল।
কর্নেল বললেন,–আংটিটা তুমি অন্য কোথাও রাখতে সাহস পাওনি। তার আগে বলি–তুমি আছাড় খেয়ে পড়ার সময় কে সবার আগে তোমার কাছে গিয়েছিল?
কালীনাথ বলল,–শৈলবালা স্যার! শৈলবালা বটগাছের নিচে দাঁড়িয়ে ছিল। তার চ্যাঁচামেচি শুনে আমি দৌড়ে গিয়েছিলুম।
কর্নেল বললেন,–আংটি ভোলা তার স্ত্রী শৈলবালার হাতে দিয়েছিল। শৈলবালাকে ও.সি. তপনবাবু পরে জেরা করবেন। আমার অঙ্কটা লক্ষ করুন। হাসপাতাল থেকে ফিরে ভোলা তার দাদা ফেলারামের তাগিদে–কিংবা অন্য কোনও কারণে আংটিটা বাঁয়াতবলা ফাঁসিয়ে দিয়ে তার ভেতর রেখেছিল। এদিকে গোপীমোহন হাজরা বেহালা-বাজিয়ে মানুষ। তবলা কেন ফেঁসেছে
তার কথার ওপর জয়কুমারবাবু বললেন,–গোপী তবলা সারিয়ে আনত বরাবর। তাকে তবলাটা শিগগির সারিয়ে আনতে বলেছিলুম।
কর্নেল বললেন, তাহলে দেখা যাচ্ছে গোপীবাবু তবলার ভেতর আংটিটা দেখে তখনই আত্মসাৎ করেছিলেন। ইতিমধ্যে ফেলারামবাবু গলায় দড়ি দিয়ে মারা গেছেন। গোপীবাবু শিক্ষিত লোক। তিনি নিশ্চয়ই অভয়কুমার রায়চৌধুরির ‘আমার জীবন’ পড়েছিলেন।
জয়কুমারবাবু বললেন,–হ্যাঁ। গোপীকে আমি লাইব্রেরি দেখাশোনার দায়িত্ব দিয়েছিলুম। কারণ ফেলারাম প্রায়ই বই বা অন্যান্য জিনিস চুরি করে কোথায় বেচে আসত।
–বোঝা যাচ্ছে, গোপীবাবু গুপ্তধনের লোভেই আংটি বেচে দেননি। আজ দুপুরে আমরা মঘাডাকাতের চেলাদের কাছে ডাকিনীতলার জঙ্গলে শুনেছি, গোপীবাবু তাদের মন্দির লুঠ করার চক্রান্তে জড়িত ছিলেন। ওই ডাকাতদের ফেলারামবাবুই বলেছিলেন, মন্দিরে গুপ্তধন আছে। যাই হোক, ভোলা নিশ্চয় টের পেয়েছিল, মঘাডাকাতের সঙ্গে গোপীবাবুর চক্রান্ত হয়েছে। ভোলা! তাই না?
