কর্নেল হাসলেন,–খানিকটা তথ্য-প্রমাণ, খানিকটা অঙ্ক। দুইয়ে-দুইয়ে চার করতে পেরেছি। আপনারা দুজনে তৈরি হয়ে নিন। আমি তৈরি আছি।
সাড়ে তিনটেতে হেমেনবাবুর গাড়িতে চেপে আমরা বেরোলুম। কর্নেল প্রকাণ্ড মানুষ। অনিল-ড্রাইভারের বাঁদিকে বসলেন। আমি, হালদারমশাই আর হেমেনবাবু পেছনে বসলুম।
থানার সামনে গিয়ে দেখলুম, ও.সি. তপন বিশ্বাস পুলিশ-জিপের পাশে বেটন হাতে দাঁড়িয়ে আছেন। জিপের পেছনে ঠাসাঠাসি করে সশস্ত্র পুলিশেরা বসে আছে। ও.সি.-র পাশে এক পুলিশ অফিসার দাঁড়িয়ে ছিলেন। তিনি কর্নেলের উদ্দেশে সেলাম ঠুকলেন। তপনবাবু বললেন,–ইনি গোপীবাবুর মার্ডারকেসের আই.ও-ইনভেস্টিগেটিং অফিসার, সাব-ইন্সপেক্টর মনোরঞ্জন পাল।
কর্নেল বললেন, আমরা জমিদারবাড়িতে ঢোকার মিনিট কুড়ি-পঁচিশ পরে আপনারা ঢুকবেন। ততক্ষণ একটু তফাতে অপেক্ষা করবেন। আমবাগানের কাছে রাস্তার মোড়ে আপনারা থাকলে জমিদারবাড়ি থেকে কেউ দেখতে পাবে না।
আধঘণ্টা পরে জমিদারবাড়ির গেটে গাড়ি দাঁড় করিয়ে কনেল বললেন,–হালদারমশাই! আমরা এগোচ্ছি। কালীনাথ আমাদের দেখতে পেয়েছে। আপনাকেও চিনতে পারবে। আপনি বলবেন, ওই বটগাছটার ফল খুব মিষ্টি। আমি কয়েকটা পাকা ফল নিয়ে আসি। বলে আপনি বটতলায় থাকবেন।
হালদারমশাই অবাক হয়ে বললেন,–ওখানে খাড়াইয়া থাকুম! ক্যান?
–যথাসময়ে জানতে পারবেন। কুইক!
কালীনাথ এসে করজোড়ে প্রণাম করে বলল,–কর্তামশাই আপনার জন্য অস্থির হয়ে আছেন। কাল রাত্রে বৃষ্টির সময় উনি লাইব্রেরি ঘরের জানালায় আবার ফেলারামবাবুকে দেখেছেন।
হালদারমশাই বটগাছটার দিকে তাকিয়ে বললেন,–এমন বটগাছ কোথাও দেখি নাই! কর্নেলস্যার! দেখছেন ফলগুলি কত মোটা আর লাল টুকটুকে। আমি খাইয়া দেখছিলাম। খুব মিঠা।
বলে তিনি বাড়ির উত্তরে কম্পাউন্ড ওয়ালের কাছে বিশাল বটগাছটার দিকে চলে গেলেন। কর্নেল, আমি আর হেমেনবাবু কালীনাথকে অনুসরণ করলুম। সেই অর্ধবৃত্তাকার উঁচু বোয়াকে জয়কুমারবাবু কালকের মতো ছড়ি-হাতে দাঁড়িয়ে ছিলেন।
কালীনাথ আর ভোলা কয়েকটা চেয়ার এনে দিল। জয়কুমার বললেন,–ভোলা! শিগগির গিয়ে। কফির ব্যবস্থা কর।
ভোলা ল্যাংচাতে-ল্যাংচাতে বারান্দা দিয়ে চলে গেল। আমরা বসার পর জয়কুমারবাবু গতরাতে বৃষ্টির সময় লাইব্রেরি ঘরের জানালায় গলায় দড়ির ফাঁস আটকানো ফেলারামের আবির্ভাবের কথা বললেন। কর্নেল জিগ্যেস করলেন, আপনি গুলি করবেন বলেছিলেন। গুলি করেননি?
জয়কুমারবাবু বললেন, বন্দুকের নল ওঠাবার আগেই সে অদৃশ্য হয়ে গেল। কর্নেলসায়েব! এর একটা বিহিত করুন। আর কত উপদ্রব সহ্য করা যায়?
–বিহিত করতেই এসেছি। কিছুক্ষণের মধ্যেই ভূতটা ধরা পড়বে। তবে এবার আমার কিছু প্রশ্নের উত্তর দিন।
–বলুন!
–আপনার ঠাকুরদার নাম কী ছিল?
–অভয়কুমার রায়চৌধুরি। আমার বাবার নাম অক্ষয়কুমার রায়চৌধুরি।
–আপনার ঠাকুরদা কি কখনও বিদেশ ভ্রমণে গিয়েছিলেন?
–হ্যাঁ। প্রথম বিশ্বযুদ্ধে ব্রিটিশ সরকারের পক্ষে বাধ্য হয়ে ওঁকে স্বেচ্ছাসৈনিক হতে হয়েছিল। কথাটা অদ্ভুত শোনাবে। কিন্তু দেশীয় রাজা জমিদারদের ওপর ব্রিটিশ সরকার প্রচুর যুদ্ধ-করের বোঝা চাপিয়েছিল। অত টাকা দেওয়ার ক্ষমতা ঠাকুরদার ছিল না। তাছাড়া তার অ্যাডভেঞ্চারের নেশা ছিল। তাই তিনি ব্রিটিশ সেনাবাহিনীর পক্ষে তুরস্ক জার্মানির বিরুদ্ধে যুদ্ধ করতে গিয়েছিলেন। সেই সব কথা তাঁর লেখা ‘আমার জীবন’ বইয়ে ছিল।
–ছিল, মানে এখন বইটা কি নেই?
–ওই বদমাশ নেশাখোর ফেলারাম বইটা চুরি করে কোথায় কাকে বেচে দিয়েছিল।
–আপনি তো বইটা পড়েছিলেন?
–পড়েছি। অনেকবার পড়েছি।
–তাতে কি সেই আংটির কথা ছিল না?
জয়কুমারবাবু চাপাস্বরে বললেন,–ছিল। আংটিটা তিনি একজন মৃত তুর্কি সেনার আঙুল থেকে কৌতূহলবশে খুলে নিয়েছিলেন। পরে জানতে পারেন, ওতে সাংঘাতিক বিষ ভরা আছে। তাই আংটি খুলে বিষের গুঁড়ো ফেলে দিয়েছিলেন।
–আপনার ঠাকুরদা ব্রিটিশ সেনাবাহিনীর সঙ্গে ধনী তুর্কি বণিক আজিজ কোকার বাড়ি লুঠ করেছিলেন?
জয়কুমারবাবু অবাক হয়ে বললেন, আপনি কি বইটা পড়েছেন? বইটা কলকাতার ন্যাশনাল লাইব্রেরিতে পাওয়া যেতে পারে। দুষ্প্রাপ্য বই।
এবার আমাকে অবাক করে হেমেনবাবু বললেন, আপনার ঠাকুরদার এককপি ‘আমার জীবন আমার ঠাকুরদা অজিতেন্দ্র সিংহরায়কে উপহার দিয়েছিলেন। আজ সকালে কর্নেলসায়েবকে বইটা দিয়েছিলুম।
জয়কুমারবাবু বললেন, তাহলে লুকিয়ে লাভ নেই। আমার ঠাকুরদা আজিজ কোকার বাড়ি লুঠের সময় একছড়া নানা রত্নখচিত হার হাতিয়েছিলেন। সেই হারে যে সূক্ষ্ম নকশা ছিল, তাকে বলা হয় অ্যারাবেক্স। এ আর এ বি ই এক্স! অর্থাৎ আরবদেশের সূক্ষ্ম নকশা! বইয়ে লেখা ছিল, –‘হারছড়া আমি গোপনে এনেছিলুম। কখনও ব্রিটিশ রাজত্বের অবসান ঘটলে তা স্বাধীন ভারত সরকারের কোষাগারে উপহার দেব।‘ আমার মুখস্থ আছে। কিন্তু হেমেন! তুমি তো কখনও আমাকে এ কথা বলোনি যে, তোমাদের বাড়িতে–
বাধা দিয়ে হেমেনবাবু বললেন, আপনি তো জিগ্যেস করেননি, তাই বলিনি। ফেলারামাবাবু এই বইটাই চুরি করে কোথাও বেচেছে, তা কি আপনি আমাকে বলেছিলেন?
জয়কুমারবাবু বললেন, হ্যাঁ। তুমি ঠিক বলেছ।
