হালদারমশাই বললেন,–ভুল করছি। ঝুলি সঙ্গে লই নাই। ঝুলিতে আমার ফায়ার আর্মস আছে। কিন্তু আপনারা আইয়া পড়লেন কীভাবে? নাকি স্বপ্ন দেখতাছি?
হেমেনবাবু হাসতে-হাসতে বললেন,–কী আশ্চর্য! মিঃ হালদার যে!
হালদারমশাই বললেন,–হঃ! আর কইবেন না। চরণ কইছিল, ডাকিনীতলায় একদল ডাকাত ঘাঁটি করছে। কিন্তু ডাকাতগো পিছনে লাগার ইচ্ছা আমার ছিল না। আমার উদ্দেশ্য ছিল অন্য। এক মিনিট! ডাকিনীতলায় আমার ত্রিশুল আর ঝুলি আছে। লইয়া আসতাছি। আপনারা এদিকে আউগাইয়া যান। ডাকাতগো ঘাঁটি দেখবেন!
প্রাইভেট ডিটেকটিভ জঙ্গলের ভেতর উধাও হয়ে গেলেন। কর্নেল উলটোদিকে এগিয়ে গেলেন। কিছুদূর চলার পর দেখলুম, ওলটানো মস্ত নৌকোর মতো একটা কুঁড়েঘর। উলুকাশ দিয়ে চাল তৈরি করা হয়েছে। কাঠমোটা গাছের ডাল কেটে বানানো। দেখেই বোঝা যাচ্ছিল, এই ডেরাটা বেশিদিনের নয়।
উঁকি মেরে দেখলুম, ভেতরে ব্যানাখড়ের ওপর কয়েকটা চট বিছানো আছে। আর কিছু নেই। জিনিসপত্র সবই নিয়ে পালিয়েছে ডাকাতেরা।
কর্নেল বললেন,–হেমেনবাবু! পুলিশকে জানিয়ে দেবেন, আজ সন্ধ্যার পর যেন কুতুবপুরের জলটুঙ্গি পুলিশ ঘিরে ফেলে।
হেমেনবাবু বললেন,–তা আর বলতে? মঘাডাকাতের দল গতমাসে বাবুগঞ্জে দুটো বাড়িতে ডাকাতি করেছে। আমার বাড়িতে হামলা করতে এসেছিল। উত্তরের জানালা দিয়ে দু’রাউন্ড ফায়ার করে ভাগিয়ে দিয়েছিলুম। কিন্তু ওরা এবার জয়কুমারের গৃহদেবতার মন্দিরে হামলার চক্রান্ত করেছে। খুব ভাবনার কথা।
হালদারমশাই সন্ন্যাসীর ছদ্মবেশ ছেড়ে প্যান্টশার্ট পরে আবির্ভূত হলেন। ছদ্মবেশের সঙ্গে গেরুয়া ঝুলি ওঁর পলিথিনের ব্যাগে ঢুকেছে। কিন্তু ত্রিশূলটা নেই। তিনি বললেন,–চরণ কইছিল এই কুঁড়েঘরের কথা। সে গোপনে দেখছিল একদিন। তো কাইল রাত্রে বৃষ্টির সময় টর্চের আলো ফেলতে-ফেলতে এখানে আইলাম। দেখলাম, কেউ নাই। হালারা আইজ ভোরবেলা আইছিল। আমি আরামে রাত কাটাইয়া খুব ভোরে ডাকিনীতলায় গিছলাম।
বললুম,–আপনার ত্রিশূল কোথায় গেল হালদারমশাই?
গোয়েন্দাপ্রবর হাসলেন,–ত্রিশূল অর্ডার দিয়া বানাইয়া লইছি। পার্ট বাই পার্ট খুইল্যা ব্যাগে রাখা যায়। মড়ার খুলিটা প্লাস্টিকের।
কর্নেল বললেন, আপনি ডাকিনীতলায় রাত্রি জাগতে এসেছিলেন কেন? হালদারমশাই চাপাস্বরে বললেন,–চরণ কইছিল, গোপীবাবুরে সে গাঁজার লোভে কোনও-কোনও রাত্রে ডাকিনীতলায় লইয়া আইত। তারপর গোপীবাবু ডাকিনীর গাছের ডালে উঠতেন। বেহালা বাজাতেন! গোপীবাবুর গাছের ডালে বইস্যা বেহালা বাজানোর কথায় আমার খটকা বাধছিল। তাই কাল সন্ধ্যার পর ডাকিনীতলায় আইছিলাম। কথামতন চরণ নৌকা লইয়া খাড়া ছিল। তার লোভ গাঁজার। আমি তারে পাঁচ টাকা দিয়ে কইলাম, তুমি যেখানে হইতে পারো, গাঁজা লইয়া আও। আমি ধ্যানে বসি। চরণ গাঁজা কিনতে গেল। তখন আমি গাছে চড়লাম। যে-ডালে বইয়া গোপীবাবু বেহালা বাজাতেন, চরণ দেখাইয়া দিছিল। টর্চের আলোয় দেখি, ডাল যেখানে গাছের কাণ্ড হইতে বারাইছে, সেই জোড়ের মুখে কালো এক ইঞ্চি পিচের মতো জিনিস ঠাসা। ছুরির ডগা দিয়া উপড়াইয়া দেখি–এই দেখেন, কী লুকানো ছিল!
হালদারমশাই প্যান্টের পকেট থেকে যা বের করলেন, তা দেখে আমি প্রায় চেঁচিয়ে উঠলুম, –এই তো সেই কিং সলোমন’স রিং। রাজা সলোমনের আংটি!
.
সাত
হেমেনবাবুর পানসি নৌকোয় চেপে আমরা তাঁর বাড়ি পৌঁছলুম। তখন দুটো বেজে গেছে। খাওয়ার পর হালদারমশাই বললেন,–ইরিগেশন বাংলো হইতে কাইল লাঞ্চ খাইয়াই চেক আউট করছি। অরা কইল, পেমেন্ট হেমেনবাবু করবেন। আপনি শুধু বিলে সই করেন। এটা কেমন কথা?
হেমেনবাবু বললেন,–ও নিয়ে চিন্তা করবেন না মিঃ হালদার! আপনি আমার গেস্ট।
কর্নেল চুরুট ধরিয়ে সেই তুর্কি আংটি ‘কিং সলোমন’স রিং’ আতশ কাঁচ দিয়ে পরীক্ষা করছিলেন। একটু পরে তিনি কিটব্যাগ থেকে একটা খুবই ছোটো ভ্রু-ডাইভারের মতো জিনিস বের করলেন। তারপর একটা খবরের কাগজ টেবিলে বিছিয়ে তার ওপর আংটিটা রেখে তিনি সেই জিনিসটা দিয়ে আংটির ডিমালো অংশের একপাশে চাপ দিলেন। অমনি ডিমালো অংশের খাপ খুলে গেল। ভেতরে বিষের গুঁড়ো থাকবে ভেবেছিলুম। তেমন কিছু দেখলুম না। কর্নেল আংটিটা উপুড় করে ঠুকতেই ইঞ্চিটাক লম্বা সরু একটা চাবি কাগজে পড়ল। অমন খুদে চাবি এ যাবৎ কোথাও দেখিনি।
গোয়েন্দাপ্রবর উত্তেজিত হয়ে উঠেছিলেন। বললেন,–ওইটুকখান চাবি কী কামে লাগবে?
কর্নেল বললেন,–সেকালের কারিগরের দক্ষতা দেখলে অবাক হতে হয়। এই খুদে চাবিটা কোনও বিশেষ পদ্ধতিতে তৈরি। ধাতু বিশেষজ্ঞরা বলতে পারবেন, এটা কোন-কোন ধাতুর সংমিশ্রণে তৈরি করা হয়েছিল।
হেমেনবাবু বললেন,–ওটা নিশ্চয় কোনও তালা খোলার চাবি?
–ঠিক ধরেছেন। খুদে চাবিটা আংটিতে ঢুকিয়ে আগের মতো আটকে দেওয়া যাক। ততক্ষণে আপনি থানার ও.সি.-কে ফোন করে জানিয়ে দিন, আমরা এখনই যাচ্ছি। সঙ্গে পুলিশ ফোর্স এবং অফিসার নিয়ে উনি যেন তৈরি থাকেন। গোপীবাবুর হত্যাকারীর জন্য অবশ্যই ওঁকে হাতকড়া নিয়ে যেতে হবে। আর মঘার দলকে আজ কুতুবপুরের জলটুঙ্গিতে পাকড়াও করার কথাও ও.সি.-কে বলবেন।
হেমেনবাবু ঘর থেকে বেরিয়ে গেলেন। হালদারমশাইয়ের গোঁফ যথারীতি তিরতির করে কঁপছিল। তিনি চাপাগলায় বললেন,–খুনিরে চিনলেন ক্যামনে কর্নেলস্যার?
