কর্নেলের চিৎকার শুনলুম—মিঃ দীক্ষিত! এখানে আসুন।
আমি পা বাড়িয়েছি সবে, সেপাইরা সবাই একসঙ্গে টর্চ জ্বলেছে—দেখি পাশের ঝোপ ঠেলে সেই ষাঁড়টা বেরিয়ে আসছে—হ্যাঁ, আমার দিকেই।
অমনি ভূতের ভয়, এই ভূতুড়ে কাণ্ডকারখানা, সব কিছু মুহূর্তে ভুলে তক্ষুনি দৌড় দিলুম। সন্ধ্যাবেলায় যেভাবে দৌড়েছিলুম, ঠিক সেভাবেই।
ঠাহর করে নদীর ধারে পৌঁছে তখন টর্চ জ্বালালুম। ষাঁড়টাকে পিছনে দেখতে পেলুম না। কিন্তু দূরে দেয়ালের ওখানে আবার মুহুর্মুহু গুলির আওয়াজ শুনতে শুনলুম। টর্চের আলোও ঝলকে উঠল বারবার। তারপর প্লেনের আওয়াজ শুনলুম। কিন্তু দেখতে পেলুম না প্লেনটা।
বোবাধরা গলায় চেঁচিয়ে উঠলুম—মাধোরাম! মাধোরাম!
সাড়া এল—বাবুজি বাবুজি! আপ কিধার হ্যায়?
সে রাতে কর্নেল, দীক্ষিত এবং সেপাই তিনজন ফিরে এলেন যখন, তখন রাত প্রায় তিনটে। হ্যাসাগ জ্বালা হল। সেই আলোয় দেখি, ওঁরা একগাদা তার, প্রকাণ্ড ব্যাটারি সেট, বাল্ব, টেপরেকর্ডার মাইক্রোফান এনেছেন সঙ্গে। ব্যাপার কী? তারপর আমার পিলে চমকাল আবার। কর্নেল দস্তানা পরা হাতে সেই কঙ্কালটার হাত ধরে আছেন এবং সেটা মাটিতে আধখানা গড়াচ্ছে। গড়াচ্ছে—অর্থাৎ আসামিকে টানতে টানতেই এনেছেন, যেন আসতে চায়নি—মাটিতে লুটিয়ে আনতে হয়েছে ব্যাটাকে। আমি ফ্যলফাল করে তাকিয়ে রইলুম।
কর্নেল বললেন—জয়ন্ত, আশা করি রহস্যটা টের পেয়ে গেছ এখন।
জোরে মাথা দোলালুম।—পাইনি।
—পাওনি? তোমার ভয়টা আসলে এখনও কাটেনি। বলে কর্নেল তাবুর সামনেকার নিভন্ত আগুনে কয়েকটা কাঠ ফেলে দিলেন। আগুন জ্বলে উঠল। ক্যাম্পচেয়ার বের করে তার সামনে বসে চুরুট ধরালেন।
দীক্ষিত বললেন—তাহলে গাড়ি নিয়ে অর্জুন চলে যাক, কর্নেল। রেডিওমেসেজ পাঠানোর ব্যবস্থা করুক।
কর্নেল বললেন—অবশ্যই। হেলিকপ্টারটা পাকড়াও করা যাবে অন্তত। মালগুলো হয়তো পাচার হয়ে যাবে।
হতভম্ব হয়ে বললুম—মাই ডিয়ার ওল্ড ম্যান, ব্যাপারটা খুলে বলবেন কি?
কর্নেল হাসলেন।-এখনও খুলে বলতে হবে? এ স্মাগলিংয়ের কারবার, জয়ন্ত। স্রেফ চোরাচালানী মালের ব্যাপার। গাঁজা আফিং চরস কোকেন এসব মাদকদ্রব্য এই অখাদ্য এলাকায় চোরাচালানীরা এনে ওই গুৰ্গিন খাঁর দেয়ালে একটা গুপ্ত জায়গায় মজুত করে। ব্যাটারি থেকে বিদ্যুতের সাহায্যে দেয়ালের মাথায় লাল বা জেলে হেলিকপ্টারকে সংকেত দেয়। কখনও স্রেফ হলদে আলোও দেখায়। এই হেলিকপ্টার তখন মাঠে নেমে পড়ে। এরা মালগুলো ওতে পৌঁছে দেয়। আমাদের দুর্ভাগ্য শয়তানগুলোকে তাড়া করতেই ব্যস্ত ছিলুম, হেলিকপ্টারটা গতিক বুঝে উড়ে পালাল।
বললুম—এই কঙ্কালটা? আর ওই অট্টহাসি?
কর্নেল বললেন—কঙ্কালটা নকল। এতে দুর্গন্ধ এমিনো অ্যাসিড মাখানো আছে। চোরাচালানীদের কেউ এটা নিয়ে এসেছিল আমাদের তাঁবুতে। ভয় দেখাতে চেয়েছিল। আর আওয়াজ হত একটা টেপরেকর্ডারে। মাইক্রোফোন ফিট করা ছিল দেয়ালে। নির্বিঘ্নে চোরাচালানী লেনদেনের ঘাঁটি গড়ার জন্য ব্যাটাদের এতসব আয়োজন। যাক গে! মাথোরাম কফি বানাও!
১.১১ টুপির কারচুপি
কর্নেল নীলাদ্রি সরকারের ফ্ল্যাটে আড্ডা দিতে গিয়েছিলুম। কর্নেল ষাট-বাষট্টি বছরের বুড়ো। মাথায় টাক ও মুখে দাড়ি আছে। একেবারে সায়েবদের মতো চেহারা। ভারি অমায়িক আর হাসিখুশি মানুষ। একা থাকেন।
কিন্তু বুড়ো হলে কী হবে!
এখনও ওঁর গায়ে পালোয়ানের মতো জোর আছে। দৌড়ে পাহাড়ে চড়তে পারেন। বাঁ হতে রাইফেল ছুড়ে বাঘ মারতে পারেন। পারেন না কী, তাই-ই বলা কঠিন। সারাজীবন নানা দেশে বিদঘুটে অ্যাডভেঞ্চারে গেছেন—জঙ্গলে, সমুদ্রে, দ্বীপে, বরফের দেশে। দ্বিতীয় মহাযুদ্ধে আফ্রিকা আর বর্মা ফ্রন্টে যুদ্ধ করেছেন। অবসর নেওয়ার পর ওঁর হবি হচ্ছে দুর্লভ জাতের পাখি, পোকামাকড় ও প্রজাপতি খুঁজে বেড়ানো। এজন্যে প্রায়ই উনি পাহাড়ে জঙ্গলে বেরিয়ে পড়েন। সঙ্গী বলতে আমি—এই জয়ন্ত চৌধুরি। আমার মতো একজন যুবকের সঙ্গে ওই বুড়োর গলাগলি ভাব যে কতটা, না দেখলে বিশ্বাস হবে না কারও।
এই কর্নেলবুডোর আরেক বাতিক গোয়েন্দাগিরি। অনেক বড় বড় ডাকাতি আর খুনের হিল্লে করে খ্যাতি কুড়িয়েছেন। শুধু পুলিশ মহলের নয়, সবখানেই ওর নামটা বিলক্ষণ চেনা। কেউ যদি বলে বুড়ো ঘুঘু তাহলে বুঝতে হবে সে নির্ঘাৎ কর্নেলের কথাই বলছে।
সেই রোববারের সকালে ওঁর বাসায় গেলুম, তার পিছনে একটা উদ্দেশ্যও ছিল। আমি দৈনিক সত্যসেবক পত্রিকার এক রিপোর্টার। আমাদের কাগজেই একটা অদ্ভুত খবর বেরিয়েছিল। জানতুম, অদ্ভুত যা কিছু—তাতেই কর্নেলের কৌতুহল। উনি নাক না গলিয়ে থাকতে পারবেন না। আর এই খবরটা শুধু অদ্ভুত নয়, রীতিমতো অবিশ্বাস্য।
তো, আমাকে দেখেই বুড়ো হাসতে হাসতে বললেন—এস জয়ন্ত; এক্ষুনি তোমার কথা ভাবছিলুম। নিশ্চয় তুমি সেই ভূতুড়ে টুপির ব্যাপারে খুব উত্তেজিত হয়ে পড়েছ।
বললুম—ভূতুড়ে টুপি, না জ্যান্ত টুপি?
–একই কথা। বলে কর্নেল খবরের কাগজ খুলে একবার চোখ বুলিয়ে নিলেন। তারপর বললেন-ব্যাপারটা বেশ মজার, তাই না জয়ন্ত? চোঙার মতো সুঁচলো ডগাওয়ালা এই ধরনের টুপি ক্রিস্টমাসের পরবে পরা হয়। আবার সার্কাসের ক্লাউনরাও এমন টুপি পরে ভঁড়ামি করে। সেই টুপি কি না ইচ্ছেমতো চলে বেড়ায়। লাফায়। নাচে। বিছানায় ঘুমোয়। খাবার টেবিলে গিয়ে খেতে বসে। ইজিচেয়ারে আরামে গড়ায়। খাসা! ভাবা যায় না! টুপির মালিক যে ঘাবড়ে যাবেন, তাতে সন্দেহ কী!
