হেমেনবাবু বললেন,–কর্নেল! অকারণ ঝুঁকি নিয়ে লাভ কী?
পবন বলল,–জঙ্গলের আড়াল থেকে ডাকাতরা গুলি ছুঁড়তে পারে স্যার!
কর্নেল বললেন,–তাহলে আপনারা এখানে অপেক্ষা করুন। আমি চুপিসাড়ে গিয়ে দেখে আসি কোথায় পথটা শেষ হয়েছে।
কর্নেল হেমেনবাবু বা পবনের নিষেধ শুনলেন না। অগত্যা আমরা তিনজনে তাকে অনুসরণ করলুম। কিছুদূর এগিয়ে যাওয়ার পর কর্নেল ঘুরে ঠোঁটে আঙুল রেখে ইঙ্গিতে বললেন–কথা বলা চলবে না।
উঁচু গাছের পর ঝোঁপঝাড়ের ভেতর পথটা ডাইনে ঘুরেছে। সেই ঝাকের মুখে গুঁড়ি মেরে এগিয়ে কর্নেল থামলেন। এবার কাদের চাপাগলায় কথাবার্তা শোনা গেল। আমরা কর্নেলের কাছে গিয়ে গুঁড়ি মেরে বসলুম। স্যাঁতসেঁতে ঘাসে ঢাকা মাটি। রাতের বৃষ্টির জল ঝোঁপের নিচের পাতায় আটকে ছিল। আমাদের ভিজিয়ে দিল। কিন্তু তখন আমাদের কান কাদের কথাবার্তার দিকে। এইসব কথা কানে আসছিল :
-–ফেলারামবাবুর কথা মিথ্যা হতেই পারে না। গতরাত্রে বৃষ্টির সময় সুযোগ ছিল।
–কিন্তু কালী ব্যাটাচ্ছেলে যে সারা রাত জেগে থাকে। ওর চোখে এড়িয়ে বাড়ি ঢোকা কঠিন।
–কালী করবেটা কী? পাইপগানের গুলিতে ওর মুণ্ডু উড়িয়ে দেব।
–তা না হয় দিলুম। কিন্তু বুড়োকর্তা দোতলা থেকে বন্দুকের গুলি ছুড়বে যে! কাল তোরা বৃষ্টির সময় পাঁচিল ডিঙোতে চাইছিলি। অত উঁচু পাঁচিল ডিঙোতে গিয়ে ঠ্যাং ভেঙে পড়ে থাকতে হবে।
–হ্যাঁ রে! গুপীবাবুও তো বলেছিল মন্দিরে মেঝেতে সাত রাজার ধন লুকোনো আছে।
–আছে তো বটেই। তা না হলে কি ফেলারামবাবু মারা পড়ে? গুপীবাবুরও একই দশা হয়?
–গুপীবাবু আমাকে বলেছিল, কালীর এক ঘুসিতেই ফেলারাম পটল তুলেছে! হাঃ হাঃ হাঃ!
–হাসিস নে! রাগে আমার মাথা খারাপ হয়ে আছে। তারপর গুপীবাবুও মারা পড়ল।
–মাইরি! গুপীবাবুকে গাবতলায় কে মারল কে জানে! কেন মারল বুঝি না!
–ন্যাকা! বুঝিস না কিছু? ফেলারাম মুখুজ্জে বুড়োকর্তার ঠাকুরদার কী বই পড়ে জানতে পেরেছিল মন্দিরে সাত রাজার ধন লুকোনো আছে। গুপীবাবুকে ফেলারামবাবু জুটি করতে চেয়েছিল। দু’জনই মারা পড়ল। পুলিশ মাইরি বুড়োকর্তার টাকা খেয়ে সব জেনেও চুপ করে আছে।
–ফেলারামবাবুর ভূতের গুজব রটেছে। ব্যাপারটা বোঝা যায় না। হা রে! আমাদের কেউ রাতবিরেতে ভূত সেজে ভয় দেখাচ্ছে না তো?
–বলা যায় না। ঘরের শত্রু বিভীষণ থাকতেই পারে। ভেবেছে, জমিদার বাড়িতে ভয় দেখিয়ে একা মন্দিরের ধনরত্ন বাগিয়ে নেবে।
–আমরা ছ’জন আছি দলে। ছ’জনই এখানে আছি। ডাকিনীমায়ের দিব্যি খেয়ে প্রত্যেকে বল–
–চুপ! সেই সাধুবাবা এদিকে আসছে। শোন। লোকটা সাধু নয়। সাধু সেজেছে! কিছু মতলব আছে।
–উঠে পড় সবাই। কুতুবপুরের জলটুঙ্গিতে মঘাদা আসবে বলেছে। মঘাদা যা বলে, তা-ই করব। আর সাধুবাবার কথা বলছিস? যাওয়ার সময় ওকে ল্যাং মেরে দেখি, সত্যি-সত্যি সাধু নাকি।
–আই! ওদিকে যাসনে। নৌকো এদিকে রেখেছি। বাবুগঞ্জের হেমেনবাবুর পানসি দেখেছি ওদিকে কোথায় যাচ্ছে।
-চুপ! উঠে পড়। আর নয়। আরে! সাধুবাবা কি লুকিয়ে আমাদের কথা শুনছিল নাকি? তবে রে!
তারপর আর কোনও কথা শোনা গেল না। এলোমেলো উত্তাল বাতাসে গাছপালার শব্দ অন্য কোনও শব্দ ঢেকে দিল। কর্নেলের ইশারায় আমরা ওই অবস্থায় বসে রইলুম। মিনিট পাঁচেক পরে হেমেনবাবু চাপাস্বরে বললেন,–চিনতে পেরেছি। ওরা মঘাড়াকাতের চেলা। আমার মনে হচ্ছে, ফেলারামবাবু গোপীবাবু মন্দিরের গুপ্তধনের আশায় মঘাডাকাতের দলের সাহায্য নিতে চেয়েছিল।
কর্নেল তাকে থামিয়ে বললেন,–সন্ন্যাসীর ওপর ওরা হয়তো হামলা করেছে! সন্ন্যাসী একা। ওরা ছ’জন। চলুন। ব্যাপারটা দেখি!
ঝোঁপের ভেতর দিয়ে গুঁড়ি মেরে এগিয়ে যেতে-যেতে কর্নেল আবার চাপাস্বরে বললেন,–হেমেনবাবু! দরকার হলে ওদের মাথার ওপর দিয়ে ফায়ার করবেন! জয়ন্ত! তোমার ফায়ার আর্মস বের করো! পবন! তুমি আমাদের পেছনে থাকবে।
উত্তেজনায় অস্থির হয়ে উঠেছিলুম। হালদারমশাইয়ের কাছে তার রিভলভার থাকার কথা। কিন্তু রিভলভার বের করার সুযোগ পাবেন কি? ছ’জন ডাকাতের সঙ্গে একা লড়বেন কী করে? ওরা ওঁকে প্রাণে মেরে ফেলতেও পারে।
এবার একটুকরো ফাঁকা ঘাসের জমি। তারপর উঁচু-নিচু গাছের ঘন জঙ্গল। বর্ষায় জঙ্গল দুর্ভেদ্য হয়ে আছে। তার ওদিকে কোথাও হালদারমশাইয়ের গর্জন শোনা গেল,–হালাগো গুলি কইরা মারুম! ছাড়। ছাড় বলছি। খাইসে! হালারা সত্যই ডাকাত। আমারে বান্ধিস ক্যান তোরা?
কর্নেল ইশারায় হেমেনবাবুকে শূন্যে ফায়ার করতে বললেন। তারপর ঝোঁপঝাড়ের ভিতর দিয়ে তিনি ছুটে গেলেন। তাঁকে অনুসরণ করলুম আমরা। পবন গর্জে উঠল,–মুণ্ডু কেটে বলি দেব। আমার বাবাও ডাকাত ছিল। আমি গগন ডাকাতের ছেলে!
এতক্ষণে দেখলুম, হালদারমশাই একটা গাছের গুঁড়ির সঙ্গে বাঁধা আছেন। কিন্তু তার জটাজুট খসে পড়েনি। ডাকাতরা তাঁর দাড়িও ওপড়ায়নি। সম্ভবত সে-সুযোগ পায়নি। অতর্কিতে ঝোঁপ থেকে ঝাঁপিয়ে পড়ে তাকে বেঁধে ফেলেছে। তারপর হেমেনবাবুর গুলির শব্দে ভয় পেয়ে পালিয়েছে।
হেমেনবাবু বললেন,–পবন! তুমি তোমার খুড়োকে গিয়ে দ্যাখো। তার বিপদ দেখলে ডাকবে।
পবন চলে গেল। কর্নেল ততক্ষণে কিটব্যাগ থেকে তার জঙ্গল-নাইফ বের করে দড়ি কেটে গোয়েন্দাপ্রবরকে মুক্ত করলেন। বললেন, আপনার ঝুলি কোথায়?
