–আপনারা কি গঙ্গার বাঁধে হাঁটতে-হাঁটতে গিয়েছিলেন?
–হ্যাঁ। এবার যাব হেমেনবাবুর পানসি নৌকোতে।
–সাবধান কর্নেল! কিছুক্ষণ আগে বেচু বেড-টি দিতে এসে বলল, গতবছর ডাকিনীতলায় একটা লোক গিয়ে রক্তবমি করে মারা পড়েছিল।
কর্নেল হাসলেন,–লোকেরা একটু বাড়িয়ে বলে। হেমেনবাবুর কাছে শুনেছি, একটা লোক চুরি করে কাঠ কাটতে গিয়েছিল ডাকিনীতলার জঙ্গলে। সাপের কামড়ে মারা পড়েছিল।
শিউরে উঠলুম,–সর্বনাশ! সন্ন্যাসীবেশী হালদারমশাই কোনও কারণে ওখানে রাত কাটাতে গেলে সাপের পাল্লায় পড়বেন!
কর্নেল বাথরুমের দিকে পা বাড়িয়ে বললেন,–হালদারমশাই একসময় জাঁদরেল দারোগাবাবু ছিলেন। রাতবিরেতে বনবাদাড়ে চোর-ডাকাতের খোঁজে বিস্তর হানা দিয়েছেন। সাপ সম্পর্কে তার সতর্কতা স্বাভাবিক। যাই হোক, আমরা নটা নাগাদ ব্রেকফাস্ট করে বেরুব।
হেমেনবাবুর বাড়ির উত্তরে বাঁধানো ঘাটে একটা পানসি নৌকো বাঁধা ছিল। আমরা সেই পানসিতে চাপলুম। পেছনে হালের মাঝি, সামনে দাঁড়ের মাঝি। হেমেনবাবুর হাতে দোনলা বন্দুক। তাঁকে জিগ্যেস করলুম,–বিলের জলে শানবাঁধানো ঘাট কীভাবে তৈরি করেছেন?
হেমেনবাবু বললেন,–কোনও-কোনও বছর গ্রীষ্মকালে বিলের জল কমে যায়। ওই ঘাট থেকে দূরে সরে যায়। বছর দশেক আগে এলাকায় ভীষণ খরা হয়েছিল। সেই সুযোগে পাকাঘাট তৈরি করেছিলুম।
কর্নেল একটু হেসে বললেন,–জয়ন্ত একটু চিন্তা করলেই কথাটা বুঝতে পারত। সত্যি হেমেনবাবু! জয়ন্ত কীভাবে সাংবাদিকতা করে, আমার কাছে এটা এখনও রহস্য।
মনে-মনে চটে গিয়ে বললুম, ইঞ্জিনিয়াররা জলভরা নদীতে ব্রিজ তৈরি করেন। তাই আমি ভেবেছিলুম, সেইভাবেই ঘাটটা তৈরি করা হয়েছে। কিন্তু তাতে প্রচুর টাকা খরচ হয়। তাই
আমার কথা চাপা পড়ল কর্নেলের কথায়। বাইনোকুলারে তিনি দূরে একটা জলটুঙ্গি দেখতে-দেখতে বলে উঠলেন,–কী আশ্চর্য! সেই সন্ন্যাসী একটা গাছের তলায় ধুনি জ্বেলে বসে আছেন দেখছি! ওখানে একটা ছোটো ছিপনৌকো বাঁধা আছে। কোনও শিষ্য নৌকোটা গুরুদেবের সেবার জন্য দিয়েছেন হয়তো!
হেমেনবাবু বললেন,–নৌকোটা তাহলে ঝাঁপুইহাটির চরণ-জেলের। গাঁজার প্রসাদ পেতে এবার চরণ সন্ন্যাসীর সঙ্গ ধরেছে।
বিলের জল উত্তাল বাতাসে দুলে উঠছিল। যত পানসি নৌকো এগোচ্ছে, ঢেউ ক্রমশ বাড়ছে। কর্নেল ছইয়ে হেলান দিয়ে টাল সামলাচ্ছিলেন। আকাশে আজ ভাঙাচোরা মেঘ। মাঝে-মাঝে উজ্জ্বল রোদ্দুর ঝলসে উঠছে। জলটুঙ্গিটা প্রায় এক কিলোমিটার দূরে। খালিচোখে চাপ-চাপ সবুজের পুঞ্জ দেখাচ্ছিল। হঠাৎ কর্নেল বললেন,–হেমেনবাবু! মাঝিদের বলুন, আমরা সোজা উত্তরে এগিয়ে ডাকিনীতলার পশ্চিমদিকে নামব। সন্ন্যাসীর ধ্যানভঙ্গ করা উচিত হবে না। তাছাড়া গগনবেড় পাখিটাকে ওইদিকেই জলটুঙ্গিতে যেতে দেখেছি।
হেমেনবাবু সেইমতো নির্দেশ দিলেন। তারপর আমাকে বললেন,–বুঝলেন জয়ন্তবাবু, আজকাল আইন হয়েছে, পাখি বা বন্য জীবজন্তু মারা চলবে না। তবে আমি বহুবছর আগে পাখি শিকার করা ছেড়ে দিয়েছি। বন্দুকটা নিয়েছি অন্য কারণে। বিলের কোনও-কোনও জলটুঙ্গিতে ডাকাতদের ডেরা থাকে। জেলেদের ওরা কিছু বলে না। জেলেদের সঙ্গে ওদের শর্ত হল, জেলেরা ওদের কথা গোপন রাখবে। তাহলে জেলেরা নিরাপদে মাছ ধরতে পারবে। কিন্তু আমাকে জলডাকাতরা শত্রু মনে করে। ওদের হাতেও আজকাল ফায়ার আর্মস থাকে।
বললুম,–সর্বনাশ! আপনাকে দেখলে তাহলে ওরা যদি গুলি ছোড়ে?
হেমেনবাবু হাসলেন,–ডাকিনীতলার জলটুঙ্গিতে ডাকাতরা ডেরা পাতে না। কারণ ওই জলটুঙ্গিটা ঝাঁপুইহাটি গ্রামের কাছে। খালিচোখেই পুলিশ ওদের দেখতে পাবে। তাছাড়া ডাকাতরাও গ্রাম্য লোক। ডাকিনী সম্পর্কে ওদের মনে আতঙ্ক আছে। তাই চৈত্র সংক্রান্তির রাতে গোপনে ডাকিনীতলায় মানত দিতে আসে।
বাতাস বইছিল পূর্বদিক থেকে। তাই আমাদের নৌকো উত্তর-পশ্চিম দিকে দ্রুত এগিয়ে যেতে পারছিল। কাছে ও দূরে জেলেনৌকো দেখতে পাচ্ছিলুম। ডাকিনীতলার জলটুঙ্গির পশ্চিমে গিয়ে এবার সামনে থেকে বয়ে আসা বাতাসের চাপে নৌকোর গতি কমে গেল। কর্নেল বাইনোকুলারে এখন সম্ভবত গগনবেড় পাখি খুঁজছিলেন।
ডাকিনীতলার জলটুঙ্গির পশ্চিমদিকে পানসি যখন ভিড়ল, তখন প্রায় বারোটা বাজে। হেমেনবাবু দাঁড়ের মাঝিকে বললেন,–পবন! তোমার খুড়ো পানসিতে বসে বিশ্রাম নিক। তুমি দা আর লাঠি নিয়ে আমাদের সঙ্গে চলো। এখানে ঝোঁপঝাড় কম। দায়ে কেটে পথ করতে হবে। লাঠি বাঁ-হাতে রেডি রাখবে। সাপের উপদ্রব আছে শুনেছি।
পবন বলিষ্ঠ গড়নের যুবক। কষ্টিপাথরে গড়া যেন তার শরীর। গলায় শখ করে রুপোর সরু হার ঝুলিয়েছে। তাতে একটা ছোটো লকেটে কোনও সাধুবাবার ছবি দেখলুম। বাঁ-বাহুতে একটা তামার মাদুলি লাল সুতোয় বাঁধা আছে। সে এক লাফে লাঠি আর লম্বাটে দা হাতে নিয়ে নেমে একটা গাছের গুঁড়িতে নৌকোর কাছি শক্ত করে বেঁধে দিল। তারপর বলল,–বাবুমশাই! ওই দেখুন ঝোঁপঝাড়ের ভেতর পায়ে-চলা পথ। এ তো আশ্চর্য ব্যাপার! এদিকে নৌকো ভিড়িয়ে কারা চলাচল করে। ডাকাতরা এখানে ঘাঁটি করেনি তো?
কর্নেল নৌকো থেকে নেমে বাইনোকুলারে খুঁটিয়ে দেখে বললেন, সামনে ঘন জঙ্গল দেখছি। পথটা চলে গেছে জঙ্গলের মাঝখান দিয়ে। দেখা যাক, ডাকাতরা কীভাবে আমাদের অভ্যর্থনা করে।
