তখন রাত প্রায় সওয়া আটটা। কর্নেল বললেন,–আরেক দফা কফি খাব রাত নটা নাগাদ। অসুবিধে না হলে ডিনার খাব রাত দশটায়।
হেমেনবাবু বলে গেলেন, আপনার যা অভিরুচি!
বৃষ্টি বন্ধ হওয়ার পর থেকে গুমোট গরম টের পাচ্ছিলুম। বাবুগঞ্জে বিদ্যুতের অবস্থা ভালো। ফ্যানের নিচে বসে বললুম,–আমি একটা অঙ্ক কষেছি কর্নেল!
কর্নেল টুপি খুলে ইজিচেয়ারে বসে বললেন,–বলো! শোনা যাক।
-জয়কুমারবাবুর ঠাকুরদার তুর্কি আংটির ভেতর এমন কোনও সূত্র লুকোনো আছে, যার সাহায্যে মন্দিরে রুদ্রদেবের বেদির তলায় লুকোনো গুপ্তধন উদ্ধার করা যায়।
–ধরো, তোমার অঙ্কটা ঠিক। তাহলে আংটি যে পেয়েছে বা হাতিয়ে নিয়েছে, সে গুপ্তধন আত্মসাৎ করে কেটে পড়ত। ফেলারারামের প্রেতাত্মা তা নিশ্চয়ই টের পেত। সে এখনও আংটি চাইতে হানা দিত না।
–আংটি এখনও কেউ পায়নি। কারণ নিচের তলার বাথরুমের জানালা থেকে কোনও কাক আংটি নিয়ে গিয়ে তার বাসায় রেখেছিল। আংটি হয়তো এখনও কাকের বাসাতেই আছে।
–আংটি কাক তুলে নিয়ে গেছে গতবছর জুন মাসে। কাকেরা প্রতিবছর নতুন করে বাসা বানায়। বাসা বদলাতেও দেখেছি আমি।
–তাহলে কোথাও ঝোঁপজঙ্গলে পড়ে আছে। কিংবা কাদার তলায় চলে গেছে। বরং বটতলাটা ভালো করে খুঁজলে আংটিটা এখনও খুঁজে পাওয়ার চান্স আছে।
কর্নেল জ্বলন্ত চুরুট কামড়ে ধরে কিছুক্ষণ চোখ বুজে ধ্যানমগ্ন হলেন। তারপর চোখ খুলে একরাশ ধোঁয়া ছেড়ে বললেন,–গোপীমোহনবাবুর সব সময় বেহালা সঙ্গে রাখা এবং তার মৃত্যুর পর সেই বেহালা গুড়ো হয়ে যাওয়ার ঘটনাটা এই কেসে খুব গুরুত্বপূর্ণ পয়েন্ট, জয়ন্ত!
একটু চমকে উঠে বললুম, তাহলে কি গোপীবাবুর বেহালার ভেতর আংটি লুকোনো ছিল?
-খুনির বেহালার ওপর রাগের কী কারণ থাকতে পারে? উত্তেজিতভাবে বললুম,–কর্নেল! তাহলে আজ রাত্রে খুনি মন্দিরে ঢুকবে!
–খুনি অত বোকা নয়। সে হালদারমশাইকে গতকাল এবং আমাদের আজ জমিদারবাড়িতে দেখেছে। আমাদের কথাবার্তাও শুনেছে। তাই সে সতর্ক হতে বাধ্য। আর তার ওই সতর্কতার আভাস আমরা পেয়েছি নকুলঠাকুরের সামনে ফেলারামের প্রেতাত্মার আবির্ভাবে। প্রেতাত্মা আংটি চাইছিল ওঁর কাছে। ওটা খুনির একটা চাল। আমাদের সে বিভ্রান্ত করতে চেয়েছে।
–কর্নেল! তাহলে খুনি কি জমিদারবাড়িরই কেউ?
কর্নেল আবার চোখবুজে হেলান দিলেন। তারপর আস্তে বললেন,–অবশ্যই।
–সেই লোকটাই কি গলায় দড়ির ফাঁস আটকে ফেলারামবাবুর ভূত সেজে ভয় দেখাচ্ছে? আবার কে?-বলে কর্নেল ধ্যানমগ্ন হলেন।
.
ছয়
রাত্রে খাওয়ার সময় ঝমঝমিয়ে বৃষ্টি শুরু হয়েছিল। খাওয়ার পর দোতলায় আমাদের ঘরে এসে কর্নেলকে বলেছিলুম,–হালদারমশাই সন্ন্যাসীর ছদ্মবেশে আছেন। এই বৃষ্টিতে ওঁর অবস্থা শোচনীয় হয়ে উঠবে।
কর্নেল বলেছিলেন–একালের সন্ন্যাসীরা রিস্টওয়াচ পরেন। গাড়ি চাপেন। রেলগাড়ি, বাসমোটর বা প্লেনেও চাপেন দেখেছি। বৃষ্টিতে তারা রেনকোট পরতেও পারেন। যাই হোক, ওসব চিন্তাভাবনা না করে শুয়ে পড়া যাক। বৃষ্টির রাতে বিছানা খুব আরামদায়ক হয়ে ওঠে।
বিছানা সত্যি আরামদায়ক হয়েছিল। ঘুম ভেঙেছিল কারও ডাকাডাকিতে। চোখ খুলে দেখি, একটা লোক আমার জন্য বেড-টি এনেছে।
নিশ্চয়ই কর্নেলের নির্দেশ। উঠে, বসে চায়ের কাপপ্লেট নিয়ে বললুম,–কর্নেলসায়েব কি বেরিয়েছেন?
লোকটি বিনীতভাবে বলল,–আজ্ঞে হ্যাঁ। আমার বাবুমশাই আর সায়েব ভোরবেলা গঙ্গার বাঁধে বেড়াতে গেছেন।
জিগ্যেস করলুম,–তোমার নাম কী?
–আজ্ঞে, আমার নাম বেচারাম। সবাই বেচু বলে ডাকে।
-–আচ্ছা বেচু, তুমি ঝাঁপুইহাটির ওদিকে ডাকিনীতলায় কখনও গেছ?
–চৈত্র সংক্রান্তির রাত্তিরে ওখানে এ তল্লাটের অনেকে মানত দিতে যায়। আমিও যাই।
–ডাকিনীতলা মানে কি কোনও গাছ?
বেচু মুখে ভয়-ভক্তির ভাব ফুটিয়ে বলল, স্যার! ওই গাছটার নাম অচিন গাছ। অমন গাছ আমি কোথাও দেখিনি। চৈত্র-সংক্রান্তির সন্ধ্যাবেলা ঢাকঢোল, কাসির বাজনা শুরু হলেই গাছটার ডালপালা থরথর করে কাঁপে। না দেখলে বিশ্বাস হবে না। জেলেদের মুখে শুনেছি, রাতবিরেতে ওই গাছে ডাকিনীর কান্না শোনা যায়।
–ডাকিনীতলার জলটুঙ্গিতে অন্যসময় মানুষজন যায় না?
–কার বুকের পাটা? একাদোকা গেলে মুখে রক্ত উঠে মারা পড়বে যে! একবার ঝাঁপুইহাটির একটা লোক সাহস করে গিয়েছিল। তারপর তার আর পাত্তা নেই। তখন দলবেঁধে অনেক লোক নৌকোয় চেপে ডাকিনীতলায় তাকে খুঁজতে গেল। গিয়ে দেখে, নোকটা ডাকিনীতলায় পড়ে আছে। রক্তবমি করে মারা পড়েছে।
–কতদিন আগের কথা এটা?
–এই তো গতবছর। বাবুগঞ্জের লোকও ঝপুইহাটিতে গিয়ে তার মড়া দেখতে ভিড় করেছিল।
এই সময় নিচের তলা থেকে কেউ তার নাম ধরে ডাকল। বেচারাম তখনই চলে গেল। বুঝলুম সে আরও কিছু সাংঘাতিক ঘটনার কথা বলত। সুযোগ পেল না।
কর্নেল ফিরলেন সওয়া নটায়। সহাস্যে সম্ভাষণ করলেন,–মর্নিং জয়ন্ত! আশা করি সুনিদ্রা হয়েছে।
বললুম,–মর্নিং কর্নেল! আশা করি আপনি সুইস গেটের কাছে অশ্বত্থ গাছে সেই গগনবেড় পাখির দর্শন পেয়েছেন?
টুপি, পিঠে-আঁটা কিটব্যাগ, ক্যামেরা আর বাইনোকুলার টেবিলে রেখে কর্নেল বললেন, –আমার দুর্ভাগ্য! ক্যামেরায় টেলি-লেন্স ফিট করার সময় দুষ্টু পাখিটা তার প্রকাণ্ড ঠোঁট ফাঁক করে আমাকে গালাগালি করে উড়ে গেল। বাইনোকুলারে দেখলুম, উড়তে-উড়তে সে ডাকিনীতলার জলটুঙ্গির জঙ্গলে চলে গেল। সম্ভবত সেখানে ওর জুটি আছে। বাসা থাকাও সম্ভব। বাসাতে ওদের কাচ্চাবাচ্চা থাকার মরশুম এটা।
