কর্নেল একটু হেসে বললেন,–ডি.আই.জি. মানে শচিন রুদ্র?
–হ্যাঁ। চেনেন তাকে?
–শচিন কলকাতার লালবাজার পুলিশ হেডকোয়ার্টারে ট্রাফিকে ডি.সি. ছিল। সেখান থেকে ডিটেকটিভ ডিপার্টমেন্টে কিছুকাল থাকার পর পায় ডবল প্রমোশন। একটা আন্তর্জাতিক চোরা মাদক চালানচক্রকে সে গুঁড়িয়ে দিয়েছিল। উচ্চশিক্ষিত ছেলে। পুলিশে এ ধরনের প্রতিভাবান উচ্চশিক্ষিত ছেলে যত বেশি ঢুকবে, তত পুলিশের বদনাম ঘুচবে। আপনার সঙ্গে আলাপ হয়েছে?
–হয়েছে। চেহারা দেখে বোঝা যায় না কিছু। বয়স তিরিশ-বত্রিশ বলে মনে হয়েছে।
–এই প্রমোশনে শচিন খুশি হয়নি। বুঝতেই পারছেন, কোনও রাজনৈতিক স্বার্থ ওকে প্রমোশনের নামে কার্যত নিষ্ক্রিয় করে দিয়েছে।
হেমেনবাবু বললেন,–অনিল! থানার সামনে গাড়ি দাঁড় করাবে।
বাবুগঞ্জ থানার অফিসার-ইন-চার্জ তপন বিশ্বাস কর্নেলকে দেখে উঠে দাঁড়িয়ে স্যালুট ঠুকতে যাচ্ছিলেন! কর্নেল খপ করে তাঁর হাত ধরে ফেলে করমর্দন করলেন। বললেন, আপনাদের ডি.আই.জি. শচিন রুদ্র আমাকে “ফাদার খ্রিসমাস বলে। অবশ্য সেটা শীতকালে।
তপনবাবু বললেন,–বসুন স্যার। রুদ্রসায়েবের কাছে শুনেছি আপনি কফির ভক্ত। তবে এখানে খাওয়ার মতো কফি পাওয়া যায় না।
কর্নেল খুশি হয়ে বললেন,–হ্যাঁ। এই মুহূর্তে কফি আমার দরকার। নার্ভ ঝিমিয়ে পড়েছে। ঝাঁপুইহাটির জমিদারবাড়ি গিয়ে ভূতের গল্প শুনে ক্লান্তও হয়েছি।
তপনবাবু কফি আনতে বললেন একজন কনস্টেবলকে। তারপর বললেন, আমার কোয়ার্টার থেকেই কফি আসবে। হেমেনবাবু টেলিফোনে জানিয়েছিলেন, সন্ধ্যার পর যে-কোনও মুহূতে আপনি এসে যাবেন।
কর্নেল বললেন,–গোপীমোহন হাজরার পোস্টমর্টেম রিপোর্টে মৃত্যুর কী কারণ বলা হয়েছে?
তপনবাবু হাসতে-হাসতে বললেন,–ভূতের হাতে মারা পড়েননি ভদ্রলোক। এমনিতেই ওঁর হার্টের একটা ভালভ খারাপ ছিল। তার চেয়ে সাংঘাতিক ব্যাপার, বেঁচে থাকলে শিগগির ওঁর লাং-ক্যান্সার হতো। শক্ত ভোতা কোনও ভারী জিনিস দিয়ে মাথার পেছনে খুনি এত জোরে আঘাত করেছিল, মাথার খুলি ফেটে মগজ বেরিয়ে পড়েছিল। সমস্যা হল, অমন নিরীহ এক আর্টিস্ট লোককে খুনের উদ্দেশ্য খুঁজে পাওয়া যাচ্ছে না। আশ্চর্য ব্যাপার, খুনি প্রচণ্ড রাগে ওঁর বেহালাটা ভেঙে প্রায় গুঁড়িয়ে দিয়েছে। বেহালার খাপ ছিঁড়ে টুকরো-টুকরো করেছে। ঘটনাটা প্রতিশোধ বা প্রতিহিংসা চরিতার্থ বলে আপাতদৃষ্টে মনে হয়। কিন্তু প্রাথমিক তদন্তে ওঁর তেমন কোনও শত্রু ছিল বলে জানা যায়নি। ইনভেস্টিগেটিং অফিসার এস. আই. মনোরঞ্জন পাল এখনও হাল ছাড়েননি।
হেমেনবাবু বললেন,–খুনির গায়ে জোর প্রচণ্ড বলতে হবে।
-হ্যাঁ। এক ঘায়ে মাথার পিছনটা ফাটিয়ে ঘিলু বের করে দিতে হলে প্রচণ্ড শক্তি দরকার। বিশেষ করে মানুষের মাথার পিছনদিকটা অন্য অংশের চেয়ে শক্ত।
হেমেনবাবু একটু হেসে বললেন,–ওরকম গায়ের জোর জমিদারবাড়ির কালীনাথেরই আছে। কিন্তু কালী পালোয়ানের দুটো হাতই যথেষ্ট। গোপীবাবু তার এক ঘুসিতেই মারা পড়তেন। তাছাড়া কালী পালোয়ান ওঁকে মারবে কেন?
কফি এসে গেল। তার সঙ্গে কাজুবাদাম, পটেটো চিপস। কর্নেল কফিতে চুমুক দিয়ে বললেন, –অসাধারণ! কফির স্বাদ নির্ভর করে হাতের ওপর। যার হাত এই কফি করেছে, তার প্রতিভা আছে!
তপনবাবু সহাস্যে বললেন,–আমার গৃহিণী আপনার ফ্যান। জয়ন্তবাবুরও ফ্যান। সত্যি কথাটা এবার বলি কর্নেলসায়েব! ডি.আই.জি. সায়েব আপনার পরিচয় দেওয়ার বহু আগে থেকেই আমার গৃহিণীর সূত্রে আপনার এবং জয়ন্তবাবুর পরিচয় আমার জানা হয়ে গেছে। কেয়া বলে, ‘দা মাস্টার ট্রায়ো।‘ কিন্তু ‘ট্রায়ো’-র তৃতীয়জন প্রাইভেট ডিটেকটিভ মিঃ হালদারকে রেখে এলেন কেন?
হেমেনবাবু বলে দিলেন, তিনিও আছেন। গত পরশু রাত ১২টা থেকে দুপুর পর্যন্ত মিঃ হালদার আমার গেস্ট ছিলেন। তারপর
কর্নেল তার কথার ওপর বললেন,–হালদারমশাই খেয়ালি আর হঠকারী প্রকৃতির মানুষ। আপনাদের পুলিশ ডিপার্টমেন্টে ইন্সপেক্টর ছিলেন। পুলিশজীবনের প্রায় সবটাই ওঁর মফস্বলে কেটেছে। কাজেই পাড়াগাঁয়ের নাড়ি-নক্ষত্র চেনেন। বাই দা বাই, জমিদারবাড়িতে ‘গলায়-দড়ে’ ভূতের উপদ্রবের কথা কি আপনি শুনেছেন?
তপন বিশ্বাস হেসে উঠলেন,–শুনেছি। সর্বত্র রটে গেছে। জমিদারবাড়ির ফেলারাম মুখুজ্জের আত্মহত্যার সময় আমি এ থানায় ছিলুম না। আগের ও.সি. চন্দ্রমোহনবাবু ঘটনাটা নিয়ে মাথা ঘামাননি। তার কাছে শুনেছিলুম, ফেলারামবাবুর অনেক ধারদেনা ছিল। ডিপ্রেশনে ভুগছিলেন।
–আশ্চর্য ব্যাপার, সেই ফেলারামবাবু ভূত হয়ে জমিদারবাড়ির লোকেদের খুব জ্বালাতন করছেন।
তপনবাবু একটু গম্ভীর হয়ে বললেন, আমাদের সোর্সে শুনেছি, ফেলারামবাবুর ভূত আংটি চাইতে আসে। ওদিকে জয়কুমারবাবুর নাকি একটা সোনার আংটি কবে হারিয়ে গিয়েছিল। সেই আংটি ফেলারামবাবুর প্রেতাত্মা চাইতে আসে কেন? আংটি তো তার নয়। যাই হোক, কর্নেলসায়েব বলুন, কিছু আঁচ করতে পেরেছেন নাকি?
কর্নেল চুরুট ধরিয়ে বললেন,–নাঃ! বড্ড গোলমেলে কেস। গোলকধাঁধায় ঢুকে গেছি। কথা দিচ্ছি, আপনার প্রয়োজন হলে সবরকম সাহায্য আপনি পুলিশের কাছে পাবেন।
আমরা ও.সি. তপনবাবুর কাছে বিদায় নিয়ে থানা থেকে বের হয়ে গাড়িতে চাপলুম। তারপর হেমেনবাবুর বাড়িতে ফিরলুম।
