হেমেনবাবু বললেন,–বলেন কী! দিনের বেলা এসে খেয়ে দেখব তাহলে!
গাড়িতে ঢুকে কর্নেল বললেন, আমার ধারণা, রায়চৌধুরিবাবুদের পূর্বপুরুষদের কেউ পশ্চিম এশিয়া থেকে এই গাছের চারা এনেছিলেন।
আমি বললুম,–বটগাছটা নিয়ে আপনার এত মাথাব্যথা কেন বলুন তো?
হেমেনবাবু একটু হেসে বললেন,ফেলারামের ভূতরহস্যের সঙ্গে কর্নেল নিশ্চয়ই গাছটার কোনও যোগসূত্র খুঁজে পেয়েছেন!
অনিল গাড়ি স্টার্ট দিল। হেডলাইটের আলোয় জনহীন রাস্তা আর গাছপালা ঝলসে যাচ্ছিল। কর্নেল চুরুট ধরিয়ে বললেন, আপনি ঠিকই ধরেছেন হেমেনবাবু! জয়কুমারবাবুর ঠাকুরদার আঙুলে যে আংটি দেখলুম, সেটাকে তুর্কিরা বলে, কিং সলোমন’স রিং!
–আঁ? বলেন কী!
-বাইবেলের সেই রাজা সলোমনের আংটি। আমি এক তুর্কি ভদ্রলোকের কাছে শুনেছিলুম, ওই আংটির ডিম্বাকৃতি অংশের ভেতর মারাত্মক বিষ ভরা থাকত। কোনও শত্রুকে মেরে ফেলতে চাইলে তার সঙ্গে শত্রুতার মিটমাট করে নিয়ে প্রাচীনযুগের তুর্কিরা তাকে সরাইখানায় আমন্ত্রণ করত। তারপর তার অজ্ঞাতসারে আংটির বিষ শত্রুর পানীয়ে মিশিয়ে দিত।
হেমেনবাবু হেসে বললেন,–জয়কুমারদার ঠাকুরদার আংটিতে মারাত্মক বিষ ভরা ছিল না তো? আমার সত্যি গায়ে কাঁটা দিচ্ছে শুনে!
কর্নেল চুপচাপ চুরুট টানতে মন দিলেন। কিছুক্ষণ পরে সরকারি জঙ্গলের ভেতর দিয়ে যেতে-যেতে আমি বললুম,–হালদারমশাই কোথায় গোয়েন্দাগিরি করে বেড়াচ্ছেন কে জানে!
কর্নেল বললেন,–হালদারমশাইকে নিয়ে তোমার উদ্বেগের কারণ নেই। উনি পূর্ববঙ্গের মানুষ। স্থলের চেয়ে জলই ওঁর প্রিয়। এই এলাকাটা কতকটা পূর্ববঙ্গের মতোই। নদী বিল খাল! এখন সর্বত্র জল।
হেমেনবাবু বললেন,–কর্নেলসায়েব! জয়ন্তবাবুকে মন্দিরে রুদ্রদেবের বিগ্রহ দর্শন করিয়েছি। জয়কুমারদা বলছিলেন, ফেলারাম বিগ্রহের বেদি ওপড়াচ্ছিল। জয়ন্তবাবু তো দেখেছেন। বিগ্রহের বেদি ওপড়ানো অসম্ভব। ফেলারাম মুখুজ্জে মন্দিরে ঢুকে এমন কী করছিল। যে জয়কুমারদা ক্রোধান্ধ হয়ে তাকে থামের সঙ্গে বেঁধে রেখেছিলেন?
কর্নেল সে কথায় কান না দিয়ে বললেন,–জয়ন্ত বিগ্রহদর্শন করে পুণ্যার্জন করেছে। এবার সাধুসন্ন্যাসী দর্শন করুক। আরও পুণ্য হবে।
বললুম,–কোথায় সাধুসন্ন্যাসী!
কথাটা বলেই হেডলাইটের আলোয় দেখলুম, একজন জটাজুটধারী কৌপীনপরা সন্ন্যাসী এক হাতে ত্রিশূল, অন্য হাতে মড়ার খুলি আর কাঁধে ঝোলানো গেরুয়াঝুলি নিয়ে সামনের দিক থেকে আসছিলেন। গাড়ির হেডলাইট থেকে চোখ বাঁচাতে মড়ার খুলিটা চোখের সামনে তুলে রাস্তার বাঁদিকে ঘাসের ওপর সরে দাঁড়ালেন। পাশ দিয়ে যাওয়ার সময় লক্ষ করলুম, সন্ন্যাসী খুলিটা নামিয়ে কর্নেলকে যেন দেখে নিলেন। কর্নেল বললেন,–সাক্ষাৎ অবধূত। অবশ্য কাঁপালিকও হতে পারেন।
হেমেনবাবু বললেন,–… জলটুঙ্গিতে মাঝে-মাঝে সন্ন্যাসীদের এসে ডেরা পাততে দেখেছি।
–ইনিও সেখানে যাচ্ছেন সম্ভবত।
আমি সন্ন্যাসীকে চিনতে পেরেছিলুম। গোয়েন্দাপ্রবর হালদারমশাই ছাড়া কেউ নন। উনি এই ছদ্মবেশটা ধরতে খুব পটু। কথাটা চেপে গিয়ে বললুম,–আকস্মিক যোগাযোগটা বিস্ময়কর। কর্নেল সন্ন্যাসীর কথা বলামাত্র সন্ন্যাসীদর্শন হয়ে গেল!
কর্নেল বললেন, তুমি সামনে দূরে তাকালে সন্ন্যাসীকে অনেক আগেই দেখতে পেতে!
হেমেনবাবু সকৌতুকে বললেন,–জয়ন্তবাবু সাংবাদিক। আপনি বলছেন, জয়ন্তবাবুর দূরদৃষ্টি নেই?
কর্নেল হাসলেন,–জয়ন্তকে আপনি তাতিয়ে দিচ্ছেন হেমেনবাবু!
এইসব হাসি-পরিহাসের দিকে আমার মন ছিল না। আমি ভাবছিলুম, নকুলঠাকুরের কথা! আমরা ও-বাড়িতে থাকার সময়ই ফেলারামবাবুর ‘গলায়-দড়ি’ ভূতটা ওঁকে দেখা দিল কোন সাহসে? ওঁর হাবভাব দেখে বুঝতে পারছিলুম, সত্যিই উনি ভয় পেয়েছেন।
অথচ আশ্চর্য ব্যাপার, কর্নেল একা বাড়ির পিছনদিকে বটগাছটা দেখতে গিয়েছিলেন। ওঁকে ভূতটা দেখা দেয়নি! ফেলারামবাবুর প্রেতাত্মা কর্নেলকে আংটি চাইলেও পাবে না বলেই কি দেখা দেয়নি? হ্যাঁ–অ্যাংটিই ভূতটার টার্গেট। এদিকে কর্নেল বলছেন, ওই আংটি পশ্চিম এশিয়ায় তুর্কিরা ব্যবহার করে। কিং সলোমন’স রিং। এমন অদ্ভুত রহস্যের পাল্লায় কর্নেল কখনও পড়েছেন বলে মনে পড়ে না।
বাবুগঞ্জের বাজার পেরিয়ে যাওয়ার সময় শুনলুম, হেমেনবাবু ফেলারাম মুখুজ্জেকে কালীনাথের প্রচণ্ড প্রহারের সম্ভাবনা নিয়ে কথা বলছেন। আমাকে যা সব বলছিলেন। মৃত ফেলারামবাবুকে বটগাছে ঝুলিয়ে আত্মহত্যা বলে চালানোর ওপর হেমেনবাবু গুরুত্ব দিচ্ছেন। কর্নেল একটু পরে বললেন,–সেটা অসম্ভব নয়। তবে ফেলারামবাবুর মন্দিরে ঢোকার উদ্দেশ্যটা আমার কাছে স্পষ্ট নয়। শুধু এটুকু অনুমান করা যায়, ওই আংটির সঙ্গে সম্ভবত মন্দিরের বিগ্রহ রুদ্রদেবের সম্পর্কের সম্ভাবনা আছে।
হেমেনবাবু বললেন,–আমি জয়ন্তবাবুর সঙ্গে আলোচনার সময় গুপ্তধনের সম্ভাবনার কথা বলেছিলুম। এমন হতেই পারে, জয়কুমারদা জানেন না ওই আংটির মধ্যে মন্দিরে লুকিয়ে রাখা তাঁর পূর্বপুরুষের গুপ্তধনের সূত্র আছে। কী মনে হয় আপনার?
কর্নেল বললেন, আপনার কথায় যুক্তি আছে। দেখা যাক, এই সম্ভাবনাটার কোনও ক্ল পাওয়া যায় নাকি।
হেমেনবাবু বললেন,–থানার ও. সি. তপন বিশ্বাস আপনার সঙ্গে আলাপের জন্য উদগ্রীব হয়ে আছেন। ডি.আই.জি. সায়েবের মুখে আপনার সম্পর্কে অনেক কথা তিনি শুনেছেন!
