কর্নেল আমাকে অবাক করে ওকে জিগ্যেস করলেন,–ভোলা, বটগাছের ডাল কাটার পর কি বায়াতবলাটা ফেঁসেছিল?
ভোলা কেমন যেন একটু হকচকিয়ে গেল। বলে,–আজ্ঞে!
জয়কুমারবাবু একটু হেসে বললেন,–বটগাছের ডাল কাটার সঙ্গে কি বায়াতবলা ফেঁসে যাওয়ার সম্পর্ক আছে কর্নেলসায়েব?
কর্নেল হাসতে-হাসতে বললেন,–বটগাছ স্বয়ং বৃক্ষদেবতা। অঙ্গছেদন করলে তার ক্রোধ স্বাভাবিক। ভোলার ওপর প্রথমে, তারপর তার ক্রোধটা তার তবলার ওপর পড়েছিল মনে হচ্ছে।
সবাই হেসে উঠলেন। জয়কুমারবাবু বললেন,–কর্নেলসায়েব এসে আমাদের মুখে হাসি ফোঁটালেন। এজন্য আমি কৃতজ্ঞ। কাল রাত্তির থেকে বাড়ি একেবারে শ্মশান হয়ে উঠেছিল।
কর্নেল বললেন,–এবার উঠব। তার আগে একটা প্রশ্ন করতে চাই আপনাকে।
–করুন প্রশ্ন!
–আপনার বাবা কিংবা ঠাকুরদা কিংবা আপনার কি এমন কোনও ফোটো আছে, যাতে আঙুলে সেই আংটির–মানে, আমি আংটি পরা ছবিই দেখতে চাই।
জয়কুমারবাবু বললেন,–আছে। আমার সঙ্গে লাইব্রেরিতে আসুন। দেখাচ্ছি। কালী! হ্যাঁজাগটা খুলে নিয়ে আয়।
বারান্দা দিয়ে এগিয়ে সেই ঘরের তালা খুললেন জয়কুমারবাবু। কালীনাথ আগে হ্যাঁজাগ নিয়ে ঢুকল। তারপর একে-একে আমরা ঢুলুম। বিশাল ঘর। চারদিকের দেওয়াল ঘেঁষে রাখা প্রকাণ্ড আলমারিতে পুরোনো বই ঠাসা আছে। কাঁচের ভেতর বইগুলো দেখা যাচ্ছিল। একখানে উঁচুতে একটা প্রকাণ্ড ছবি দেখিয়ে জয়কুমারবাবু বললেন,–আমার ঠাকুরদার অয়েলপেন্টিং। এক সায়েব শিল্পীর আঁকা। ওই দেখুন, ওঁর বাঁ-হাতের আঙুলে সেই আংটি।
কর্নেল টর্চের আলো ফেললেন। আংটিটা সত্যিই বেটপ। ডিম্বাকৃতি একটা নিরেট সোনার আব যেন বসানো আছে। ছবির আয়তনের অনুপাতে আংটিটার ওই ডিম্বাকৃতি অংশটা প্রায় একইঞ্চি লম্বা এবং মাঝখানটা প্রায় আধইঞ্চি চওড়া। এই আংটি সারাক্ষণ আঙুলে পরে থাকা অস্বস্তিকর মনে হল।
কর্নেলের গলায় যথারীতি বাইনোকুলার আর ক্যামেরা ঝুলছিল। তিনি তার ক্যামেরায় সম্ভবত আংটির ছবিটা তুললেন। ফ্ল্যাশবাল্ব ঝিলিক দিল।
ঠিক এইসময় বাইরে কেউ ভাঙা গলায় চেঁচিয়ে উঠল,–বাঁচাও! বাঁচাও!
কর্নেল দ্রুত বেরিয়ে গেলেন। তারপর কালীনাথ হ্যাঁজাগ নিয়ে বেরুল। আলোটা সে রেখে মেঘের মতো হাঁক ছেড়ে বলল,–কী হয়েছে ঠাকুরমশাই?
দেখলুম ঠাকুরমশাই নকুল মুখুজ্জে বৃত্তাকার রোয়াকের নিচে দু-হাতে মুখ ঢেকে বসে আছেন। তার সেই ছেলেকে দেখতে পেলুম না।
.
পাঁচ
কিছুক্ষণ পরে নকুলঠাকুর ধাতস্থ হয়ে বললেন,–মন্দিরে সন্ধ্যারতি শেষ করে তালা এঁটে বিন্দুকে বাড়ি পাঠিয়ে দিলুম। তারপর আমি এদিকে এগিয়ে আসছি, হঠাৎ পেছনে কে ফিসফিস করে বলে উঠল, ‘আংটি দে! আংটি দে!’ ঘুরে দেখি দড়ির ফঁস আটকানো ফেলারাম। সে দু-হাত বাড়িয়ে আমার গলা টিপে ধরতে এল। আমি অমনি চাঁচাতে-চাঁচাতে পালিয়ে এলুম। ওরে বাবা! কী সাংঘাতিক দৃশ্য! সেই ফেলারাম!
কালীনাথ ততক্ষণে লাঠি আর টর্চ নিয়ে মন্দিরের দিকে ছুটে গেছে। জয়কুমারবাবু হতাশভাবে মাথা নেড়ে বললেন, আমি কিছু বুঝতে পারছি না। কিছু মাথায় ঢুকছে না!
কর্নেল বললেন,–আচ্ছা ঠাকুরমশাই! মন্দিরের কাছে আর ওই আগাছার জঙ্গলে তো আলো নেই। মন্দিরের মাথায় যে বাটা জ্বলছে, তার আলো খুব মিটমিটে। আপনি অন্ধকারে ভুল দেখেননি তো?
নকুল মুখুজ্জে শ্বাসপ্রশ্বাসের মধ্যে বললেন,–তত কিছু অন্ধকার নয়। আমি স্পষ্ট দেখছি।
–ফেলারামকে দেখেছেন?
–আজ্ঞে হ্যাঁ। গলায় ফাঁস আটকানো। ওরে বাবা! সেই ফেলা মুখুজ্জে!
–একটু ভেবে বলুন। আগে গলার ফাঁস দেখতে পেয়েছিলেন, নাকি তার মুখ দেখতে পেয়েছিলেন?
–আজ্ঞে? স্যার, গলার ফাঁসের দিকে প্রথমেই চোখ পড়েছিল! তারপর মুখের গোঁফদাড়ি!
–ধরুন, যদি অন্য কেউ গলায় দড়ির ফাঁস আটকে ফিসফিস করে আংটি চায়?
–তা কী করে হবে? আমি যে ফেলারামকেই দেখলুম। চোখ জ্বলছিল। দুটো হাত বাড়িয়ে–ওঃ!
জয়কুমারবাবু বললেন,–নকুল! তুমি বিশ্রাম নাও এ বেলা–শৈল বরং রান্না করুক। ভোলা! ও ভোলা! কোথায় গেলি তুই?
বারান্দার থামের আড়াল থেকে ভোলা বেরিয়ে এল। বলল,–গোয়ালঘরে ছিলুম। মশার কামড়ে গরুগুলো ছটফট করে। ঘাসের তলায় ঘুঁটের আগুন দিচ্ছিলুম। ধোঁয়ায় চোখের অবস্থা সাংঘাতিক।
–ঠাকুরমশাইকে তার ঘরে নিয়ে যা। শৈলকে বল, গরম-গরম চা করে দেবে। আর আমাদের জন্যও আরেক দফা চা।
কর্নেল বললেন,–থাক জয়কুমারবাবু! আমরা এবার চলি। একটু সাবধানে থাকবেন।
কালীনাথ এসে বলল,–কেউ কোথাও নেই। মানুষ হলে হেমেনবাবুর ড্রাইভারের চোখে পড়ত। দেউড়ি দিয়ে না পালানো ছাড়া উপায় ছিল না তার। অত উঁচু পাঁচিল ডিঙোনোর সাধ্যি নেই কারও। খিড়কির দোর ভেতর থেকে বন্ধ।
জয়কুমারবাবু বললেন, আমার বন্দুক আর দুটো কার্টিজ এনে দে। এই নে চাবি। ফেলারামের ভূত হোক আর যে-ই হোক, গুলি করব। আর এই বদমাইশি সহ্য হচ্ছে না।
জমিদারবাড়ি থেকে বেরিয়ে দেউড়ির কাছে গিয়ে কর্নেল বললেন,–বটগাছটা ভিন্ন প্রজাতির। এ দেশে এমন বটগাছ কোথাও দেখিনি।
হেমেনবাবু বললেন,–কেন?
–সব বটগাছের প্রচুর ঝুরি নামে। জমিদারবাড়ির বটগাছটার ঝুরি নেই। এ ধরনের বটগাছ আমি ভূমধ্যসাগরের পূর্বতীরের দেশগুলোতে দেখেছি। ফিগট্রি বলতে আমাদের দেশে ডুমুর গাছ বোঝায়। ডুমুর গাছও অবশ্য বটগাছেরই জ্ঞাতি। কিন্তু এই বটগাছটা ওইসব অঞ্চলের সত্যিকার ফিগট্রি। এখন বর্ষায় প্রচুর ফল ধরেছে। পাখিরা হল্লা করে সন্ধ্যা পর্যন্ত ফলগুলো খাচ্ছে। আমি একটা ফল কুড়িয়ে স্বাদ নিলুম। বেশ মিষ্টি। এদেশের বটফলও পাখিদের কাছে সুখাদ্য। কিন্তু এই বটফল মানুষও খেতে পারে।
