হেমেনবাবু একটু হেসে বললেন,–কি জয়ন্তবাবু? যাবেন নাকি?
উঠে দাঁড়িয়ে বললুম,–চলুন! রুদ্রদেবের বিগ্রহ কখনও দর্শন করিনি। দেখতে আগ্রহ হচ্ছে।
হেমেনবাবুকে অনুসরণ করে প্রাঙ্গণের একখানে দেখলুম, আগাছার জঙ্গলের ভেতর দিয়ে সংকীর্ণ পায়েচলা পথ আছে। পথের মাঝামাঝি গিয়ে হেমেনবাবু বাঁদিকে আঙুল তুলে বললেন,–ওখানে একটা ফোয়ারা ছিল। ছোটোবেলায় এ বাড়িতে নেমন্তন্ন খেতে এসেছি বাবার সঙ্গে। তখন এই সব ঝোঁপঝাড় ছিল না। ফুলের বাগান ছিল। ওই ফোয়ারাটাও আস্ত ছিল। পাথরের থামটা দেখতে পাচ্ছেন? ওখানে একটা অপ্সরার মূর্তি বসানো ছিল।
মন্দিরটার চত্বর উঁচু, সিঁড়ি বেয়ে উঠতে হয়। নিচে জুতো খুলে চত্বরে উঠে দরজার কাছে উঁকি দিলুম। করজোড়ে প্রণাম করলুম হেমেনবাবুর দেখাদেখি। আবছা-অন্ধকারে একটা প্রদীপ জ্বলছে। বেঁটে তামাটে রঙের এবং পট্টবস্ত্রপরা ঠাকুরমশাই পুজো করছেন। কাঁসর বাজাচ্ছে একটি ছোট্ট ছেলে। হেমেনবাবু বললেন,–নকুলঠাকুরের ছেলে। স্কুলে পড়ে।
বললুম,–নকুলবাবুর ফ্যামিলি কি এ বাড়িতে থাকেন?
-না। নকুলবাবুর ফ্যামিলি থাকে বাবুগঞ্জে। নকুলবাবু জমিদারবাড়িতে চাকরি করেন। চাকরি মানে, রান্নাবান্না-পুজোআচ্চা এইসব কাজ। এবার বিগ্রহটা লক্ষ করুন। কী মনে হচ্ছে দেখে?
খুঁটিয়ে দেখে বললুম,–কী আশ্চর্য! অবিকল যেন বুদ্ধমূর্তি।
–ঠিক ধরেছেন। বুদ্ধমূর্তি রুদ্রদেব হয়ে গেছেন। কিন্তু এ কথা যেন ভুলেও জয়কুমারবাবুকে বলবেন না! খুব প্রাচীন মূর্তি। কষ্টিপাথরে তৈরি। বেদিটাও কষ্টিপাথরের।
–ফেলারামবাবু সম্ভবত বিগ্রহটা চুরি করতে চেয়েছিলেন!
হেমেনবাবু বললেন,–আসুন। ব্যাপারটা বলছি।
মন্দির-চত্বর থেকে নেমে জুতো পরে সেই পথ দিয়ে ফিরছিলুম। হেমেনবাবু বললেন,–বেদিটা তো দেখলেন। বড়জোর দুফুট লম্বা দেড়ফুট চওড়া। লাইমকংক্রিটের সঙ্গে গাঁথা আছে। বেদি ওপড়ানো কি সম্ভব? কী মনে হল আপনার?
বললুম,–তাই তো! শাবল বা ওইরকম কিছু দিয়ে ঘা মেরেও ওপড়ানো কঠিন।
হেমেনবাবু মুচকি হেসে চাপাস্বরে বললেন,–বিগ্রহ যে চুরি করবে, সে বেদি ওপড়ানোর চেষ্টা করবে কেন? তাই না?
–ঠিক বলেছেন।
–আমার ধারণা ফেলারাম বেদিটার কোনও গোপন কথা জানতে পেরেছিল।
অবাক হয়ে বললুম,–কী গোপন কথা?
–বেদিটা সহজেই হয়তো সিন্দুকের ডালার মতো ভোলা যায়।
–আপনি কি গুপ্তধনের কথা বলছেন?
–দেখুন জয়ন্তবাবু! প্রাচীনযুগে মন্দিরে ধনরত্ন নানা কারণে লুকিয়ে রাখা হতো। কাজেই যদি গুপ্তধনের কথা বলেন, আমি তাতে অবিশ্বাস করব না।
–তাহলে জয়কুমারবাবু বা তাঁর পূর্বপুরুষের নিশ্চয়ই তা জানার কথা।
–জয়কুমারদা কিছু নিশ্চয়ই জানেন। তা না হলে ফেলারাম মুখুজ্জেকে থামের সঙ্গে দড়ি দিয়ে বেঁধে রেখেছিলেন কেন? উদ্দেশ্য ছিল, ভোরবেলা পুলিশের হাতে তাকে তুলে দেওয়া। যে বেদি ওপড়ানো অসম্ভব, তার জন্য লোকটাকে অত কড়া শাস্তি দেওয়ার কারণ কী? কালীনাথকে আমি চিনি। সে নিশ্চয়ই ফেলারাম মুখুজ্জেকে প্রচণ্ড মারধরও করেছিল। ওই লোকটাকে এলাকার সবাই বলে কালী পালোয়ান। ঠাট্টা করে অনেকে বলে কেলে-দত্যি। কালীর স্বাস্থ্য তো দেখলেন। ওর হাতের একটা থাপ্পড়ে রোগা মানুষ ফোরামের অক্কা পাওয়ার কথা।
চমকে উঠেছিলুম। বললুম,–হেমেনবাবু! তাহলে কি কালীর মার খেয়ে ফেলারামবাবু মারা পড়েছিলেন। আর তার গলায় ফাঁস আটকে বটগাছের ডালে ঝুলিয়ে দেওয়া হয়েছিল?
হেমেনবাবু দাঁড়িয়ে গেলেন। আস্তে বললেন,–ঝাঁপুইহাটি পাড়াগাঁ। আত্মহত্যার কেসে যে পুলিশকে খবর দিতে হয়, তা ক’জন জানে? তাছাড়া ফেলারাম মুখুজ্জের হয়ে থানায় যাবেটা কে? সকালেই সাত তাড়াতাড়ি তাকে দাহ করা হয়েছিল বলে শুনেছি।
কথাগুলো বলেই তিনি হন্তদন্ত এগিয়ে গেলেন। জমিদারবাড়িতে বিদ্যুতের অবস্থা বড় করুণ। বাগুলোর ভেতর লালরঙের সূক্ষ্ম তার স্পষ্ট দেখা যাচ্ছে। কালীনাথ একটা হ্যাঁজাগ জ্বালছিল। সে হ্যাঁজাগটা বারান্দার ওপর ঝুলন্ত একটা হুকে আটকে দিল।
কর্নেল ততক্ষণে ফিরে এসেছেন। জয়কুমারবাবুর সঙ্গে কথা বলছিলেন তিনি। আমরা গিয়ে বসলুম। জয়কুমারবাবু আমাকে বললেন,–বিগ্রহদর্শন করলেন? কর্নেলসায়েবকে বলছিলুম। উনি বললেন, বরং সকালে এসে দর্শন করবেন।
কর্নেল বললেন,–জয়কুমারবাবুর গান শোনার ইচ্ছা ছিল। শুনেছি, উনি অসাধারণ ধ্রুপদী সঙ্গীত গাইতে পারেন। কিন্তু গোপীবাবু নেই। কে বেহালা বাজাবেন? তবলা কে বাজায় অবশ্য জানি না।
জয়কুমারবাবু বললেন,–সঙ্গীতচর্চা এ বয়সে আর করতে পারি না। আমি তানপুরা বাজিয়েই গাইতুম। এখন হাত কাঁপে। তবলা সঙ্গত করত ভোলা। তবলায় ওর হাত খুব ভালো।
ভোলা চায়ের কাপপ্লেট নিতে এসেছিল। সে বলল,–কর্তামশাইকে কতবার বলেছি, তবলার বাঁয়া ফেঁসে আছে। সারিয়ে আনি। উনি বলেন, থাক গে!
কর্নেল বললেন,–তবলা কবে ফেঁসে গেল?
–প্রায় একবছর ধরে ফেঁসে পড়ে আছে স্যার।
–তবলা কি নিজে থেকেই ফেঁসে যায়?
–আজ্ঞে, যায়। কর্তামশাইকে জিগ্যেস করুন।
জয়কুমারবাবু বললেন, হ্যাঁ। ওয়েদারে টেম্পারেচারের ওঠানামার দরুণ তবলা এমনিই ফেঁসে যায়। গত বছর জুন মাসে প্রচণ্ড গরম পড়েছিল। তারপর হঠাৎ বৃষ্টি। অনেকদিন পরে ইচ্ছে হয়েছিল, বৃষ্টির রাতে গানবাজনার আসর বসাই। তো ভোলা তবলা-বাঁয়া নিয়ে এসে বলল, বাঁয়া ফেঁসে গেছে!
