বলে উনি ছড়িহাতে উঠে গেলেন। একতলার একটা ঘরের তালা খুলতে কালীনাথকে চাবির গোছা দিলেন। কালীনাথ তালা খুলে দিলে ঘরে ঢুকে গেলেন। হেমেনবাবু মুচকি হেসে বললেন,–কর্নেলসায়েব! এবার মনে হচ্ছে আপনি জমিদারবাড়ির ভূতরহস্যের একটা গুরুত্বপূর্ণ কু পাবেন!
জয়কুমারবাবু একটু পরে এসে গেলেন। তার হাতে একটা জীর্ণ মোটাসোটা ডায়রি বই। তিনি পকেট থেকে রিডিং গ্লাস অর্থাৎ চশমা বের করে চোখে পরলেন। ডায়রি বা নোটবইটার বিবর্ণ পোকায় কাটা পাতা সাবধানে উলটে কর্নেলকে দিলেন। বললেন,–এই দেখুন। ঠাকুরদা লালকালিতে কী লিখেছেন।
আমরা ঝুঁকে পড়লুম পাতাটা দেখতে। কর্নেল বিড়বিড় করে পড়তে থাকলেন, ‘আমার বংশধরদের উদ্দেশ্যে এই গুপ্তকথা লিখিয়া রাখিতেছি। আমাদিগের গৃহদেবতা শ্রী শ্রী রুদ্রদেবের আশীবাদধন্য একটি অতীব প্রাচীন স্বর্ণ-অঙ্গুরীয় ক/১৮৪ সংখ্যক পুস্তকের ভিতরে লুকাইয়া রাখিয়াছি। উহা অঙ্গুলিতে ধারণ করিলে গৃহদেবতার কৃপায় অমঙ্গল দূর হইবে। তবে সাবধান, অঙ্গুরীয় যেন কদাচ জল স্পর্শ করে না। স্নান আচমন প্রভৃতি প্রাত্যহিক কৃত্যাদি সম্পন্ন করিবার সময় উহা খুলিয়া রাখিতে হইবে।..’
কর্নেল মুখ তুলে বললেন, আপনি আংটিটি খুঁজে বের করে আঙুলে পরেছিলেন?
জয়কুমারবাবু বললেন, হ্যাঁ। কীরকম বেঢপ গড়নের আংটি। ওপরে কোনও রত্ন-টত্ন বসানো ছিল না। সেখানে ডিম্বাকৃতি নিরেট সোনার টুকরো বসানো ছিল। আমি ঠাকুরদার নির্দেশমতো আংটি পরে থাকতুম। তো গতবছর গ্রীষ্মকালে হঠাৎ একদিন আবিষ্কার করলুম আংটিটা আঙুল থেকে কখন কোথায় খুলে পড়েছে। একটু ঢিলে ছিল আংটিটা। তন্নতন্ন খুঁজে কোথাও পেলুম না। ফেলারামের প্রতি সন্দেহ হল। সে কুড়িয়ে বেচে দিয়েছে হয়তো। কিন্তু সে কান্নাকাটি করে রুদ্রদেবের নামে শপথ করে কেলোর কীর্তি বাধাল। গোপী, কালী, ভোলা, ভোলার বউ শৈল আর নকুলঠাকুরকে ফেলারামের দিকে লক্ষ রাখতে বলেছিলুম। বাড়ির দামি জিনিস বিক্রি করলে ফেলারামের হাতে পয়সাকড়ি আসত। তখন তার চেহারা হাব-ভাব বদলে যেত। কিন্তু ওরা তেমন কোনও পরিবর্তন লক্ষ করেনি। অগত্যা আংটির আশা ছেড়ে দিলুম। এদিকে আমার জমিজমা নিয়ে হাজারটা সমস্যা। আংটিটার কথা মন থেকে বিসর্জন দিলুম। কিন্তু কথা হচ্ছে, উলটে ফেলারামের প্রেতাত্মা আমার বা গোপীর কাছে সেই আংটি চাইতে রাতবিরেতে হানা দেবে কেন? আংটিটা তো আমারই ছিল।
কর্নেল চুরুট ধরিয়ে বললেন,–যা ও কথা। মর্গের রিপোর্টে গোপীবাবুকে কী দিয়ে খুন করা হয়েছিল জানতে পেরেছেন?
হেমেনবাবু বললেন,–ভোতা শক্ত কোনও জিনিস দিয়ে খুনি তার মাথার পেছনে আঘাত করেছিল। থানার ও.সি. বলেছেন, লোহার রড বা লোহার মুগুরই মার্ডার উইপন।
-গোপীবাবুর বেহালা পাওয়া গেছে?
কালীনাথ বলল,–গাবতলায় ঝোঁপের ভেতর পাওয়া গেছে। কেউ বেহালাটা যেন শক্ত জিনিস দিয়ে ঠুকে ভেঙে টুকরো-টুকরো করেছে। বেহালার কাপড়ের খাপটা কাছেই পড়ে ছিল। পুলিশ সব নিয়ে গেছে।
কর্নেল হঠাৎ একটু নড়ে বসলেন,–হা! জয়কুমারবাবু! বাথরুমের কথা বলছিলেন আপনি। কেন বলছিলেন?
জয়কুমারবাবু বললেন,–বলতে ভুলে গেছি। আমি বাথরুমে স্নান করতে ঢোকার পর আংটিটা খুলে উঁচু জানালার ধারে রাখতুম, যাতে জলস্পর্শ না হয়। আংটিটা হারিয়ে যাওয়ার এতদিন পরে হঠাৎ কাল স্নান করতে ঢুকে দেখলুম, একটা কাক উঁচু জানলার ওপরে বসে কিছু ঠোকরাচ্ছে। অমনি মনে হল, কাক আংটিটা নিয়ে যায়নি তো?
কালীনাথ সায় দিয়ে বলল,–কর্তামশাইয়ের কথা শুনে আমি কাল বটগাছটাতে উঠে কাকের কয়েকটা বাসা লাঠি দিয়ে খুঁচিয়ে ভেঙে দিয়েছি। আংটি খুঁজে পাইনি।
আমি বললুম,–কর্নেল! হালদারমশাই তাহলে কালীনাথের পায়ের ছাপ দেখেছিলেন বটগাছের গুঁড়িতে।
হেমেনবাবু বললেন,–হালদারমশাই, মানে প্রাইভেট ডিটেকটিভ মিঃ হালদার?
হাসলেন,–হ্যাঁ। বুঝতেই পারছেন গোয়েন্দারা সবকিছু সন্দেহের চোখে দেখেন। ওঁর কথা থাক। জয়কুমারবাবু যা বলছেন, তাতে যুক্তি আছে। কাকের এই অদ্ভুত স্বভাব আমার সুপরিচিত। কারণ কলকাতায় আমার ছাদের বাগানের নিচে একটা নিমগাছে কাকের বড্ড উপদ্রব। আমি ওদের বাসায় মেয়েদের চুলের ফিতের টুকরো, ভাঙা চুড়ি, এমনকী লোহার ছোট্ট স্প্রিংও দেখেছি।
কালীনাথ বলল,বাকি বাসাগুলো কালই ভেঙে দিয়ে খুঁজে দেখব।
জয়কুমারবাবু বললেন,–যে কাক আমার আংটি চুরি করেছিল, একবছর পরে সে বেঁচে আছে বা বটগাছে এখনও আছে কি না ঠিক আছে কিছু? কাকেরা জায়গা বদলায় না? গ্রামের কাকেরা আজকাল শহরে গিয়ে জুটেছে শুনেছি। আমাদের বটগাছে আগের মতো অত কাক তো আর দেখি না।
হেমেনবাবু বললেন,–কথাটা ঠিক। বাবুগঞ্জে ক্রমে কাকের সংখ্যা বেড়ে গেছে। শহরে কাকেঁদের প্রচুর খাবার মেলে কাজেই গ্রামে কালক্রমে আর কাক দেখাই যাবে না!
কর্নেল হঠাৎ উঠে দাঁড়িয়ে বললেন, আপনারা বসুন। আমি একবার বটগাছটার অবস্থা দেখে আসি।
কালীনাথ তাঁর সঙ্গে যেতে পা বাড়িয়েছিল, কর্নেল তাকে নিষেধ করে বাড়ির পূর্বদিক ঘুরে উত্তরে অদৃশ্য হলেন। একটু পরে দক্ষিণে আগাছার জঙ্গলের ওধারে বাউন্ডারি ওয়ালের কাছে একটা মন্দিরে কাসরঘণ্টা বেজে উঠল। একটি মেয়ে সম্ভবত ভোলার বউ শৈল শাঁখে ফুঁ দিল। জয়কুমারবাবু চেয়ারে বসেই মন্দিরের দিকে ঘুরে করজোড়ে প্রণাম করে বললেন,–সন্ধ্যারতি দিচ্ছে নকুলঠাকুর। আজকাল আমি আর সন্ধ্যারতির সময় মন্দিরে উপস্থিত থাকি না। হেমেন! তুমি এঁকে বিগ্রহদর্শন করিয়ে আনো!
