হেমেনবাবু বললেন,–জয়কুমারদা! আপনি কি বলতে চাইছেন গোপীবাবু ফেলারামের সঙ্গে বিগ্রহ পাচারের চক্রান্তে লিপ্ত ছিল?
-না। তা বলছি না। কিন্তু আমার খটকা লাগছে। এই আসল কথাটা না বললে কর্নেলসায়েব ভাবতেই পারেন, আমি বা আমার হুকুমে কালীনাথ কোনও বহুমূল্য আংটির লোভে তাকে ফাস আটকে মেরে বটগাছে লটকে দিয়েছিলুম!
কর্নেল একটু হেসে বললেন,–ঠিক বলেছেন। আমার অঙ্কটা এইরকমই ছিল।
জয়কুমারবাবু উত্তেজিতভাবে বললেন,–শুনছ? শুনছ হেমেন? গোপী ইচ্ছে করেই কর্নেলসায়েবকে ভুল পথে চালাতে চেষ্টা করেছিল। প্রাইভেট ডিটেকটিভ মিঃ হালদারকে অবশ্য এ ঘটনাটা আমি বলিনি। তবে আমার সন্দেহ, ওঁকে লক্ষ করে ঢিল ছুঁড়েছিল হতভাগা গোপীমোহনই। আর কেউ না। মিঃ হালদারকে সে তাড়াতে চেয়েছিল। বেঁচে থাকলে সে কর্নেলসায়েবকেও তাড়ানোর চেষ্টা করত।
হেমেনবাবু হাসতে-হাসতে বললেন, তাহলে গোপীবাবু কর্নেলসায়েবের কাছে যাবেন কেন?
–আমার হুকুম মানতে সে বাধ্য। যদি সে ফিরে এসে বলত, কর্নেলসায়েবের দেখা পেলুম না, তাহলে আমি তোমাকে ট্রাংককল করতে বলব, গোপী তা ভালোই জানত।
এই সময় একটা গোলটেবিল এনে রাখল কালীনাথ। তারপর একটা নোক ল্যাংচাতে ল্যাংচাতে চা বা কফির পট ও কাপপ্লেট ট্রেতে বয়ে এনে টেবিলে রাখল। হেমেনবাবু বললেন,–কি ভোলা? এখনও তোমার পায়ের হাড় বসেনি?
ভোলা বলল,–আজ্ঞে না। কলকাতার ডাক্তারবাবু একমাস অন্তর যেতে বলেছিলেন। কিন্তু কর্তামশাইয়ের সংসার ফেলে যাই কী করে?
জয়কুমারবাবু চটে গিয়ে কী বলতে যাচ্ছিলেন, কর্নেল জিগ্যেস করলেন,তোমার পা ভাঙল কী করে?
ভোলা বলল,–আজ্ঞে, পেছনকার বটগাছের একটা ডাল এসে দালানে ধাক্কা মারত। রাত্তিরে অদ্ভুত শব্দ হতো। কর্তামশাই ডালটা কাটতে বলেছিলেন। ডাল কেটে নামবার সময় পা ফসকে নিচে পড়েছিলুম।
–কতদিন আগে?
–আজ্ঞে গতবছর। তার কদিন পরে ফেলাবাবু আত্মহত্যা করেছিল।
কর্নেল একটু হেসে বললেন,–জয়কুমারবাবু! ওই বটগাছটাই আসলে ভূত।
.
চার
কর্নেলের কথা শুনে হেমেনবাবু হেসে ফেললেন। কিন্তু জয়কুমারবাবু গম্ভীরমুখে বললেন,–বটগাছটা সম্পর্কে ছোটোবেলা থেকেই অনেক ভূতুড়ে গল্প শুনেছি। কিন্তু আমার ঠাকুরদার হাতে লাগানো গাছ। তার মানে প্রায় দুশো বছর গাছটার বয়স। আমাদের পরিবারে তাই বটগাছটা সম্পর্কে শ্রদ্ধাভক্তি ছিল। গাছটা কেটে ফেলার প্রশ্ন কখনও ওঠেনি। তবে মাঝে-মাঝে গাছটার ডালপালা এই দালানের ওপর চলে আসত।
ভোলা বলল,–ভূতুড়ে শব্দ শোনা যেত দালানে ধাক্কা লেগে। তা ঠিক। তবে সেজন্য নয়। চোরডাকাত বাইরে থেকে পাঁচিলে উঠে ডাল বেয়ে দোতলায় নামতে পারে ভেবেই ওইসব ডাল কেটে ফেলা হতো।
কালীনাথ একটু তফাতে দাঁড়িয়ে ছিল। সে বলল,–তাছাড়া বটগাছটায় কাকের বড়ো উপদ্রব হয়। কাকের স্বভাব তো জানেন! দালানের ওপর কোনও ডাল এগিয়ে এলে সেখানে বাস করত। আর রাজ্যের সব কুচ্ছিত জিনিস এনে বাসায় রাখত। ছাদে সেগুলো পড়ে যেত। ছাদ নোংরা হতো।
কর্নেল বললেন,–বুঝেছি। তবে ও কথা থাক। জয়কুমারবাবু! এবার বলুন, ফোরাম মুখুজ্জের প্রেতাত্মাকে কি আপনি সত্যি দেখেছিলেন?
জয়কুমারবাবু একটু চুপ করে থাকার পর বললেন,–খালিচোখে আমি দিনের বেলা সবকিছু স্পষ্ট দেখতে পাই। শুনলে অবাক হবেন, আমার চোখে এই আশিবছর বয়সেও ছানি পড়েনি। তবে বই বা কাগজপত্র–মানে লেখাপড়া করতে রিডিং গ্লাস দরকার হয়। রাত্রিবেলা বই পড়ার সময় জানালার ধারে ফিসফিস করে কে তিনবার ‘আংটি দে’ বলায় আমি চমকে উঠে তাকিয়েছিলুম।
–তখন আপনার চোখে রিডিং গ্লাস ছিল?
–ছিল। আবছা দেখেছিলুম গলায় দড়ির ফাঁস আটকানো কেউ উঁকি দিচ্ছে! অমনি টর্চের আলো ফেলেছিলুম। তারপর তাকে দেখতে পাইনি।
–তাকে আপনি ফেলারাম মুখুজ্জে বলে চিনতে পেরেছিলেন?
জয়কুমারবাবু গলার ভেতর বললেন, আসলে তার গলায় দড়ির ফাঁস আটকানো দেখেছিলুম একটু স্পষ্ট। তাই ধরেই নিয়েছিলুম সে ফেলারাম! তাছাড়া মুখে গোঁফদাড়ি ছিল।
কর্নেল বললেন,–ব্যাপারটা বুঝতে পারছি। রাতবিরেতে আবছা আলোতে অন্য কেউ গলায় দড়ির ফঁস আটকে উঁকি দিলেও স্বভাবত সে ফেলারাম বলেই সাব্যস্ত হতো।
–গোপী তাকে নাকি স্পষ্ট দেখেছিল। ফেলারাম বলে চিনতে পেরেছিল।
–গোপীবাবু আর বেঁচে নেই। কাজেই আপনি এবার বলুন, আংটির ব্যাপারটা কী?
জয়কুমারবাবু চাপাস্বরে বললেন,–হেমেনকে বলেছি সে কথা। আসলে আংটির কথাটা আমার মনেই ছিল না। কালী কাল কথাপ্রসঙ্গে মনে করিয়ে দিল। ঝাঁপুইহাটিতে বিদ্যুৎ এসেছিল বছর তিনেক আগে। তখন তোল্টেজ স্বাভাবিক ছিল। তাই কুয়োর জল ছাদে একটা ট্যাঙ্কে ভোলার জন্য পাম্পিং মেশিন কিনেছিলুম। দোতলায় বাথরুম তৈরি করেছিলুম। কলের মিস্তিরি ডেকে পাইপ কিনে বেসিন আর শাওয়ারের ব্যবস্থা করেছিলুম। কিন্তু পরের বছর থেকে ভোল্টেজ কমে গেল বিদ্যুতের। পাম্পে জল ওঠে না। অগত্যা পুনর্মূষিক ভব। নিচের তলায় সাবেক বাথরুম আবার ব্যবহার করতে হল।
জয়কুমারবাবু একটু চুপ করে থাকার পর ফের বললেন, আমাদের পারিবারিক লাইব্রেরি খুব পুরোনো। ঠাকুরদার বই সংগ্রহের বাতিক ছিল। তাছাড়া নানা বিষয়ে বই থেকে নোট করে রাখতেন একটা নোটবইয়ে। সেই নোটবইয়ের একটা পাতায় লাল কালিতে লেখা ছিল–দেখাচ্ছি। একমিনিট! কালী! আমার সঙ্গে চল!
