হেমেনবাবু বললেন,–এবার বর্ষায় আশ্চর্য ব্যাপার! গঙ্গায় ইলিশ নেই! সেবার কর্নেলসাহেয়বকে শীতের সময়ও ইলিশ খাইয়েছিলুম।
এইসব কথাবার্তার মধ্যে খাওয়া শেষ হল। দোতলার সেই ঘরে এসে কর্নেল ইজিচেয়ারে আরাম করে বসে চুরুট ধরালেন। আমি অভ্যাসমতো ভাতঘুমের আশায় বিছানায় শুয়ে পড়লুম। কর্নেল বললেন,–আধঘণ্টা জিরিয়ে নাও। তারপর আমরা বেরুব।
বললুম,–বৃষ্টি তো বন্ধ হয়নি।
–হয়েছে। মেঘও কেটে যাচ্ছে। আশা করি বিকেলে একটুখানি রোদ্দুর ফুটবে।
কর্নেলের কথা সত্যি হল। তিনটে নাগাদ হেমেনবাবুর সঙ্গে তাঁর গাড়িতে যখন চাপলুম, তখন আকাশ প্রায় পরিষ্কার। উজ্জ্বল রোদ্দুরে গাছপালা ঝলমল করছে। অনিল গাড়ি চালাচ্ছিল। বাজার পেরিয়ে সেই ব্যাসস্ট্যান্ডের সামনে দিয়ে কিছুদূর যাওয়ার পর বাঁদিকে মোরামবিছানো লাল রাস্তায় গাড়ি বাঁক নিল। দুধারে সরকারের বনদফতরের তৈরি নানারকম গাছের জঙ্গল। তারপর ঝপুইহাটি গ্রামে ঢুকল গাড়ি। টালি বা টিনের চালের বাড়ির পাশে ইটের বাড়িও চোখে পড়ল। একখানে সংকীর্ণ গলি রাস্তা দিয়ে ঘুরে অবশেষে উঁচু প্রকাণ্ড এবং জরাজীর্ণ একটা দেউড়ির কাছে গাড়ি থামাল অনিল। আমরা নেমে গেলুম। হেমেনবাবু বললেন, এখানকার মাটির এই গুণ। শিগগির জল শুষে নেয় বলে তত কাদা হয় না। আজ রাত্রে যদি আর বৃষ্টি না হয়, মাটির রাস্তা শুকিয়ে খটখটে হয়ে যাবে।
দেউড়ি আছে। কিন্তু কপাট নেই। হাট করে খোলা। অনিল হর্ন বাজিয়েছিল। একটু পরে একজন কালো দানবের মতো মানুষ, পরনে খাটো ধুতি এবং গায়ে ফতুয়া, করজোড়ে একটু ঝুঁকে প্রণাম করে বলল,–আসুন দাদাবাবু! কর্তামশাই আমাকে এখনই বলছিলেন, আপনার বাড়ি গিয়ে খবর নিয়ে আসি। তা ইনি সেই কর্নেলসায়েব? প্রণাম স্যার! আপনাকে দূর থেকে শীতের সময় দাদাবাবুর সঙ্গে নৌকোয় দেখেছিলুম। আসুন! ভেতরে আসুন!
হেমেনবাবু বললেন,–কালীনাথ! গোপীবাবুর বডি দাহ হয়ে গেছে তো?
–আজ্ঞে, সকালে আমরা পাড়ার কজনকে নিয়ে কেষ্টনগরে গিয়েছিলুম। ম্যাটাডোর ভাড়া করে বডি এনে আপনাদের বাবুগঞ্জের শ্মশানঘাটে দাহ করেছি। একটু আগে গঙ্গাস্নান করে ফিরেছি। গোপীদার ভাগ্য দাদাবাবু! শ্মশানে খুব ভিড় হয়েছিল। কতজনে ফুলের মালা দিয়ে ভক্তি জানাল।
–হ্যাঁ। গোপীবাবু জনপ্রিয় ছিলেন। ফাংশানে বা যাত্রা-থিয়েটারে বেহালা বাজাতেন। তো আমাকে একটু খবর দাওনি কেন?
–আজ্ঞে, মাথার ঠিক ছিল না। এখনও নেই। মাথামুন্ডু কিছু বুঝতে পারছি না। সবাই বলছে, খুনি ভুল করে কাকে মারতে কাকে মেরেছে!
বাউন্ডারি ওয়ালের অবস্থাও শোচনীয়। দোতলা প্রাসাদতুল্য বাড়িটা অবশ্য অটুট আছে। একতলা এবং দোতলায় সারবন্দি মোটা থাম। প্রাঙ্গণের অনেকটা জুড়ে ঝোঁপজঙ্গল গজিয়েছে। বাড়ির সামনে কিছু অংশ পরিষ্কার। সেখানে বারান্দার একটা অংশ অর্ধবৃত্তাকারে বেরিয়ে এসেছে। কয়েকধাপ সিঁড়ি বেয়ে ওখানে উঠতে হয়। সেই অর্ধবৃত্তাকার জায়গায় এক বৃদ্ধ ভদ্রলোক ছড়ি হাতে দাঁড়িয়ে ছিলেন। তার পরনে পাজামা আর খয়েরি রঙের পাঞ্জাবি। মাথার চুল সাদা। গোঁফও সাদা। ফর্সা রং। চেহারায় বনেদি আভিজাত্যের ছাপ আছে।
আমাদের দেখে তিনি সিঁড়ি বেয়ে নেমে এলেন। তারপর ছড়িসুদ্ধ হাতে কর্নেলের হাত জড়িয়ে ধরে ধরাগলায় বললেন,–সেই তো এলেন। কিন্তু বড় দেরি করে এলেন কর্নেলসায়েব!
কর্নেল বললেন,জয়কুমারবাবু! আমি জানি, আপনি বিদ্বান মানুষ। আপনি এটুকু নিশ্চয়ই বুঝতে পারছেন, ব্যাপারটা ভৌতিক বলেই আমি তত গুরুত্ব দিইনি। অবশ্য আংটির ব্যাপারটা শুনে আমি মনে-মনে একটা অঙ্ক কষেছিলুম। অঙ্কটা দেখা গেল ঠিক ছিল না। গোপীমোহনবাবু আমাকে নিশ্চয় সব কথা খুলে বলেননি। বললে আমার অঙ্ক হয়তো ঠিকই মিলে যেত।
জয়কুমারবাবু বললেন,–কালী! এই রোয়াকে কয়েকটা চেয়ার পেতে দে। এখানে ছায়া পড়েছে। খোলামেলা হাওয়ায় এঁদের বসাই। এই গ্রামে বিদ্যুতের যা দুরবস্থা!
অর্ধবৃত্তাকার রোয়াকে আমরা বসার পর জয়কুমারবাবু বললেন,–গোপী কি আপনাকে বলেনি ফেলারাম গতবছর এমনি জুলাই মাসের নিশুতি রাতে ওই মন্দিরের তালা ভেঙে ভেতরে ঢুকেছিল।
কর্নেল বললেন–না তো?
–আশ্চর্য! কালীনাথ কীভাবে টের পেয়ে ফেলারামকে হাতেনাতে মন্দিরের ভেতর ধরে ফেলেছিল। আমাদের গৃহদেবতা রুদ্রদেবের বেদি ধরে সে টানাটানি করছিল। সেই জন্যই তো আমি তাকে দড়ি দিয়ে থামের সঙ্গে বেঁধে রেখেছিলুম। আর কীভাবে দড়ির বাঁধন খুলে ফেলারাম মনের দুঃখে পেছনের বটগাছে উঠে সেই দড়ির ফাস গলায় আটকে ঝুলে পড়েছিল।
–গোপীবাবু এ কথা তো বলেননি। উনি বলেছিলেন কী ব্যাপারে আপনি তাকে বকাবকি করেছিলেন। সেই জন্য তিনি আত্মহত্যা করেন।
হেমেনবাবু বললেন,–রুদ্রদেবের বেদি ধরে কেন টানাটানি করেছিল ফেলারাম?
জয়কুমারবাবু রুষ্টমুখে বললেন,–বিগ্রহ ওপড়াতে পারেনি। তাই বেদিসুদ্ধ উপড়ে নিতে চেষ্টা করেছিল। তুমি ভালোই জানো হেমেন! আজকাল বিগ্রহ চুরি করে বিদেশে পাচার করে বদমাশ লোকেরা প্রচুর টাকাকড়ি পায়! কিন্তু আমার অবাক লাগছে। গোপীকে আমি এই কথাটা কর্নেলসায়েবকে গুরুত্ব দিয়ে বলতে বলেছিলুম। অথচ সে বলেনি। এ তো অদ্ভুত ব্যাপার!
