দম বন্ধ করে শুয়ে আছি। সেই সময় কর্নেলের নাক ডাকা বন্ধ হল। একটু সাহস পেলুম। বুড়ো জাগুক, হে ভগবান! বুড়ো ঘুঘুকে জাগিয়ে দাও। এ সব ব্যাপারে ওঁর মাথা খেলে ভাল। এ বয়সে গায়ের জোরও অসাধারণ। যোদ্ধা লোক। যুযুৎসু জানেন কতরকম। শত্রুকে ঢিট করতে জুড়ি নেই ওঁর।
হঠাৎ আবার চমকে উঠলুম। আমার পাশেই তাঁবুর গয়ে খসখস শব্দ! সেই গন্ধটা আরও বিকট এবার। তারপরই কী একটা আমার কপালে এসে পড়ল। ঠাণ্ডা অতি ঠাণ্ডা কিছু শক্ত জিনিস। ওমনি আঁতকে উঠে চেঁচালুম-কর্নেল! কর্নেল! আর যন্ত্রের হাতে টর্চের বোতাম টিপে দিলুম। ওদিক কর্নেলের টর্চও জ্বলে উঠেছে। এক মুহূর্তের জন্য দেখলুম, আমার মাথার উপর দিয়ে একটা—অবিশ্বাস্য! রীতিমতো অবিশ্বাস্য! একটা কঙ্কালের হাত সাঁৎ করে সরে গেল। তাবুটা জোরে নড়ে উঠল। পরক্ষণে বাইরে দূরে—অনেক দূরে কারা মিহি খনখানে গলায় হেসে উঠল-হি হি হি হি …হি হি হি হি… হি হি হি হি!
তারপর কী হল মনে নেই। জ্ঞান হারিয়ে ফেলেছিলুম। যখন জ্ঞান ফিরল, দেখি হ্যাসাগটা কখন জ্বালা হয়েছে। রাতে ওটা নিভিয়ে রাখা হয়েছিল—কারণ আলো থাকলে পাছে দেওয়ালের আলৌকিক শক্তির লীলাখেলায় বাধা পড়ে।
কর্নেল ও দীক্ষিত বললেন—জয়ন্ত! জয়ন্তবাবু!
উঠে বসলুম। অমনি সব মনে পড়ে গেল। রুদ্ধশ্বাসে বলুম—ওরা কি পালিয়েছে? ওরা কারা এসেছিল কর্নেল?
কর্নেল গম্ভীর মুখে মাথা নাড়লেন। বললেন—জানি না। সত্যি জয়ন্ত, আমি অবাক। হতভম্ব। বিস্তর ঘটনা ঘটতে দেখেছি জীবনে। কিন্তু এর কোনও মাথামুণ্ডু বুঝতে পারছিনে! একটা জীবন্ত কঙ্কাল! সত্যিকারের কঙ্কাল। বালিতে এইমাত্র তার পায়ের ছাপ আমরা দেখে এলাম। ও ছাপ কোনও মানুষ বা প্রাণীর নয়, তা হলফ করে বলতে পারি। আর ওই বিকট হাসিই বা কারা হাসছিল কে জানে?
দীক্ষিত বললেন—হাসিগুলো গুর্গিন খাঁর দেয়াল থেকে আসছে মনে হচ্ছিল কর্নেল। আমিও সেবার এসে ওই হাসি শুনেছিলুম। তখন বুঝতে পারিনি।
কর্নেল ঘড়ি দেখ বললেন-সাড়ে বারোটা প্রায়। আর কী? আলোটা আবার নিভিয়ে দেওয়া যাক। আধ ঘন্টা পরে আমরা বেরোব! জয়ন্ত, আর ঘুমিও না।
বেরোতে হবে? কাঁচুমাচু মুখে তাকালুম। তা লক্ষ্য করে কর্নেল চাপা স্বরে ধমক দিয়ে বললেন—এই রকম ভয় পেলে তো চলবে না, জয়ন্ত। তুমি না খবরের কাগজের রিপোর্টার!……
ঠিক একাটায় আমরা বেরিয়েছি। প্রচণ্ড শীত। আমার তো সবসময় বুক ঢিব ঢিব করছে। কিন্তু উপায় নেই। কর্নেল আমাকে জোর করে নিয়ে এসেছেন। নদীর উত্তর পাড়ে অন্ধকারে চুপি চুপি আমরা তিনজন এবং তিনজন সেপাই একটা পাথরের আড়ালে ওত পেতে বসেছি। একজন সেপাই রয়ে গেল তাবুর পাহারায়। রয়ে গেল মাথধারাম বাবুর্চিও।
বসে আছি তো আছি। আমাদর তিরিশ গজ সামনে গুর্গিন খাঁর দেয়াল অন্ধকারে দাঁড়িয়ে রয়েছে। কী অদ্ভুত দেখাচ্ছে ওই কালো দেয়ালটা! মনে হচ্ছে হাজার হাজার অদৃশ্য চোখ দিয়ে সে আমাদের দেখছে আর দেখছে। শয়তানি মতলব ভঁজছে। যেন উত্তুরে হাওয়ার ভাষায় শনশন করে বলছে—চলে আয়! আয় রে আয়! এই সময় দূরে প্লেনের শব্দ শুনলুম। দেয়ালের আড়ালে পড়ে গেল বলে প্লেনটা দেখতে পেলুম না।
কতক্ষণ পরে হঠাৎ কর্নেল ফিসফিস করে উঠলেন—ও কী?
তাকিয়ে দেখি, হা—যা শুনেছিলুম, তাই। দুটো লাল জ্বলজ্বলে চোখ যেন দেয়ালের ওপর স্থির হয়ে আছে। একটু পরে চোখ দুটো দুলতে শুরু করল। ওপরে-নিচে। কখনও দপাশে। দুলছে আর মাঝে মাঝে যেন চলে বেড়াচ্ছে।
অন্তত দীর্ঘ পাঁচ মিনিট ব্যাপারটা ঘটল। তারপর এক ঝলক আলো আকাশের দিকে ছুটে গেল ধূমকেতুর মতো। কয়েক সেকেন্ড ওই আলোর ঝাঁটাটা স্থির হয়ে থাকার পর ডাইনে বাঁয়ে দুবার নড়ে উঠল। তারপর আবার স্থির।
ঠিক এই সময় কানে এল বিকট এক চিৎকার। ও কি মানুষের না দানবের? মাথায় পুরু করে মাফলার কান অব্দি জড়ানো। তবু মনে হল কানে তালা ধরে যাচ্ছে। আঁ-আঁ আঁ আঁ অ্যাঁ! অদ্ভুত সেই আওয়াজ যেন আর্তনাদ, যেন প্রচণ্ড ক্রোধ। আমরা শক্ত হয়ে বসলুম। দীক্ষিত কী বলতে যাচ্ছিলেন, হঠাৎ দেখি কর্নেল উঠে দাঁড়ালেন। তারপর চাপা স্বরে চলে এস তোমরা বলেই হাঁটতে শুরু করলেন।
কী সর্বনাশ! এ যে স্বেচ্ছায় মৃত্যুবরণ করার শামিল। কিন্তু উপায় নেই। একা এখানে পড়ে থাকার সাহস আমার নেই। এমনকী দৌড়ে নদীর তলায় তাঁবুর কাছেও যেতে পারব না—যদি ফের জ্যান্ত কঙ্কালের পাল্লায় পড়ে যাই!
পিছনে অন্ধের মতো মরিয়া হয়ে চললুম। কয়েক পা যেতেই দেওয়ালের অশরীরীরা আওয়াজ আরও বাড়িয়ে দিল। সে বিকট চেঁচামেচির বর্ণনা ভাষায় দেওয়া দুঃসাধ্য। যেন হাজার হাজার প্রাগৈতিহাসিক দত্যি-দানো হঠাৎ নিশুতি রাতে ঘুম ভেঙে হইচই বাধিয়েছে। কখনও মনে হচ্ছে। তারা আর্তনাদ করছে, কখনও হি হি হি করে তখনকার মতো বিকট ভূতুড়ে অট্টহাসি হাসছে।
ঢিবির কাছে আমরা পৌঁছনোর সঙ্গে সঙ্গে কর্নেল টর্চ জ্বেলে দেয়ালে আলো ফেললেন। অমনি আমার পিলে চমকে উঠল। পাঁচিলের সেই ফাটলে মরা গাছটার ডালে ঠ্যাং ঝুলিয়ে বসে আছে। সেই জ্যান্ত কংকালটা। এই দৃশ্য দেখামাত্র সেপাইরা হুকুম পাওয়ার আগেই দুমদাম বন্দুক ছুড়তে শুরু করল। প্রচণ্ড প্রতিধ্বনি উঠল। সবাই দৌড়ে ঢিবিতে উঠলুম। কর্নেলের টর্চ সামনে কঙ্কালটার ওপর পড়ে রয়েছে। কঙ্কালটা নড়ছে এবার। কর্নেল জ্বলন্ত টর্চ ও রিভলভার হাতে নিয়ে সেদিকে দৌড়ে গেলেন। অমনি সব বিকট আওয়াজ থেমে গেল। অস্বাভাবিক স্তব্ধতা জাগল।
