তারপর আমার দিকে তাকিয়ে তিনি বললেন,–কী সৌভাগ্য! আপনার এই তরুণ সাংবাদিক বন্ধুর কথা শুনেছিলুম! আসুন জয়ন্তবাবু!
কর্নেল একটু হেসে বললেন,–জয়ন্তের কথা কি আপনাকে আমি বলেছিলুম?
-আপনি বলেননি। দৈনিক সত্যসেবক পত্রিকা বলেছে।
কর্নেল বললেন–জয়ন্ত! ইনিই হেমেন্দ্রকুমার সিংহরায়। আমি বাইনোকুলারের সাহায্যে পাখি চিনতে পারি। হেমেনবাবু খালি চোখেই চিনে ফেলেন। দূরদৃষ্টিসম্পন্ন মানুষ!
হেমেনবাবু হাসতে-হাসতে আমার কাঁধে হাত রেখে হলঘরে ঢুকলেন। তারপর সিঁড়ি বেয়ে দোতলায় উঠতে-উঠতে বললেন,–দূরদৃষ্টিশক্তি হারিয়ে ফেলেছি কর্নেলসায়েব। কাল বিকেলেই আমি নৌকো করে বিলে গিয়েছিলুম। জেলেদের মুখে খবর পেয়েছিলুম, ফ্লুইস গেটের পাশে অশ্বত্থা গাছে নাকি দুটো গগনবেড় পাখি এসেছে। গিয়ে তাদের পাত্তা পেলুম না। ফেরার সময় ডাকিনীতলা জলটুঙ্গির পশ্চিমদিক হয়ে আসছিলুম। তখন সূর্য মেঘের আড়ালে ডুবে গেছে। যে গাব গাছের তলায় গোপীবাবুর লাশ পাওয়া গেছে, সেদিকে আমি নিশ্চয়ই তাকিয়ে থাকব। অথচ গোপীবাবুকে দেখতে পাইনি। দেখতে পেলে উনি বেঁচে যেতেন। আমার হাতে বন্দুক ছিল। অথচ সময়ের হিসেবে দেখছি, ঠিক ওই সময় গোপীবাবু বিলের ধারে এসেছিলেন।
কর্নেল বললেন,–ডাকিনীতলার জলটুঙ্গিতে যাওয়াই ওঁর উদ্দেশ্য ছিল সম্ভবত।
-ঠিক ধরেছেন। গত শীতকালে আপনার কাছে আভাস পেয়ে আমি মজাটা দেখার জন্যে একদিন ওখানে গিয়ে ওত পেতেছিলুম। হঠাৎ দেখি সন্ধ্যার একটু আগে কঁপুইহাটির চরণজেলে ছোটো একটা নৌকা বেয়ে এল জেলেপাড়ার ঘাট থেকে। তারপর গোপীবাবুকে ডাকিনীতলায় পৌঁছে দিতে গেল। আপনি ঠিকই ধরেছিলেন। রাতবিরেতে গোপীবাবু ডাকিনীতলায় বেহালা বাজাতে যেতেন। চরণ ছিল তার সঙ্গী।
দোতলার বারান্দায় হাঁটতে-হাঁটতে বললুম,–অদ্ভুত ব্যাপার! কেন ওঁরা–
আমার কথার ওপর হেমেনবাবু বললেন,–এই কেনটা আমাকেও বহুদিন জ্বালিয়েছিল। একদিন চরণকে হুমকি দিতেই সে রহস্যটা ফাঁস করে দিল। গোপীবাবুর নাকি গাঁজা খেলে বেহালার হাত ভালো খুলে যায়। রায়চৌধুরিমশাই টের পেলে বিপদ ঘটবে। তাই গোপনে ডাকিনীতলায় গিয়ে গাঁজা খেয়ে মনের সুখে গোপীবাবু বেহালা বাজাতেন। চরণও গাঁজার ভক্ত। মাঝে-মাঝে গাঁজা চটকে ছিলিম সাজিয়ে গোপীবাবুকে দেয় এবং তার প্রসাদ পায়। দুই গেঁজেলের কীর্তি! তবে শুনেছি, গাঁজা খেলে নাকি সত্যিই মনের কনসেন্ট্রেশন আসে। সাধুসন্ন্যাসীরা ধ্যানে বসার আগে সেইজন্য নাকি গাঁজা খান!
উত্তরদিকে শেষপ্রান্তের ঘরে আমাদের থাকার ব্যবস্থা করা হয়েছিল। জানালা দিয়ে পশ্চিমে বাঁধের গাছপালার ফাঁকে বর্ষার উত্তরঙ্গ গঙ্গা এবং উত্তরের বিস্তীর্ণ জলাভূমি দেখা যাচ্ছিল। কর্নেল বাইনোকুলারে একবার দেখে নিয়ে বললেন, শীতকালের চেয়ে এখন বর্ষাকালেই প্রকৃতির রূপ বেশি খোলে।
হেমেনবাবু বললেন, প্রকৃতির রূপ পরে দেখবেন। স্নান করতে হলে করে নিন। তারপর খেয়েদেয়ে বিশ্রাম করে বেরুবেন। না–এই অসময়ে কফি নয় কর্নেলসায়েব! আমারও খিদে পেয়েছে। আপনাদের সঙ্গে খাব বলে অপেক্ষা করছিলুম।
এতক্ষণে আমার হালদারমশাইয়ের কথা মনে পড়ে গেল। বললুম,–প্রাইভেট ডিটেকটিভ মিঃ কে. কে. হালদারের খবর কী? ওঁর তো গতরাত্রেই এখানে আসবার কথা।
হেমেনবাবু একটু হেসে বললেন,–উনি গতরাত্রে বারোটা নাগাদ এসেছেন। কাল কর্নেলের ট্রাংককল পেয়ে আমি ওঁর জন্য অপেক্ষা করছিলুম। আজ ভোরে উনি বললেন, ওঁর পক্ষে ঝাঁপুইহাটির কাছাকাছি কোথাও থাকলে সুবিধে হয়। তাই ইরিগেশন বাংলোয় ওঁকে নিয়ে গিয়ে থাকার ব্যবস্থা করে দিয়েছি। বাংলোটা বাবুগঞ্জের উত্তর-পূর্ব কোণে শেষপ্রান্তে। নিচেই বিল। চমৎকার জায়গা। ওদিকে ঝপুইহাটিও খুব কাছে। একটা আমবাগান আর জটাবাবার থান পেরিয়ে নাকবরাবর সিধে হাঁটলে জমিদারবাড়ি আরও কাছে। সেচবাংলোয় টেলিফোন আছে। কিছুক্ষণ আগে টেলিফোন করে ওঁর খোঁজ নিলুম। কেয়ারটেকার শচীন বলল, মিঃ হালদার ব্রেকফাস্ট করে বেরিয়েছেন।
কর্নেলের তো সামরিক জীবনের অভ্যাস। সপ্তাহে দু’দিন অন্তর স্নান করেন। তবে এটা এপ্রিল থেকে অক্টোবর পর্যন্ত। নভেম্বর থেকে মার্চ সপ্তাহে মাত্র একদিন। তবে গরম জলে শরীর স্পঞ্জ করেন মাঝে-মাঝে। আমি একা স্নান করতে বাথরুমে ঢুলুম।
তারপর পোশাক বদলে বেরিয়ে এসে দেখি, হেমেনবাবুর সঙ্গে কর্নেল কথা বলছেন। হেমেনবাবুর একটা কথা কানে এসেছিল। ‘জয়কুমারদা আংটির ব্যাপারটা এতদিনে বুঝতে পেরেছেন। আমাকে দেখে হেমেনবাবু উঠে দাঁড়িয়ে বললেন,–আমি লাঞ্চের ব্যবস্থা করি। রতন এসে আপনাদের ডেকে নিয়ে যাবে।
তিনি চলে গেলে কর্নেলকে বললুম,–আংটি রহস্য নিয়ে আপনাদের কথা হচ্ছিল। একটু আভাস অন্তত দিন!
কর্নেল হাসলেন,–”আংটি এখনও রহস্য হয়েই আছে। জয়কুমারবাবু আংটির ব্যাপারে কী বুঝেছেন, তা হেমেনবাবুকে খুলে বলেননি। কাজেই তোমাকে কোনও আভাস দিতে পারছিনে।
বলে তিনি আমার ব্যাগ থেকে তার একপ্রস্থ পোশাক আর তোয়ালে বের করে নিয়ে বাথরুমে ঢুকলেন। আমি পশ্চিমের জানালা দিয়ে গাছপালার ফাঁকে গঙ্গা দেখতে থাকলুম।
খাওয়ার ঘর নিচের তলায়। হেমেনবাবুর স্ত্রী সুষমা দেবী আমাদের খুব আদর-যত্ন করে খাওয়ালেন। কর্নেলের সঙ্গে তাঁর পরিচয় আছে। কর্নেলকে সুষমা দেবী পরিহাস করে বললেন,–কর্নেলসায়েব সেবার এসে বলেছিলেন, শিগগির আবার আসব। তো এমন সময় এলেন, বেড়াতে বেরুনোর উপায় নেই। আকাশের মুখ ভার। বৃষ্টি আর বৃষ্টি! বাবুগঞ্জের ইলিশ খেলেও পোষাত। এবার এখনও ইলিশের দেখা নেই।
