কর্নেলের কথা শেষ হওয়ার পরই হালদারমশাই কোনও কথা না বলে সবেগে বেরিয়ে গেলেন। আমি হতবাক হয়ে শুনছিলুম। এবার বললুম,–মনে হচ্ছে, হালদারমশাই হঠাৎ চলে এসে ভুল করেছেন। উনি ওখানে থাকলে খুনি যে-ই হোক, সে হতভাগ্য গোপীমোহনবাবুকে মেরে ফেলার ঝুঁকি নিত না।
কর্নেল দাড়ি থেকে চুরুটের ছাই ঝেড়ে ফেলে বললেন,–একটা ব্যাপার স্পষ্ট হল। ভূতের ভয় দেখিয়ে কাজ হচ্ছে না এবং কলকাতা থেকে গোয়েন্দা আনা হয়েছে। কাজেই ভূতটা মরিয়া হয়ে উঠেছিল।
.
তিন
পরদিন কর্নেল এবং আমি বাসে চেপে বাবুগঞ্জ পৌঁছুলুম। তখন প্রায় সাড়ে এগারোটা বাজে। আকাশ মেঘলা। টিপটিপ করে বৃষ্টি পড়ছিল। বাস থেকে নেমে দু’জনে বাসস্ট্যান্ডের ছাউনির তলায় গিয়ে রেনকোট পরে নিলুম। কর্নেল তার পিঠে আটকানো কিটব্যাগ হাতে নিলেন। আমি একটা বড়সড় নীলরঙের পলিথিন ব্যাগ নিয়েছিলুম। তাতে কর্নেলের কিছু পোশাক-আশাক ঠাসা ছিল।
কর্নেল বললেন,–শর্টকাটে হেমেনবাবুর বাড়ি এখান থেকে তত কিছু দূর নয়। চলো! হেঁটে যাওয়াই ভালো। সাইকেলরিকশোতে যেতে হলে অনেকটা পথ ঘুরে যেতে হবে।
বাসস্ট্যান্ডের চারদিকে বাজার। বৃষ্টির মধ্যেও ছাতি মাথায় মানুষজন ভিড় জমিয়েছে। ট্রাক-বাস-টেম্পো-সাইকেলরিকশোর ভিড়ও যথেষ্ট। জল-কাদাও চারদিকের চত্বরে থকথক করছে। এর মধ্যে দিয়ে কর্নেল পায়ে হেঁটে যেতে চাইছেন শুনে বিব্রত বোধ করছিলুম।
কিন্তু আমরা বাসস্ট্যান্ডের ছাউনি থেকে সবে বেরিয়েছি, একটা মাঝবয়সি লোক এসে সেলাম দিল। কর্নেল অমায়িক হেসে বললেন,–আরে অনিল যে! তুমি বাজারে এসেছিলে বুঝি?
অনিল নামে লোকটা বলল,–না স্যার! বাবু আপনার জন্য গাড়ি পাঠিয়েছেন! ওই দেখুন গাড়ি। বাবু বলেছেন, বাস লেট করলে বৃষ্টিতে সায়েব ভিজে যাবেন। চলুন স্যার!
বাসস্ট্যান্ডের দক্ষিণ-পশ্চিম কোণে চওড়া রাস্তার পাশে একটা সাদা অ্যাম্বাসাড়ার গাড়ি দাঁড় করানো ছিল। আমরা সেই গাড়িতে উঠে বসলুম। অনিলই ড্রাইভার। কিছুদূর দুধারে দোকানপাট। তারপর ডাইনে ঘুরে সুন্দর ছবির মতো একতলা-দোতলা বাড়ি এবং সাজানো ফুলবাগিচা। অনিল বলল,–বাবু এই নিউ টাউনশিপে এক বিঘে জায়গা কিনে রেখেছিলেন। নতুন বাড়ি করার ইচ্ছে ছিল কিন্তু সাবেক বাড়ি ছেড়ে আসতে পারলেন না। জায়গাটা দশলাখ টাকায় বেচে দিয়েছেন।
কর্নেল বললেন, আমার মতে, ভালোই করেছেন। গঙ্গার ধারে পৈতৃক বাড়ি ফেলে এখানে চলে আসার মানে হয় না। পশ্চিমে গঙ্গা, উত্তরে বিল। অমন জায়গা ছেড়ে আসতে আছে?
–আজ্ঞে তা অবিশ্যি ঠিক। তবে যা দিনকাল পড়েছে, ওদিকটায় জল-ডাকাতদের বড় উপদ্রব। নৌকোয় চেপে ডাকাতরা এসে কতবার হামলা করেছে। বাবুপাড়ার সব পয়সাওয়ালা লোক টাউনের ভেতরদিকে ক্রমে-ক্রমে চলে এসেছেন। শুধু আমার বাবুমশাই সাহস করে আছেন।
–আচ্ছা অনিল, বাসে আসবার সময় শুনলুম, কঁপুইহাটিতে জমিদারবাড়ির কে নাকি খুন হয়েছে?
অনিল এবার বাঁদিকে সংকীর্ণ পিচরাস্তায় গাড়ি ঘোরাল। তারপর বলল,–ও বাড়িতে গৃহদেবতার অভিশাপ লেগেছে স্যার! গতবছর এমনি বর্ষার রাতে গলায় দড়ি দিয়ে মরেছিল ফেলারাম মুখুজ্জে। এবার বর্ষায় আবার অপঘাতে মরল গোপীবাবু। আমি দেখতে যেতুম না। আমার বাবুর সঙ্গে জমিদারবাড়ির কর্তাবাবুর মেলামেশা আছে। তাই বাবু আমাকে বললেন, গাড়ি বের করো অনিল। ঝাঁপুইহাটি যাব। বর্ষায় রাস্তার মোরাম কাদা হয়ে গেছে। সাবধানে গাড়ি চালিয়ে গেলুম। গাড়ি জমিদারবাড়ির কাছে রেখে বাবুর সঙ্গে বিলের ধারে গিয়ে দেখি, পুলিশ এসে গেছে। গোপীবাবুর লাশ স্ট্রেচারে বয়ে নিয়ে গেল হাসপাতালের লোকেরা। শুনলুম, মাথার পেছনে ডাণ্ডা মেরেছে কেউ। বাবুমশাই থানার অফিসারদের সঙ্গে কীসব কথাবার্তা বললেন। তারপর ওঁরা জমিদারবাড়ি এসে ঢুকলেন। আমি গাড়িতে বসেছিলুম। গোপীবাবুর মতো লোককে কেউ মেরে ফেলবে এ কথা ভাবাই যায় না।
কর্নেল বললেন,–গোপীবাবু নাকি ভালো বেহালা বাজাতেন?
-আজ্ঞে, হ্যাঁ। জমিদারবাড়িতে একসময় গানবাজনার চর্চা ছিল। তাছাড়া আমাদের বাবুগঞ্জে ফাংশান হলেই গোপীবাবুকে বেহালা বাজানোর জন্য খাতির করে ডেকে আনা হতো। একটু খামখেয়ালি লোক ছিলেন। হঠাৎ-হঠাৎ চটে যেতেন। কিন্তু বেজায় নিরীহ লোক। তাকে কে খুন করল, কেনই বা খুন করল বোঝা যায় না।
-বাসে আসবার সময় শুনছিলুম, জমিদারবাড়িতে নাকি গলায়-দড়ি ভূতের উপদ্রব আছে?
অনিল হাসল,–কথাটা ইদানীং বাবুগঞ্জেও রটেছে স্যার। পাশাপাশি গ্রাম। ঝাঁপুইহাটির লোকেরা বাজারে আসে। কাজেই কঁপুইহাটিতে কিছু ঘটলে বাবুগঞ্জে তার খবর আসতে দেরি হয় না।
–তোমার কী ধারণা?
–আজ্ঞে স্যার, ভূত-পেরেত নিশ্চয় আছে। অপঘাতে মানুষ মরলে তার আত্মার মুক্তি হয় না। কাজেই ফেলারামবাবুর আত্মা জমিদারবাড়ি ছেড়ে যেতে পারছে না।
এবার আর এক বাঁক ঘুরে গঙ্গার বাঁধের সমান্তরাল রাস্তায় কিছুদূর এগিয়ে একটা পুরোনো বিশাল বাড়ির গেটে গাড়ি পৌঁছল। গেটে দারোয়ান ছিল। হর্ন শুনে গেট খুলে দিল। নুড়িবিছানো রাস্তায় এগিয়ে গাড়ি দাঁড়াল পোর্টিকোর তলায়। একজন শ্যামবর্ণ বলিষ্ঠ গড়নের প্রৌঢ় ভদ্রলোক করজোড়ে নমস্কার করে সহাস্যে বললেন,–সুস্বাগতম!
