ষষ্ঠীচরণ কফি রেখে গেল। কর্নেল বললেন,–আবার এক পেয়ালা গরম কফি খান হালদারমশাই! আপনার নার্ভ আরও চাঙ্গা হবে।
খামু? তা আপনি যখন কইতাছেন, খাই। –বলে প্রাইভেট ডিটেকটিভ কফির পেয়ালা তুলে অভ্যাসমত ফুঁ দিয়ে তারপর চুমুক দিলেন।
কর্নেল বললেন, তাহলে জয়ন্ত, বুঝতেই পারছ ঝাঁপুইহাটি কী সাংঘাতিক জায়গা ঝোঁপজঙ্গল থেকে আচমকা কেউ ঢিলের বদলে মারাত্মক কিছু ছুঁড়ে মারলেই বিপদ।
হালদারমশাই বললেন,–কইলাম ঢিল। কিন্তু মাটির ঢিল নয়, পাটকেল কইতে পারেন। অথচ ওখানে ইট-পাটকেল দেখি নাই। নরম মাটি। কোন ব্যাটায় পাটকেল ছুড়ছিল। তার মানে, আমারে সে ফলো করছিল। অনেকগুলি পাটকেল সঙ্গে নিছিল।
কর্নেল বললেন, আপনি এক রাউন্ড ফায়ার করে ভালোই করেছেন হালদারমশাই। ভূত হোক, আর মানুষ হোক, ফায়ার আর্মসকে ভয় পায়। এবার সে সতর্ক হবে।
বললুম,–আর দুটো রহস্যময় ঘটনা কী হালদারমশাই?
হালদারমশাই বললেন,–জয়কুমারবাবু দোতলার একখান ঘরে আমার থাকার ব্যবস্থা করছিলেন। তখন রাত্রি প্রায় চাইরটা। বৃষ্টি ছিল। সবে পোশাক বদলাইয়া চেয়ারে বসছি। আর সেই পালোয়ান কাশীনাথ মশারি লইয়া ঘরে ঢুকছে। বিদ্যুৎ ছিল লো ভোল্টেজ। উত্তরের জানালা দিয়া হঠাৎ দেখি আবছা আলোতে বৃষ্টির মধ্যে বটতলার দিকে কেউ যাইতাছে। তখনই টর্চের আলো ফোকাস করলাম। এক সেকেন্ডের জন্য চোখে পড়ল, সেই লোকটার গলায় দড়ির ফাঁস আটকানো।
–তারপর? তারপর?
–তারপর সে ভ্যানিশড। কাশীনাথ কইল, ও কিছু না। কিন্তু আমি ট্রেনজার্নিতে টায়ার্ড। সারা রাত্র জাগছি। ঘুম আসতাছে। তাই শুইয়া পড়লাম।
–আর-একটা রহস্যময় ঘটনা কী?
–আইজ সকাল দশটায় ব্রেকফাস্ট করছিলাম। তারপর সেই বটগাছের কাছে তদন্ত করতে গেলাম। গিয়া দেখি, গাছটার গুঁড়ির উল্টোদিকে কাদার কয়েকখান ছাপ। কেউ গাছে চড়ছিল। রাত্রিবেলা–মানে কাইল শেষরাত্রে যারে দেখছিলাম সেই গাছে চড়ছিল। ক্যান? হেভি মিস্ত্রি।
–হেভি মিস্ত্রি তো বটেই। ভূতের পায়ে কাদা লাগবে আর সেই পায়ের ছাপ গাছের গুঁড়িতে দেখতে পাওয়া যাবে, এ কেমন ভূত?
গোয়েন্দাপ্রবর মাথা নেড়ে বললেন,–ভূত না। মাইনষের কাম। কথাটা আমি জয়কুমারবাবুর লগে আলোচনা করলাম। উনি কইলেন, মাইনষের কামই বটে। কিন্তু উনি স্বচক্ষে যারে জানালার বাইরে দেখছিলেন, সে সেই ফেলারাম ছাড়া আর কেউ না। অথচ চিতায় তার ডেডবডি পুইড়া কবে ছাই হইয়া গেছে। আমি কইলাম, আপনার চোখের ভুল হইতেও পারে। উনি কইলেন, না। উনি নাকি ঠিকই দেখছিলেন।
–আপনি আংটি সম্পর্কে প্রশ্ন করেননি?
–করছিলাম। উনি কইলেন, আংটির কথা উনি জানেন না। ফেলারামের আঙুলে উনি আংটি দেখেন নাই। আংটি সে পাবে কোথায়? উড়নচণ্ডী নেশাখোর চালচুলোহীন লোক। দয়া কইর্যা বাড়িতে আশ্রয় দিচ্ছলেন। প্রায়ই সে নাকি বাড়ির দামি জিনিসপত্র চুরি করত। কোথায় কারে বেইচ্যা আসত। জয়কুমারবাবুর লাইবেরির কত দামি বই সে চুরি কইর্যা কোথায় কারে বেচছিল। তবে এইজন্য উনি ফেলারামবাবুরে শুধু বকাবকি করতেন। তার বেশি কিছু না।
বলে হালদারমশাই কর্নেলের দিকে ঘুরলেন,–কর্নেলস্যার! আমি এবার যাই গিয়া। যা-যা কইছেন, সেই-সেইমতো কাম হইব।
কর্নেল চোখ বুজে চুরুট টানছিলেন। চোখ না খুলেই বললেন,–হ্যাঁ। আপনি বাসেই সোজা বাবুগঞ্জে চলে যান। আমার চিঠিটা হেমেনবাবুকে দেবেন। আপনার কোনও অসুবিধে হবে না। আজ দুপুরে আমি হেমেনবাবুকে ট্রাংককল করে আমার যাওয়ার কথা বলেছি।
একটু অবাক হয়ে বললুম,–বাবুগঞ্জে টেলিফোন আছে নাকি?
–বাবুগঞ্জ মফস্বল শহর হয়ে উঠেছে। সেখানেই বিদ্যুতের সাব-স্টেশন, থানা, হাসপাতাল, বাজার। পাশের গ্রাম কঁপুইহাটির বিশেষ উন্নতি হয়নি। তবে রেললাইনের কাছাকাছি গ্রাম ঝাঁপুইহাটিতে একসময় রায়চৌধুরি বংশের জমিদারি দাপট ছিল বলেই স্টেশনের নাম কঁপুইহাটি থেকে গেছে।
হালদারমশাই বললেন,–আমি ঝোঁকের মাথায় অন দা স্পটে গিয়ে ঠিক করি নাই। বাইরে কোথাও শেল্টার লইয়া জমিদারবাড়িতে লক্ষ রাখলে কাম হইত। কর্নেলস্যার! যাই গিয়া।
প্রাইভেট ডিটেকটিভ উঠে দাঁড়িয়েছেন, সেইসময় টেলিফোন বাজল। কর্নেল রিসিভার তুলে সাড়া দিলেন।…হ্যাঁ। কর্নেল নীলাদ্রি সরকার বলছি।…হেমেনবাবু? এইমাত্র আপনার কথা হচ্ছিল। প্রাইভেট ডিটেকটিভ মিঃ কে. কে. হালদার যাচ্ছেন। …কী? কী?… সর্বনাশ! কখন?.. আপনি কী করে খবর পেলেন?…কে এসেছিল? একটু জোরে বলুন প্লিজ!… হ্যাঁ। আমি মর্নিংয়ে যাব। … জোরে বলুন! লাইন ডিসটার্ব করছে!… হ্যালো! হ্যালো! হ্যালো!
বুঝলুম, লাইন কেটে গেল। ট্রাংককলে এত বেশি কথা বলার সময় পাওয়া যায় না। একটা কথা। এই ঘটনা যখন ঘটেছিল, তখন মফস্বলে এস টি ডি লাইন চালু হয়নি। সে যাই হোক, রিসিভার রেখে কর্নেল গম্ভীরমুখে বললেন,–গোপীমোহনবাবুর ডেডবডি পাওয়া গেছে বিলের ধারে। একদল জেলে যথারীতি সূর্যাস্তের পর বিলে মাছ ধরতে যাচ্ছিল। তারাই দেখতে পায় গোপীমোহন হাজরা উপুড় হয়ে পড়ে আছেন। মাথার পিছনটা রক্তাক্ত। আততায়ী অতর্কিতে পিছন থেকে শক্ত কিছু দিয়ে মাথার পিছনে আঘাত করেছিল। এর পর জয়কুমারবাবুর বাড়ি থেকে কেউ বাবুগঞ্জ থানায় খবর দিতে গিয়েছিল। সে-ই হেমেন্দ্র সিংহরায়কে খবরটা জানিয়ে গেছে। এর বেশি কিছু বুঝতে পারলুম না।
