কর্নেলের এই ড্রয়িংরুমে বাইরে থেকে ঢুকতে হলে ছোটো একটা ওয়েটিং রুমের মতো ঘর পেরিয়ে আসতে হয়। কর্নেল কোনও কাজে ব্যস্ত থাকলে ষষ্ঠীকে বলে রাখেন,–কেউ এলে ও ঘরে কিছুক্ষণ বসতে বলবি। সময়মতো আমি ডেকে নেব।
ডোরবেল বাজার কিছুক্ষণ পরে ষষ্ঠীচরণ ড্রয়িংরুমে ঢুকে একগাল হেসে বলল,–কী কাণ্ড দেখুন বাবামশাই! একেবারে মাথাখারাপ যাকে বলে!
কর্নেল বললেন,–সেই ভদ্রলোক এসেছিলেন?
–আজ্ঞে। ও-ঘরে উনি–
–বেহালা রেখেছিলেন। কিন্তু যাওয়ার সময় নিয়ে যেতে ভুলে গিয়েছিলেন?
–আজ্ঞে বাবামশাই! মজার লোক। দরজা খুললুম। উনি আমার পাশ কাটিয়ে ঢুকে চেয়ার থেকে নীল কাপড়ের মোড়কে ঢাকা কী একটা তুলে নিয়ে চলে গেলেন। এখন মনে হচ্ছে, ওটা বেহালাই বটে! আশ্চর্য ব্যাপার! একটা কথাও বললেন না। আমি তো হতভম্ব! পরে মনে পড়ল, প্রথমবার আসবার সময় ওটা ওঁর হাতে দেখেছিলুম।
ষষ্ঠীচরণ হাসতে-হাসতে ভেতরে চলে গেল। আমি অবাক হয়ে বললুম,–গোপীমোহন হাজরা তা হলে ঝাঁপুইহাটি জমিদারবাড়ির সেই বেহালা-বাজিয়ে কর্মচারী?
কর্নেল বললেন,–গোপীমোহনবাবুর সিথিকরা লম্বা চুল দেখেই আমার মনে হয়েছিল, ভদ্রলোক সম্ভবত যাত্রা-থিয়েটার বা গানবাজনা করেন। গ্রাম্য বেহালা-বাজিয়েদের ওই রকম টিপিক্যাল চেহারা হয়। হেমেনবাবুর কথাটা মনে পড়ার সঙ্গে-সঙ্গে বুঝেছিলুম, গোপীমোহন হাজরাই সেই বেহালা-বাজিয়ে কর্মচারী। কিন্তু ওঁর সঙ্গে বেহালা দেখিনি বলে দ্বিধায় পড়েছিলুম।
বললুম,–কিন্তু এই ভদ্রলোক শীতের রাতে ডাকিনীতলার জলটুঙ্গিতে বেহালা বাজাতে যান। কেন?
কর্নেল হাসলেন,–হয়তো ডাকিনীতলার মাহাত্ম্য বজায় রাখতে চান। রাতবিরেতে বিলে জেলেরা মাছ ধরতে যায়। তাদের মুখে-মুখে মাহাত্ম্য রটে যায় ডাকিনীর। পুজোআচ্চা হয়। মানতের পয়সাকড়ি পড়ে।
–বুঝলুম। কিন্তু ওঁর কথাবার্তা-হাভভাবে কোনও পাগলামির লক্ষণ তো দেখলুম না। দিব্যি সুস্থ মানুষ। টনটনে জ্ঞানবুদ্ধি।
–হ্যাঁ। তবে গলায় দড়ির ফাঁস এঁটে ফেলারাম মুখুজ্জের ভূত কেন ওঁকে আংটি চাইতে আসে, এটাই অদ্ভুত। দেখা যাক, হালদারমশাই কতটা এগোতে পারেন।
–আপনি কবে ঝপুইহাটি যাবেন তাহলে?
কর্নেল একটু চুপ করে থাকার পর বললেন, তোমার কৌতূহল তীব্র হয়ে উঠেছে, তা টের পাচ্ছি। অপেক্ষা করে থাকো! সময় হলেই আমরা বেরিয়ে পড়ব।
সত্যি বলতে কী, আংটি চাইতে আসা গলায়-দড়ি ভূতটার চেয়ে জলটুঙ্গিতে ডাকিনীতলায় গোপীমোহন হাজরার রাতবিরেতে বেহালা বাজানোর ব্যাপারটা আমার কৌতূহল তীব্র করেছিল। পরদিন বিকেলে দৈনিক সত্যসেবক পত্রিকার অফিসে বসে পুলিশসূত্রে পাওয়া দুটো ডাকাতি আর তিনটে ছিনতাই কেসের খবর লিখছি, সেই সময় কর্নেলের টেলিফোন এল,–জয়ন্ত! বাড়ি ফেরার পথে আমার ডেরায় এসো!
বললুম,–ঝাঁপুইহাটিতে নতুন কিছু কি ঘটেছে?
–ফোনে কিছু বলা যাবে না। রাখছি।
তাড়াতাড়ি খবরগুলো লিখে চিফ রিপোর্টারের টেবিলে রেখে বেরিয়ে পড়লুম। তখন প্রায় সাড়ে ছটা বাজে। কাল সন্ধ্যার মতোই টিপটিপিয়ে বৃষ্টি পড়ছিল। ইলিয়ট রোডে কর্নেলের বাড়ির লনে একপাশে গাড়ি রেখে যখন তিনতলায় তার অ্যাপার্টমেন্টের ডোরবেলের সুইচ টিপলুম, তখন উত্তেজনায় আমার আঙুল কঁপছিল।
ষষ্ঠীচরণ দরজা খুলে মুচকি হেসে চাপাস্বরে বলল,–টিকটিকিবাবুর অবস্থা দেখুনগে দাদাবাবু!
সে হালদারমশাইকে আড়ালে টিকটিকিবাবু বলে। দ্রুত ড্রয়িংরুমে ঢুকে দেখলুম, হালদারমশাই মাথার মাঝখানে একটা পট্টি বেঁধে বসে আছেন। বললুম,–কী সর্বনাশ! আপনার মাথায় ব্যান্ডেজ কেন হালদারমশাই?
হালদারমশাই বিমর্ষমুখে হাসবার চেষ্টা করে বললেন,–তেমন কিছু না। কোন ব্যাটায় ঢিল ছুড়ছিল। একখান ঢিল আইয়া মাথায় পড়ল।
–কবে? কখন?
–আইজ দুপুরবেলায়। কর্নেল একটু হেসে বললেন,–ছড়ায় আছে না? ঠিক দুপ্পুর বেলা/ভূত মারে ঢেলা।
গোয়েন্দাপ্রবর বললেন,–ভূত না। মাইনষের কাম। জমিদারবাড়িতে লাঞ্চ খাইয়া বাড়ির আশপাশ দেখতে বারাইছিলাম। গ্রামের শেষদিকটায় বাড়ি। পশ্চিমদিকে ঝোঁপ-জঙ্গল। হাঁটতে-হাঁটতে কতকদূর যাইয়া দেখি ব্যাবাক জল। আমাগো পূর্ববঙ্গের মতো বিশাল বিল। একটা ঝাকড়া গাবগাছের তলায় খাড়াইয়া ছিলাম। হঠাৎ ঢিল পড়তে থাকল। রিভলভার রেডি ছিল। কইলাম, গুলি করুম। অমনি একখান ঢিল আইয়া মাথার মধ্যিখান পড়ল। এইটুখানি ছিল। কিন্তু মাথার চামড়া কাইট্যা রক্ত পড়তে থাকল। রাগে এক রাউন্ড ফায়ার করলাম। তখন ঢিল পড়া বন্ধ হইয়া গেল।
জিগ্যেস করলুম,–গাবগাছের ওপর থেকে কি ঢিল পড়ছিল?
–নাঃ! ঝোঁপের দিক থেকে ব্যাটায় ঢিল ছুড়ছিল। ফায়ার করছি সেই দিকেই। কিন্তু গুলি লাগলে ট্যার পাইতাম।
–তারপর আপনি জমিদারবাড়ি ফিরে গিয়েছিলেন?
–হঃ!
–ব্যান্ডেজ কে বেঁধে দিল?
–জয়কুমারবাবুর ফাস্টএডের বাকসো ছিল। বুড়া হইলে কী হইব? সব কামে উনি পাকা। নিজের হাতে ব্লেডে মাথার এক ইঞ্চি চুল উঁছলেন। ওষুধ দিয়া ব্যান্ডেজ করলেন। তো উনি কইলেন, বিলের ধারে ওই গাবগাছের খুব বদনাম আছে। দিনদুপুরেও পারতপক্ষে কেউ একা সেখানে যায় না।
–তাহলে ঝপুইহাটি দেখছি খুব রহস্যময় জায়গা। আনাচে-কানাচে ভূতেরা ঘুরে বেড়ায়। হালদারমশাই খিখি করে হেসে উঠলেন। তারপর বললেন,–কর্নেলস্যারের লগে পরামর্শ করা দরকার। তাই ফেরত আইলাম। আরও খান দুই মিসটিরিয়াস ঘটনা ঘটছে।
