–তাহলে আমি কী করতে পারি বলে আপনার ধারণা? গোপীমোহনবাবু চাপাগলায় বললেন,–কর্তাবাবু খুলে কিছু বলছেন না। তবে উনিই কার কাছে আপনার পরিচয় পেয়ে আমাকে চিঠি লিখতে বলেছিলেন। আজ ওঁর হুকুমেই এসেছি। ওই আংটির ব্যাপারটা নিয়ে আমারও বেজায় খটকা বেধেছে।
হালদারমশাই এক টিপ নস্যি নিয়ে বললেন,–হঃ! খটকা আমারও বাধছে। ভূত আংটি চায় ক্যান? কর্নেলস্যার! হেভি মিস্ত্রি!
.
দুই
এর পর বরাবর যা হয়ে থাকে তা-ই হল। ‘হেভি মিস্ত্রি’-র প্রবল আকর্ষণে প্রাইভেট ডিটেকটিভ কে. কে. হালদার কঁপুইহাটির গোপীমোহন হাজরার সঙ্গী হলেন। গোপীমোহনবাবুর এতে আপত্তির কারণ ছিল না! বরং রাতের ট্রেনজার্নিতে এমন একজন গোয়েন্দা সঙ্গী পেয়ে তিনি খুশিই হলেন। দু’জনের মধ্যে কথা হল, গোপীমোহনবাবু শেয়ালদা স্টেশনে একটা নির্দিষ্ট জায়গায় হালদারমশাইয়ের জন্য অপেক্ষা করবেন। হালদারমশাই তার বাড়ি থেকে তৈরি হয়ে রাত সাড়ে এগারোটার মধ্যেই পৌঁছে যাবেন।
তবে গোপীমোহনবাবু কর্নেলকেও কঁপুইহাটি যাওয়ার জন্য অনুরোধ করে গেলেন। কর্নেল তাকে আশ্বস্ত করে জানিয়ে দিলেন, তিনি আমাকে সঙ্গে নিয়ে যথাসময়ে পৌঁছুবেন।
প্রথমে গোয়েন্দাপ্রবর, তার কিছুক্ষণ পরে গোপীমোহনবাবু বেরিয়ে যাওয়ার পর কর্নেল চোখবুজে চুপচাপ চুরুট টানছিলেন। হঠাৎ চোখ খুলে সোজা হয়ে বসে বললেন,–মাই গুডনেস। ঝাঁপুইহাটির জয়কুমার রায়চৌধুরির কথা আমাকে বাবুগঞ্জের হেমেন্দ্র সিংহরায় বলেছিলেন! গত বছর শীতকালে আমি হেমেনবাবুর আমন্ত্রণে বাবুগঞ্জ গিয়েছিলুম। ওখানে গঙ্গার অববাহিকায় বিস্তীর্ণ একটা জলাভূমি আছে। সেখানে শীতের সময় অসংখ্য প্রজাতির হাঁস আর সারস আসে। একটা জলটুঙ্গির অদ্ভুত নাম! ডাকিনীতলা।
বললুম,–ডাকিনীতলা? সর্বনাশ! ডাকিনী মানেই তো ডাইনি। দেখেছিলেন নাকি?
কর্নেল হাসলেন,–ডাইনিরা নাকি কামরূপ কামাখ্যা থেকে আস্ত উড়ন্ত গাছে চেপে রাতবিরেতে নানা দেশে যায়। জায়গা পছন্দ হলে সেখানেই গাছটা মূলসুদ্ধ বসিয়ে দেয়। আর সেই গাছের ডালে বসে চুল এলিয়ে বাতাসের সুরে গান গায়। সেই গাছ সে-এলাকার লোকে চিনতে পারে না! বাবুগঞ্জের লোকেরা জলাভূমির একটা জলটুঙ্গিতে গাছটাকে চিনতে পারেনি। আমার মতে, ওটা ডাইনির স্পেসশিপ বা প্লেনও বলতে পারো! হয়তো কলকজা বিগড়ে যায় বলেই ডাইনি বেচারিকে সেখানেই ল্যান্ড করতে হয়। যাই হোক, এবার ডাইনি বেচারির দুঃখটা বুঝতে চেষ্টা করো ডার্লিং! সে আসলে নির্বাসিত। দেশে ফেরার উপায় নেই। তাই সে গান গায় না। কাঁদে। বাতাসের সুরে কাঁদে। এই হল আমার সিদ্ধান্ত।
কর্নেলের কথা শুনে হেসে আমি অস্থির। বললুম,–ঠিক বলেছেন। ডাকিনীতলার ডাইনিবেচারির কান্না আপনি তাহলে শুনেছিলেন?
–শুনেছিলুম বইকী। বিস্তীর্ণ বিলে নৌকোয় চেপে পাখিদের ছবি তুলে ফিরে আসছিলুম। সঙ্গে হেমেনবাবু। তারও আমার মতো পাখিটাখির বাতিক আছে। ডাকিনীতলার জলটুঙ্গির পাশ দিয়ে আসবার সময় কুয়াশামেশানো জ্যোৎস্নায় মনে হল, কে ফুঁপিয়ে কাঁদছে। হেমেনবাবুকে কথাটা বললুম। উনি বললেন, হ্যাঁ। এই শব্দটা কীসের, তা বোঝা যায় না। আমি বহুবার শব্দটা শুনেছি।
–সত্যি?
–নির্ভেজাল সত্যি ডার্লিং! বড়ো রহস্যময় সেই সুরেলা কান্না। নৌকোর মাঝিরা বিড়বিড় করে ‘জয় মা জয় মা’ বলতে-বলতে নৌকোর গতি বাড়িয়ে দিল।
–আশ্চর্য! আপনি ওই রহস্যটার সমাধান করে এলেন না?
কর্নেল চুরুটের একরাশ ধোঁয়া ছেড়ে মিটিমিটি হেসে বললেন,–সমাধান করেছিলুম বইকী!
–কীসের শব্দ ওটা?
–বললুম তো! নির্বাসিতা ডাইনির সুর ধরে কান্না! বেহালার সুরের মতো!
–ভ্যাট! আপনি রসিকতা করছেন।
কর্নেল হঠাৎ একটু গম্ভীর হয়ে গেলেন। বললেন,–রসিকতা নয়। ডাকিনীতলার জলটুঙ্গিটার দক্ষিণে বাবুগঞ্জ। দূরত্ব প্রায় আধ কিলোমিটার। আর ওটার পূর্বে ঝপুইহাটি। ঝাঁপুইহাটির দূরত্ব জলটুঙ্গিটা থেকে বড়োজোর তিনশো মিটার। ঝাঁপুইহাটির একটা অংশ লেজের মতো এগিয়ে এসেছে বিলের দিকে। তো হেমেনবাবুকে কথাপ্রসঙ্গে আমি সেই রহস্যময় শব্দটাকে বেহালার সুরের সঙ্গে তুলনা করেছিলুম। তখন উনি বলেছিলেন, ঝাঁপুইহাটির জমিদারবংশে বরাবর গানবাজনার চর্চা ছিল। এখন ওদের বংশে যিনি আছেন, তার নাম জয়কুমার রায়চৌধুরী। এখন আর তিনি গানবাজনার চর্চা করেন না। তবে ওঁর একজন কর্মচারীকে এখনও বহাল রেখেছেন। কারণ কর্মচারীটি চমৎকার বেহালা বাজায়। হেমেনবাবুর এইসব কথা শুনে বলেছিলুম, সেই বেহালাবাদক কর্মচারী ডাকিনীতলায় রাতবিরেতে এসে বেহালা বাজান সম্ভবত। হেমেনবাবু হেসে অস্থির হয়ে বলেছিলেন, কিছু বলা যায় না। লোকটা বড্ড খেয়ালি স্বভাবের। সবসময় সঙ্গে বেহালা নিয়ে ঘুরে বেড়ায়।
কর্নেল চুপ করলে বললুম,–তাহলে ডাকিনীতলায় শীতের রাতে সেই লোকটাই গিয়ে বেহালা বাজায়? কেন বাজায়?
কর্নেল আমার প্রশ্নের উত্তর দিলেন না। চুরুট কামড়ে ধরে চোখ বুজলেন। সুতোর মতো নীল আঁকাবাঁকা ধোঁয়া তার টাকের ওপর এলোমেলো হয়ে মিলিয়ে যেতে থাকল।
ফের বললুম,–লোকটার মাথায় তাহলে ছিট আছে!
কর্নেল একেবারে ধ্যানমগ্ন বেগতিক দেখে আমি উঠতে যাচ্ছি। ডোরবেল বাজল। অমনি কর্নেলের ধ্যানভঙ্গ হল। যথারীতি হাঁক দিলেন,–ষষ্ঠী!
