গোপীমোহনবাবু বললেন,–চিঠিতে তো সব কথা খুলে লেখা যায় না। তা ছাড়া ঝপুইহাটির সাবেক জমিদারবংশের কর্মচারী আমি। কর্তাবাবুর সঙ্গে শলাপরামর্শ করে তার কথামতো চিঠিটি লিখেছিলুম।
–আপনার কর্তাবাবুর নাম কী?
–আজ্ঞে, জয়কুমার রায়চৌধুরি। বয়স প্রায় আশি বছর হবে। কিন্তু এখনও শক্তসমর্থ মানুষ।
–আপনি কি তার বাড়িতেই থাকেন?
–আজ্ঞে হ্যাঁ। বিয়ে-টিয়ে করিনি। কর্তাবাবুর অন্নজলে বেঁচে আছি। মাইনেও যা পাই, দিব্যি চলে যায়।
–আপনার কাজটা কী?
-বাড়ির সবকিছু দেখাশোনা করা। কর্তাবাবুর জরুরি চিঠিপত্র লিখে দেওয়া। আমাকে ওঁর বাড়ির কেয়ারটেকার-কাম-প্রাইভেট সেক্রেটারিও বলতে পারেন। ওঁর জমিজমার ব্যাপারটা দেখাশুনা করে একজন। তার নাম কালীনাথ। সে এক পালোয়ান।
–কর্তাবাবুর স্ত্রী বা সন্তানাদি–
গোপীমোহনবাবু কর্নেলের কথার ওপর বললেন,–স্ত্রী বেঁচে নেই। দুই ছেলে আর এক মেয়ে। বড়ো ছেলে থাকে আমেরিকায়। ছোটো ছেলে বোম্বেতে। মেয়ের শ্বশুরবাড়ি কলকাতায়। কর্তাবাবু একা থাকেন। কখনও-সখনও ছেলেমেয়ে, জামাই আর নাতি-নাতনিরা আসে। তাদের পাড়াগাঁয়ে থাকতে ভালো লাগে না। কিন্তু কর্তাবাবু পূর্বপুরুষের ভিটে ছেড়ে এক পা নড়তে চান না। বলতে গেলে, আমরাই ওঁর ফ্যামিলির লোক। আমি, কালীনাথ, ভোলা আর তার বউ শৈল–তাছাড়া আছে রান্নার ঠাকুর নকুল মুখুজ্জে। মুখুজ্জেমশাই গৃহদেবতা রুদ্রদেবের সেবায়েত।
হালদারমশাই শুনতে-শুনতে এবার ধৈর্য হারিয়ে বলে উঠলেন,–ভূতের কথাটা আগে কইয়া ফ্যালেন মশয়! ভূত আপনার কী প্রবলেম বাধাইছে, তা-ই কন।
কর্নেল, কফিতে চুমুক দিয়ে বললেন,–গোপীমোহনবাবু ভূতটাকে ব্যাটাচ্ছেলে বলছিলেন। তার মানে সে পুরুষভূত। হা–এবার আপনি সেই ব্যাটাচ্ছেলে ভূতটার কথা বলুন!
গোপীমোহনবাবু বললেন,–ব্যাটাচ্ছেলে বলছি কি কম দুঃখে? বেঁচে থাকলে আপনি-আজ্ঞে করতুম। রাতবিরেতে আমার ঘরের জানালার ধারে এসে সে ফিসফিস করে বলে, আংটি দে! আংটি দে! কীসের আংটি, কার আংটি তা-ও তো জানি না।
–আহা, ভূতটা বেঁচে থাকতে অর্থাৎ জীবদ্দশায় কে ছিল, তাই বলুন!
–কর্তাবাবুর দূরসম্পর্কের এক ভাইপো ফেলারাম মুখুজ্জে। গতবছর এমনি বর্ষার রাত্রে কর্তাবাবু তাকে খুব বকাবকি করেছিলেন। কেন করেছিলেন তা জানি না। কর্তাবাবু এমন রাশভারী মানুষ! বেশি প্রশ্ন করলে খুব চটে যান। তো সেই রাত্রে কখন ফোরাম মুখুজ্জে বাড়ির পিছনে বটগাছের ডালে গলায় দড়ি বেঁধে আত্মহত্যা করেছিলেন। ভোরবেলা শৈল ব্যাপারটা দেখে চ্যাঁচামেচি করেছিল। ওঃ! সে এক বীভৎস দৃশ্য!
–ফেলারামবাবুর ভূত প্রথম কবে আপনার জানালায় এসে উঁকি মেরেছিল?
–গতমাসে। তারিখ মনে নেই। খেয়েদেয়ে এসে শুতে যাচ্ছি, হঠাৎ লোডশেডিং! বিদ্যুৎ থাকলেও যে পাখার হাওয়ায় সুখে ঘুমুব, তার জো নেই। তবে পাখা ঘুরছে দেখলেও মনের শান্তি। তো প্রচণ্ড গরম। তাই ভাবলুম, বারান্দায় মাদুর পেতে শোব। মাদুর নিয়ে বেরুতে যাচ্ছি, হঠাৎ উত্তরের জানালার ওদিকে কে ফিসফিস করে বলে উঠল, আংটি দে! আংটি দে! আংটি দে! আমরা পাড়াগাঁয়ের মানুষ। বিদ্যুৎ না হয় ক’বছর আগে এসেছে। আগে তো অন্ধকারে দিব্যি দেখতে পেতুম।
অধীর হয়ে গোন্দোপ্রবর বললেন,–ফেলারামকে জানালার ধারে দেখলেন?
–আজ্ঞে হ্যাঁ।
–অন্ধকারে?
–ওই যে বললুম পাড়াগাঁয়ের মানুষ। অন্ধকারে স্পষ্ট দেখলুম সেই ফেলারাম মুখুজ্জেই বটে! গলায় দড়ির ফাঁস আটকানো আছে।
–তখন আপনি কী করলেন?
–তখন তো আমি প্রচণ্ড ভয় পেয়ে গেছি। ভয়ে দিশেহারা হয়ে চিৎকার করে কালীনাথকে ডাকলুম। সে সাহসী। গায়ের জোরও আছে। সে দৌড়ে এসে আমার কথা শুনেই লাঠি আর টর্চ নিয়ে বাড়ির পিছনে চলে গেল। কাকেও দেখতে পেল না। সে হেসে ব্যাপারটা উড়িয়ে দিল। তার কয়েকদিন পরে রাত্রিবেলা আবার জানালার ধারে ফেলারাম! গলায় দড়ির ফাঁস আটকানো। আর ফিসফিস করে সেই একই কথা : আংটি দে! আংটি দে! আংটি দে!
কর্নেল বললেন, আপনার কর্তাবাবুর এ ব্যাপারে কী বক্তব্য?
গোপীমোহনবাবু গম্ভীরমুখে বললেন,–প্রথম-প্রথম উনি আমার কথা গ্রাহ্য করেননি। একদিন উনি নিচের তলায় লাইব্রেরিঘরে বসে বই পড়ছেন। তখন রাত্রি প্রায় এগারোটা। উনি রোজ রাত্রে লাইব্রেরিতে এসে অনেক রাত্রি পর্যন্ত বই পড়ে তারপর দোতালায় শুতে যান। উনি যতক্ষণ লাইব্রেরিতে থাকেন, ততক্ষণ কালীনাথ বারান্দায় দরজার কাছে বসে থাকে। তো হঠাৎ কর্তাবাবু শুনতে পেলেন, জানালার ওধারে কে দাঁড়িয়ে ফিসফিস করে বলছে–আংটি দে! আংটি দে! আংটি দে! কর্তাবাবু তাকিয়ে দেখেন গলায় দড়ির ফাঁস আটকানো সেই ফেলারাম মুখুজ্জে! কর্তাবাবু রাগী মানুষ। কালীনাথকে ডেকে বললেন, ধর তো ফেলারামকে! হতভাগা মরে গিয়েও জ্বালাচ্ছে! কালীনাথ খুঁজে হন্যে হয়ে ফিরে এসেছিল।
–তাহলে আপনি আর আপনার কর্তাবাবু ছাড়া আর কেউ ফেলারাম মুখুজ্জের ভূতকে দেখতে পায়নি?
–আজ্ঞে না। কিন্তু ক্রমে-ক্রমে ব্যাটাচ্ছেলের সাহস বেড়ে গেছে। গত সপ্তাহে তিনরাত্রে তিনবার সে দেখা দিয়েছে। আংটি চেয়েছে। বুদ্ধি করে টর্চ রেখেছিলুম। টর্চ জ্বাললে কিন্তু তাকে দেখতে পাইনে। টর্চ যেই নিভিয়ে দিই, অমনি সে আংটি চায়। এর মাথামুণ্ডু কিছু বুঝতে পারছিনে। বলবেন, ওঝা ডাকিনি কেন? ডেকেছিলুম। নকুল মুখুজ্জেমশাই ধার্মিক মানুষ। শান্তিস্বস্ত্যয়ন যাগযজ্ঞ সব করেছেন। এমনকী কদিন আগে গয়ায় গিয়ে ফেলারামের পিণ্ডিও দিয়ে এসেছেন। কিন্তু আশ্চর্য ব্যাপার! ব্যাটাচ্ছেলে এখনও জ্বালাচ্ছে রাত-বিরেতে। গতরাত্রেও একই কাণ্ড। অগত্যা আপনার কাছে ছুটে আসতেই হল।
