ওঁরা বেরিয়ে যাওয়ার পর হালদারমশাই বাঁকা হেসে চাপা স্বরে বললেন,–অ্যাডভোকেট ভদ্রলোক ঠিক কইছেন। হ্যালুসিনেশন! চোখের ভুল। চৌতিরিশ বৎসর পুলিশলাইফে রাত্রে ঘুরছি। কিছু দেখি নাই।
এতক্ষণে ষষ্ঠীচরণ এক ভদ্রলোককে নিয়ে এল। বুঝলুম, তিন-তিনজন প্রকাণ্ড মানুষের ফাঁক গলিয়ে ষষ্ঠীচরণ এঁকে আনতে অসুবিধেয় পড়েছিল।
ভদ্রলোকের বয়স পঞ্চাশের বেশি বলেই মনে হল। পাতাচাপা ঘাসের মতো ফ্যাকাসে গায়ের রঙ। মাথায় কঁচাপাকা সিথিকরা লম্বা ঘাড় ছুঁইছুই চুল। খাড়া নাক। বসা চোয়াল চোখদুটি টানাটানা। গোঁফদাড়ি পরিষ্কার করে কামানো। পরনে ছাইরঙা খদ্দরের পাঞ্জাবি আর অগোছাল ধুতি। তার কাঁধে একটা কাপড়ের নকশাদার ব্যাগ। বাঁ-হাতের আঙুলে একটা পলাবসানো সোনার আংটি। তিনি করজোড়ে কর্নেলকে নমস্কার করে বললেন,–বসতে পারি?
কর্নেল তাকে লক্ষ করছিলেন। বললেন,–অবশ্যই।
ভদ্রলোক সোফায় বিনীতভাবে বসে বললেন, আমার নাম গোপীমোহন হাজরা। আমি আপনাকে একটা চিঠি লিখেছিলুম। পেয়েছেন কি না জানি না। তবে ওই যে একটা কথা আছে, গরজ বড়ো বালাই!
আপনার চিঠি আমি পেয়েছি।-বলে কর্নেল আবার হাঁক দিলেন : কফি!
অমন একটা জমজমাট আড্ডা ভেঙে দিতেই যেন এই লোকটির আবির্ভাব! আমার একটু খারাপ লাগছিল। হালদারমশাইয়ের দিকে তাকালুম। তিনি যেন আমার মনের কথা টের পেয়ে কেমন চোখে ভদ্রলোককে দেখে নিলেন এবং নস্যির কৌটো বের করে নস্যি নিলেন।
গোপীমোহনবাবু আমাদের দেখে নিয়ে বললেন,–কথাবার্তা একেবারে প্রাইভেট কর্নেলসায়েব।
কর্নেল একটু হেসে বললেন,–আলাপ করিয়ে দিই! উনি বিখ্যাত প্রাইভেট ডিটেকটিভ এবং প্রাক্তন পুলিশ অফিসার মিঃ কে. কে. হালদার। আর এর নাম জয়ন্ত চৌধুরি। দৈনিক সত্যসেবক পত্রিকার সাংবাদিক। দুজনই আমার ঘনিষ্ঠ সহযোগী। আমার কোনও কথা এই দুজনের কাছে গোপন থাকে না। তার চেয়ে বড়ো কথা, আপনার নিজের মুখে আপনার সমস্যার কথা এঁরা শুনলে আমার এবং আপনার দুজনকারই সুবিধে হবে। আপনি তিন-তিনটি মস্তিষ্কের সাহায্য পাবেন। তাই না?
গোপীমোহনবাবু হাসবার চেষ্টা করে বললেন, আপনার যা অভিরুচি কর্নেলসায়েব! তবে ওই যে কথাটা বললুম। গরজ বড়ো বালাই! গ্রাম্য কথা। কিন্তু কথাটা কত খাঁটি তা হাড়ে-হাড়ে টের পাচ্ছি। তাই আপনার উত্তরের অপেক্ষায় বসে না থেকে এই বৃষ্টিবাদলার মধ্যে বেরিয়ে পড়েছি। বিপদের ওপর বিপদ। ট্রেন লেট করার জন্য সন্ধ্যা সাতটায় শেয়ালদা স্টেশনে পৌঁছেছি। তিন ঘণ্টা লেট! ফেরার ট্রেন রাত বারোটা পঁচিশে। আর লেট না করলে পাক্কা তিন ঘণ্টার জার্নি! কী সাংঘাতিক রিস্ক নিয়ে এসেছি বুঝুন!
-বুঝলুম। ফেরার ট্রেন লেট না করলে আপনি রাত তিনটে পঁচিশে বা সাড়ে তিনটে নাগাদ স্টেশনে নামবেন। তারপর ভোরবেলা পর্যন্ত আপনাকে স্টেশনেই বসে থাকতে হবে। সম্ভবত ছোটো স্টেশন। শেষ রাত্রে নিঝুম খাঁ-খাঁ অবস্থা। আপনি প্রতি মুহূর্তে আশঙ্কা করবেন, এই বুঝি সেই ভয়ঙ্কর প্রেতাত্মা এসে আপনার সামনে দাঁড়াল!
হালদারমশাই কান খাড়া করে শুনছিলেন। কর্নেলের কথা শেষ হতেই বলে উঠলেন,–কী কইলেন? কী কইলেন?
কর্নেল গম্ভীর মুখে বললেন,–প্রেতাত্মা। চলতি কথায় ভূত।
হাসতে-হাসতে বললুম,–আবার সেই ভূত?
গোপীমোহনবাবু আমার প্রতি যেন ক্ষুব্ধ হলেন। তিনি আমার দিকে তাকিয়ে বললেন, –আপনারা কলকাতার মানুষ। আমাদের মতো গ্রামের মানুষদের সমস্যার কথা বুঝবেন না।
এবার গম্ভীর হয়ে বললুম,–সমস্যাটা খুলে বললে নিশ্চয়ই বুঝব। দরকার মনে করলে খবরের কাগজেও লিখব। তবে সমস্যাটা ভূতপ্রেতসংক্রান্ত হলে অন্য কথা।
গোপীমোহনবাবু তেমনই ক্ষুব্ধ ভঙ্গিতে বললেন, আপনারা কলকাতায় সারাক্ষণ ভিড়ের মধ্যে থাকেন। চব্বিশ ঘণ্টা বিদ্যুৎ পান। রাতবিরেতে আলো জ্বলে। পাখা ঘোরে। কিন্তু গ্রামের অবস্থা এর উলটো।
–কেন, আজকাল গ্রামেও তো বিদ্যুৎ গেছে। এই তো সেদিন বিদ্যুৎ দফতরের কর্তারা সাংবাদিকদের জানালেন, বিদ্যুৎ এত উদ্বৃত্ত যে
থামুন স্যার!–গোপীমোহনবাবু চটে গেলেন : বিদ্যুৎ উদ্বৃত্ত হলে গ্রামাঞ্চলে বিদ্যুতের অমন অবস্থা কেন? পাখা ঘোরে, হাওয়া পাই না। পাঁচশো পাওয়ারের বালব জ্বালালেও আলো থাকে না। হ্যারিকেন জ্বালতে হয়। তার ওপর বিদ্যুতের ভূতুড়ে লুকোচুরি খেলা। এই একটুখানি ঝিলিক দিয়েই চলে গেল তো গেল। ব্যস! আর দেখা নেই। সত্যিকার ভূতের উপদ্রবের চেয়ে গ্রামের বিদ্যুৎ আরও সাংঘাতিক ভূতুড়ে। এ সব লিখবেন কাগজে? পারবেন না। লিখবেন না। কারণ এ সব কথা লিখলে কাগজে বছরে লাখ-লাখ টাকার বিজ্ঞাপন বন্ধ হয়ে যাবে।
কর্নেল চোখ বুজে ইজিচেয়ারে হেলান দিয়ে বসে সাদা দাড়িতে হাত বুলোচ্ছিলেন। এই সময় ষষ্ঠীচরণ কফি নিয়ে এল। কর্নেল চোখ খুলে সোজা হয়ে বসে বললেন,–কফি খান গোপীমোহনবাবু!
গোপীমোহন হাজরা কফির কাপ তুলে নিয়ে চুমুক দিলেন। তারপর বললেন,–আসলে আমার সমস্যার সঙ্গে আমাদের কঁপুইহাটির বিদ্যুতের সমস্যাও জড়িয়ে গেছে। রাতবিরেতে উজ্জ্বল আলো থাকলে ব্যাটাচ্ছেলের কখনও আমার ঘরের জানালায় উঁকি মারার সাধ্য ছিল না।
কর্নেল বললেন, আপনার চিঠিতে ভূতের উপদ্রবের কথা ছিল। কিন্তু আমি তো ভূতের ওঝা নই। তাই উত্তর দেব কি না ঠিক করতে পারিনি। যাই হোক, আপনি নিজে এসে গেছেন যখন, তখন ব্যাপারটা একটু খুলে বলুন। শোনা যাক। তারপর দেখব কী করতে পারি।
