কর্নেলকে মুখ খোলার সুযোগ দিলেন না হাইকোর্টের অ্যাডভোকেট মহেন্দ্র ঘোষদস্তিদার। তিনি বললেন,–বইয়ে পড়েছিলুম, ব্রাজিলে আমাজন নদীর অববাহিকায় দুর্গম জঙ্গলে রক্তচোষা বাদুড় আছে। তাদের পাল্লায় পড়লে রক্ষা নেই। মানুষের ওপর ঝাঁপিয়ে পড়ে রক্ত চুষতে-চুষতে–
ডাক্তার তারক চক্রবর্তী তার কথার ওপর কথা চাপিয়ে দিলেন,–ভ্যাম্পায়ার! বুঝলেন? ওদের বলা হয় ভ্যাম্পায়ার। সেই সূত্রেই তো ইউরোপে ড্রাকুলার গল্প লিখেছিলেন–কে যেন?
ব্রাম স্ট্রোকার।–মিঃ হাটি বলে উঠলেন। তবে আমাদের দেশেও রক্তচোষা ডাইনিদের গল্প আছে। আমি মালদায় থাকার সময় আদিবাসীরা একজন বৃদ্ধাকে ডাইনি বলে মেরে ফেলেছিল। পুলিশ দশজনের বিরুদ্ধে চার্জশিট দিয়েছিল। সাক্ষ্য-প্রমাণের গণ্ডগোলে ন’জনকে খালাস দিয়েছিলুম। একজনকে ফাঁসি।
ডাঃ চক্রবর্তী চমকে উঠে বললেন,–ফাঁসি? তারপর? তারপর?
–তারপর আর কী? হাইকোর্ট আমার রায়ে সম্মতি দিয়েছিল। লোকটার ফাঁসি হয়েছিল।
মিঃ ঘোষদস্তিদার হাসতে-হাসতে বললেন,–মিঃ হাটি! আপনি যা-ই বলুন, এ কেসে গণ্ডগোল আছে। আমি আসামীর পক্ষে দাঁড়ালে বেচারা মারা পড়ত না। চার্জশিটে দশজনের যদি নাম থাকে, তাহলে
মিঃ হাটি কী বলতে যাচ্ছিলেন, তাকে বাধা দিয়ে ডাঃ চক্রবর্তী সকৌতুকে বললেন,–ফাঁসিতে মৃত্যুও তো অপঘাতে মৃত্যু। আর অপঘাতে মৃত্যু হলে মানুষ প্রেত হয়ে যায়। ভূতও বলতে পারেন। সেই লোকটা ভূতপ্রেত হয়ে আপনাকে জ্বালাতন করেনি তো?
মিঃ হাটি গম্ভীরমুখে বললেন,–ভূতপ্রেতে আমার কস্মিনকালে বিশ্বাস ছিল না। কিন্তু আশ্চর্য ব্যাপার! আমার জজিয়তি-জীবনে ওই একবারই একজনের প্রাণদণ্ড দিয়েছিলুম। বাকি জীবনে যেখানেই গিয়েছি, সেখানেই একটা অদ্ভুত ঘটনা বারবার ঘটেছে। নাঃ, স্বপ্ন নয়! প্রত্যক্ষ ঘটনা। রাতবিরেতে জানালার ওধারে-ওঃ! এখনও গায়ে কাঁটা দিচ্ছে।
তার চাপা গম্ভীর কণ্ঠস্বরে এতক্ষণে আড্ডায় কেমন একটা গা-ছমছম করা আবেশ সঞ্চারিত হল। প্রাইভেট ডিটেকটিভ কে. কে. হালদার অর্থাৎ আমাদের প্রিয় হালদারমশাই সম্ভবত রহস্যের গন্ধ পেয়ে গুলিগুলি চোখে তাকিয়ে ছিলেন। তিনি বললেন,–কী দেখছিলেন স্যার?
একটা লোক। সেই ফাঁসির আসামীর মতো চেহারা। বেঁটে। কালো কুচকুচে গায়ের রং। এক মাথা ঝাকড়া কোঁকড়ানো চুল।মিঃ হাটি শ্বাস ছেড়ে বললেন : ফাঁসির হুকুম শুনে লোকটা যে দৃষ্টিতে আমার দিকে তাকিয়েছিল, সেইরকম দৃষ্টি। আদিম হিংস্র দুটি চোখ! শুতে যাওয়ার সময় কোনও-কোনও রাত্রে ইচ্ছে করেই ভোলা জানালার বাইরে তাকাতুম! অমনই তাকে দেখতে পেতুম। তার চেয়ে সাংঘাতিক দৃশ্য, তার গলায় মোম দেওয়া সেই দড়ির ফঁস! একদিন তো আমি আমার লাইসেন্সড পিস্তল থেকে গুলি ছুঁড়েছিলুম। হইচই পড়ে গিয়েছিল। আমার আর্দালি রহিম বশ টর্চের আলোয় কোয়ার্টারের চৌহদ্দি তন্নতন্ন করে খুঁজেছিল। কাকেও দেখতে পায়নি। তারপর বদলি হয়ে গেলুম কৃষ্ণনগর। সেখানেও কোনও-কোনও রাত্রে একই দৃশ্য!
হালদারমশাই বললেন, এখনও কি আপনি তারে দেখতে পান?
গোয়েন্দাপ্রবরকে নিরাশ করে মিঃ হাটি বললেন,–নাঃ! রিটায়ার করার পর আর তাকে দেখতে পাইনি।
মিঃ ঘোষদস্তিদার বললেন, হ্যালুসিনেশন! বলছিলুম না আপনার ওই কেসে গণ্ডগোল ছিল। আপনার অবচেতন মন নিশ্চয় ফাঁসির হুকুমের ব্যাপারে দ্বিধাগ্রস্ত ছিল। তাই
ডাঃ চক্রবর্তী তাকে বাধা দিয়ে বললেন,–ভূতপ্রেত নিয়ে যতই জোক করি না কেন, ভূতপ্রেত আছে। বছর চল্লিশ আগের কথা। তখন আমি ডাক্তারি পড়ছি। লাশকাটা ঘরে মড়া কাটাকুটি করে অঙ্গপ্রত্যঙ্গ, অস্থি ইত্যাদি বিষয়ে হাতেকলমে শিখতে হচ্ছে। একদিন দুপুরবেলায় পথদুর্ঘটনায় মৃত একটা লোকের টাটকা লাশ মর্গে এসেছে। সেই আমলের বিখ্যাত অ্যানাটমি বিশেষজ্ঞ ডাক্তার, আমি তার ছাত্রপ্রোফেসর চার্লস গ্রোভার পুলিশের অনুরোধে দ্রুত শবব্যবচ্ছেদের দায়িত্ব নিলেন। আমি তার প্রিয় ছাত্র। তাই আমাকে সঙ্গে নিয়ে গেলেন। আসলে এক বড়লোকের লাশ। তো ডাঃ গ্রোভার নিজে ব্যবচ্ছেদ করছেন এবং তাঁর নির্দেশমতো আমিও ছুরি চালাচ্ছি। বললে বিশ্বাস করবেন না, হঠাৎ লাশের মুখে হাসি ফুটে উঠল। নিঃশব্দ হাসি। কিন্তু সে কী বীভৎস হাসি, তা বলে বোঝাতে পারব না। ডাঃ গ্রোভারের মতো মানুষও স্তম্ভিত হয়ে বুকে ক্রস আঁকলেন। তারপর লাশের মুখটা অন্যপাশে কাত করে দিলেন। কী সর্বনাশ! আবার মুখটা চিত হল। আবার সেই হাসি! নিঃশব্দে ভয়ঙ্কর হাসি। আর চোখদুটো–ওঃ!
অ্যাডভোকেট মিঃ ঘোষদস্তিদার বলে উঠলেন,–হ্যালুসিনেশন! হ্যালুসিনেশন!
সেই সময় তোরবেল বেজে উঠল। কর্নেল যথারীতি হাঁক দিলেন,–ষষ্ঠী!
এদিকে যেন ডোরবেলের শব্দেই জমাটি আড্ডা নিমেষে ভণ্ডুল। ডাঃ চক্রবর্তী উঠে দাঁড়িয়ে বললেন,–ওঠা যাক। বৃষ্টিটা বেড়ে গেলে সমস্যা হবে। চেম্বারে এতক্ষণ রুগিরা এসে ভিড় করেছে।
মিঃ ঘোষদস্তিদার ঘড়ি দেখে বললেন,–এই রে! পৌনে আটটা বাজে। সাড়ে সাতটায় একজন বড়ো মক্কেল আসবার কথা ছিল। কর্নেলসায়েব! চলি। কথায়-কথায় দেরি করে ফেলেছি!
মিঃ হাটিও উঠে দাঁড়ালেন। বললেন,–আমার মিসেস চটে যাবেন। আটটায় তাকে সঙ্গে নিয়ে একখানে যাওয়ার কথা। চলি কর্নেলসায়েব!
