আমি পিছিয়ে গিয়ে প্রাণের দায়ে চেঁচিয়ে উঠলুম, মিঃ পাণ্ডে। মিঃ পাণ্ডে।
জন্তুটা থমকে দাঁড়িয়ে গেল। তারপর দেখলুম, কর্নেল পাথর থেকে লাফ দিয়ে নেমে জন্তুটার ওপর ঝাঁপিয়ে পড়ে তাকে ধরাশায়ী করলেন। ততক্ষণে রমেশ পাণ্ডে এবং একদল সশস্ত্র পুলিশ ঝোঁপের আড়াল থেকে বেরিয়ে এসেছেন। কর্নেলের বিশাল শরীরের তলায় পড়ে জন্তুটা হাত-পা ছুড়ছিল। কর্নেল ডাকলেন, মিঃ পাণ্ডে। চলে আসুন এখানে। ব্যাঙবাবুকে কিচনির খোলস ছাড়িয়ে বের করুন এবার।
পাণ্ডের আদেশে কনস্টেবলরা গিয়ে জন্তুটাকে মাটিতে ঠেসে ধরল। কর্নেল বললেন, আর কী ব্যাঙবাবু। এবার খোলস ছেড়ে দেখা দিন। কালো রেক্সিনে ফোম ভরে সেলাই করে খাসা কিচনির খোলস তৈরি করেছেন।
এবার মানুষের গলায় কিচনিটা কেঁদে উঠল, বেরুচ্ছি সার। আমাকে একটু উঠে বসতে দিন।
কনস্টেবলরা হাসতে-হাসতে তাকে টেনে ওঠাল। পিঠের দিকে চেন টেনে কর্নেল খোলস থেকে একটা লোককে বের করলেন। তারপর অবাক হয়ে বললেন, এ কী! এ তো ব্যাঙবাবু নয়।
আমি অবাক। লোকটা রোগা। মালকোচা করে ধুতি পরা। গায়ে একটা নোংরা গেঞ্জি। সে হাউমাউ করে কেঁদে বলল, বাবু আমাকে এই পোশাক পরিয়ে আপনাদের ভয় দেখাতে বলে রাতেই চলে গেছেন সার। আমি জানতুম না কিছু।
পাণ্ডে তার পেটে বেটনের পুঁতো মেরে বললেন, তুই কে?
আজ্ঞে হুজুর, আমার নাম কেষ্টচরণ। আমি বাবুর বাড়িতে কাজ করি।
তোর বাবুর নাম কী?
আজ্ঞে, কমলবাবু। আগে ডাক্তারি করতেন। তিনিই।
পাণ্ডে বললেন, সব চেষ্টা ব্যর্থ হল। এই ব্যাটা! তোর বাবু কোথায় গেছে?
কাল সন্ধ্যাবেলা মগললালকে দিয়ে বাবু খবর পাঠিয়েছিলেন আমাকে। আমি তাই এসেছিলুম হুজুর। বাবু বলে গেছেন, বাড়ি যাচ্ছেন। সন্ধ্যার পর আসবেন। দিনে কেউ এলে যেন ভয় দেখাই।
কর্নেল বললেন, মিঃ পাণ্ডে। এই কেষ্টচরণকে নিয়ে আপনি এখনই কমলবাবুর বাড়ি সার্চ করুন। একজন অফিসার আর জনা দুই কনস্টেবল আমার সঙ্গে পাঠিয়ে দিন। ব্যাঙবাবুর ডেরা আমি দেখতে পেয়েছি। সেখানে গিয়ে দেখা দরকার, ওটা চোরাই বিগ্রহ লুকিয়ে রাখার ঘাঁটি কিনা।
কেষ্টচরণ হাউমাউ করে আরও কী বলার চেষ্টা করছিল। বলার সুযোগ দিলেন না পাণ্ডে। দ্রুত চলে গেলেন।
একটু পরে একজন পুলিশ অফিসার এবং দুজন সশস্ত্র কনস্টেবল এল। কর্নেল তাদের নিয়ে এগিয়ে চললেন। আমি পেছনে হাঁটছিলাম। হঠাৎ গুলির শব্দ হল এবং একজন কনস্টেবল আর্তনাদ করে পড়ে গেল। দেখলুম, তার কাঁধে রক্ত ঝরছে।
পুলিশ অফিসার তখনই হুইসেল বাজালেন এবং অর্ডার দিলেন, ফায়ার।
সকালের গড়ের জঙ্গল বারুদের কটু গন্ধ আর পাখিদের আর্ত চিৎকারে ভরে গেল। এতক্ষণে দেখলুম, একটু উঁচুতে একটা গুহার মতো ফোকর লক্ষ করে ঝুঁকে-ঝকে গুলি ছুঁড়ছে পুলিশ। সেই ফোকর থেকে আধখানা ঝুলে আছে একজন মানুষের রক্তাক্ত দেহ।
কর্নেল চিৎকার করে বললেন, স্টপ। স্টপ ইট। মগনলাল ইজ ডেড। তাহলে মগনলালকে ডেরায় পাহারায় রেখেই ব্যাঙবাবু বাড়ি গিয়েছিলেন। সেই ডেরায় পৌঁছে দেখি, ওটা একটা টিকে থাকা পাথরের ঘর। শেষদিকে একটা ঘুলঘুলি আছে। মগললালের মৃতদেহ পুলিশ টেনে নিচে নামাল। তার বন্দুকটা নিচে পড়ে গিয়েছিল।
ঘরটার ভেতর একটা কাঠের বাক্সে কয়েকটা বিগ্রহ পাওয়া গেল। একপাশে একটা খাঁটিয়ায় বিছানা পাতা এবং মশারি খাটানো আছে। কুঁজো ভর্তি জল, গ্লাস এবং একটা টিফিন কেরিয়ার দেখতে পেলুন। কর্নেল কাঠের বাক্স থেকে বিগ্রহগুলো দেখতে-দেখতে তলা থেকে একটা কালো রঙের রিভলভার এবং একটা বুলেটের বাক্স তুলে নিলেন। পুলিশ অফিসারটি বললেন, আরে, ব্যাঙবাবুকা ফায়ার আর্মস?
কর্নেল বললেন, ইয়ে হ্যায় মার্ডার উইপন। পাগল মন্টুবাবুকো মার ডালা ব্যাঙবাবু। কিছুক্ষণ পরে আমরা গড়ের জঙ্গল থেকে বেরিয়ে গেলুম। পুলিশবাহিনীর একটা অংশ সেখানে থেকে গেল আহত কনস্টেবলকে তার সহকর্মীরা ততক্ষণে নিয়ে গেছে পুলিশ ভ্যানের কাছে। পাণ্ডের আয়োজন এতক্ষণে চোখে পড়ল। গড়ের জঙ্গলের চারদিক থেকে দলে-দলে পুলিশ মার্চ করে চলেছে সিংহগড়ের দিকে।…
বাংলোয় ফিরে ব্রেকফাস্ট করার পর কর্নেল চুরুট ধরিয়েছেন, এমনসময় রামপ্রসাদ এসে জানাল, কর্নিলসাবকা ফোন। শুনেই কর্নেল বেরিয়ে গেলেন। মিনিট পনেরো পরে উনি ফিরে এসে হাসিমুখে বললেন, ব্যাঙবাবু ধরা পড়েছে। মাথায় পরচুলা, মুখে নকল গোঁফ দাড়ি, পরনে গেরুয়া লুঙ্গি-পাঞ্জাবি পরে সাইকেল রিকশাতে সবে উঠে বসেছে, রমেশ পাণ্ডে গিয়ে হাজির। চল, এবার সিংহবাড়ি যাওয়া যাক। ঝন্টুবাবু এবং তার দিদিকে খবরটা দিলে ওঁরা মনে একটু শান্তি পাবেন। হ্যাঁ, আর একটা কথা। বনবিহারী কবুল করেছে, বিগ্রহ কেনার জন্য সে মাধববাবুর বাবাকে পাঁচ হাজার টাকা দিয়েছিল। কিন্তু ব্যাঙবাবু তাকে ঠকিয়েছেন। সে রাগে ফুঁসছে। কিন্তু কিছু করার নেই তার।…
৩.১১ রাজা সলোমনের আংটি
এক
জুলাই মাসের সেই সন্ধ্যাবেলায় টিপটিপ করে বৃষ্টি পড়ছিল। কর্নেলের ড্রয়িংরুমে পাঁপরভাজা আর কফি খেতে-খেতে আড্ডাটা দারুণ জমে উঠেছিল।
তবে আড্ডার যা নিয়ম। এক কথা থেকে অন্য কথা, তা থেকে আরেক কথা–এইভাবেই চলে। এটুকু মনে পড়ছে, দাড়ি রাখার সুবিধে-অসুবিধে নিয়ে কথা শুরু হয়েছিল। রিটায়ার্ড জজসায়েব অনঙ্গমোহন হাটিই কর্নেলের দাড়ি নিয়ে কথাটা তুলেছিলেন। তারপর সেই আলোচনা এক মুখ থেকে অন্যমুখে ঘুরতে ঘুরতে কেনই বা বাদুড়ে এসে পৌঁছুল বুঝতে পারলুম না। মিঃ হাটিকে বলতে শুনলুম,–বহরমপুরে যখন আমি সেশান জাজ ছিলুম, তখন কোর্টরুমের জানালা দিয়ে দেখতে পেতুম, একটা প্রকাণ্ড গাছে অসংখ্য বাদুড় ঝুলে আছে। আচ্ছা কর্নেলসায়েব! আপনি তো বিজ্ঞ মানুষ। বাদুড় কেন উলটো হয়ে ঝুলে থাকে বলুন তো?
