কর্নেল তাকে বিদায় দিতে গিয়ে বললেন, আর একটা কথা মিঃ পাণ্ডে। এস. পি. সায়েবকে বলবেন, কাল পাটনার আর্কিওলজিক্যাল সার্ভের অধিকর্তাকে বলে শিগগির একটা টিম পাঠানোর ব্যবস্থা যেন করেন।
কেন বলুন তো?
ধ্বংসস্তূপে চাপাপড়া প্রাচীন একটি বিগ্রহ তারা উদ্ধার করে জাদুঘরে রাখবেন।
পাণ্ডে অবাক হয়ে বললেন, বিগ্রহের খোঁজ তাহলে আপনি পেয়েছেন।
হ্যাঁ পেয়েছি। কিন্তু আগে ব্যাঙবাবুকে পাকড়াও করার পর বিগ্রহ উদ্ধারের কাজ শুরু হবে। দেরি করা চলবে না।
রমেশ পাণ্ডে দ্রুত বেরিয়ে গেলেন। কর্নেল দরজা বন্ধ করে এসে বসলেন। বললুম, বিগ্রহের খোঁজ কী করে পেলেন আপনি?
কর্নেল চাপা গলায় সুর ধরে আওড়ালেন–
পঞ্চভূতে ভূত নাই
মুখে ঈশ ভজ ভাই
তালব্য শ পালিয়ে গেলে
যোগফলে অঙ্ক মেলে
হর হর বোমভোলা
খাও ভাই গুড়ছোলা…
বললুম, হেঁয়ালি না করে খুলে বলুন না কর্নেল।
কর্নেল বললেন, আপাতদৃষ্টে উদ্ভট মনে হলেও খুব সোজা একটা ছড়া। এতে একটা গোপন তথ্য লুকানো আছে। তাই ঝন্টুবাবুর ঠাকুরমা দুই ভাইকে ছোটবেলায় এটা শিখিয়ে দিয়েছিলেন। বড় হয়ে ছড়া থেকে তথ্য বের করে তার পৌত্রেরা যদি বংশের প্রাচীন বিগ্রহ উদ্ধার করতে পারে, তাই তিনি এই ছড়া বানিয়েছিলেন।
.
বলে কর্নেল পকেট থেকে তার খুদে নোট বই বের করে ডট পেনে লিখতে শুরু করলেন। প্রথম লাইনে বলা পঞ্চভূতে ভূত নাই। তার মানে ভূত বাদ দিলে রইল ‘পঞ্চ’। এবার, মুখে ঈশ তালব্য শ গেলে রইল ‘ঈ’। পরের লাইন যোগফলে অঙ্ক মেলে। তার মানে মুখের সঙ্গে ঈ যোগ করলে দাঁড়ায় ‘মুখী’। এবার দাঁড়াল ‘পঞ্চমুখী। হর হর ব্যোমভোলা বলতে ‘শিব’।’পঞ্চমুখী শিব। গুড় আর ছোলা তার প্রসাদ। শিবের পঞ্চমুখী বিগ্রহ বহু জায়গায় আছে। পঞ্চমুখী শিব ছিলেন সিংহ রাজাদের আসল গৃহদেবতা। তার মন্দিরের ছাদও ছিল পঞ্চমুখী। আমরা যে পাথরটা গড়ের জঙ্গলে দেখছি, তা সেই মন্দিরের ছাদ। তার তলায় বিগ্রহ চাপা পড়ে গিয়েছিল। ঝন্টুবাবুর ঠাকুরদার সেই জনবল বা অর্থবল ছিল না যে তিনি খোঁড়াখুঁড়ি করে বিগ্রহ উদ্ধার করেন। কারণ, শুধু খুঁড়লে তো চলবে না। ওই পাঁচকোনা পাথরের ছাদটা সরাতে হবে। ক্রেনের সাহায্য ছাড়া সেটা সম্ভবই নয়। তবে হ্যাঁ, সুড়ঙ্গ খুঁড়েও বিগ্রহ উদ্ধার করা সম্ভব ছিল। কিন্তু সঠিক স্থান না জানলে সুড়ঙ্গ খুঁড়ে লাভ নেই। তাছাড়া ওপরে ভারী পাথর। সুড়ঙ্গ ধ্বসে পড়ারও ঝুঁকি ছিল।
বললুম, আমার ধারণা মন্টুবাবু হয়তো জানতেন, কোনদিকে সুড়ঙ্গ খুঁড়লে বিগ্রহ পাওয়া যাবে।
কর্নেল আস্তে বললেন, ইংরেজিতে একটা প্রবচন আছে।’ডেডস্ ডু নট স্পিক। মৃতেরা কথা বলে না। কাজেই ওটা নিছক ধারণাই থেকে যাচ্ছে।
কিন্তু মন্টুবাবু পড়ে গিয়ে পাগল হয়েছিলেন কেন। এটা খুব অদ্ভুত না?
কর্নেল বললেন, কমল বোস ওরফে ব্যাঙবাবু ছিলেন হাতুড়ে ডাক্তার। তাকে জেরা করলে জানা যেতে পারে, ছেলে মাধবের সাহায্যে মন্টুবাবুকে গড়ের জঙ্গলে ডেকে এনে কথা আদায় করার জন্য কোনও নার্ভের ওষুধ জোর করে খাইয়ে দিয়েছিলেন কি না? নার্ভকে আচ্ছন্ন করে সাইকিয়াট্রিস্টরা রোগীর অবচেতন মনের গোপন কথা জেনে নেন। ব্যাঙবাবু হাতুড়ে ডাক্তার। হিতে বিপরীত হয়ে গিয়েছিল। দেখা যাক, আগে অপারেশন সাকসেসফুল হোক। তখন জানা যাবে।…
.
উপসংহার
কর্নেলের তাড়ায় ভোর ছটায় আমাকে উঠতে হয়েছিল। বেড-টি খেয়ে সেজেগুজে বেরুতে-বেরুতে সাড়ে ছ’টা বেজে গেল। কর্নেল বাংলোর লন পেরিয়ে গিয়ে বললেন, রমেশ পাণ্ডে বুদ্ধিমান। বাইনোকুলারে তন্নতন্ন খুঁজে গড়ের জঙ্গলের দিকে পুলিশ দেখতে পাইনি। ক্যামোফ্লেজ করে ঝোঁপের আড়ালে পুলিশ ফোর্স মোতায়েন করেছেন। অবশ্য একটা পুলিশ ভ্যান কাঁচা রাস্তা দিয়ে আদিবাসীদের গ্রামের দিকে যেতে দেখেছি।
কর্নেল যথারীতি তার প্রাতঃভ্রমণের ভঙ্গিতে হাঁটছিলেন। কিছুক্ষণ পরে ব্লাড় জমিটায় উঠে আমরা গড়ের পূর্বদিকে পৌঁছুলুম। কোথাও পুলিশের টিকিও দেখতে পেলুম না।
ধসে পড়া ব্রিজের ওপর দিয়ে গড়ে ঢোকার সময় কর্নেল থমকে দাঁড়ালেন। কোনও পাখি শিস দিচ্ছিল। কর্নেল পালটা শিস দিলেন। তারপর একটা ধ্বংস্তূপের আড়ালে রমেশ পাণ্ডের টুপি দেখা গেল। উনি পুলিশের পোশাক পরে অপারেশনে এসেছেন। কর্নেল তাকে ইশারায় অনুসরণ করতে বললেন।
তারপর উনি বাইনোকুলারে চারদিকে খুঁটিয়ে দেখে এগিয়ে গেলেন উত্তর-পশ্চিম কোণে। উঁচুতে সেই ভাঙা ঘরের অংশটা লক্ষ করে এগিয়ে গিয়ে একটুকরো পাথরের ওপর দাঁড়ালেন। শরৎকালের সকালবেলার রোদে সবুজ বৃক্ষলতা গুল্মে শিশির ঝলমল করছিল। পাখির ডাকে মুখর চারদিক। এমন একটা সুন্দর নিসর্গে মনোরম সকালবেলায় কমল বোস ওরফে ব্যাঙবাবুকে পাকড়াও করার জন্য অভিযান বড় বিসদৃশ ঘটনা।
হঠাৎ কর্নেল আমার উদ্দেশে একটু চড়া গলায় বললেন, জয়ন্ত সর্বনাশ। ওই বুঝি সেই সাংঘাতিক জলের পেত্নি কিচনি। ওরে বাবা! কী ভয়ঙ্কর চেহারা।
আমি কিছু দেখতে না পেলেও আঁতকে উঠে বললুম, পালান কর্নেল। শিগগির পালিয়ে যাই আসুন।
কর্নেল বললেন, ওরে বাবা। কিচনিটা যে আমাদের দিকেই আসছে।
এতক্ষণে একটা ধ্বংস্তূপের আড়াল থেকে বিদঘুঁটে জন্তুটাকে বেরুতে দেখলুম। প্রকাণ্ড একটা কালো ব্যাঙের মতো দেখতে। মুখটাও ব্যাঙের মতো। কিন্তু ধারালো সাদা দাঁত আছে মুখে। চোখ দুটো লাল এবং ঠেলে বেরিয়ে আসছে। থপথপ শব্দে জন্তুটা হাঁ করে এগিয়ে এল। তারপর গলার ভেতর ভূতুড়ে শব্দ করতে থাকল।
