কর্নেল পকেট থেকে খামে ভরা সেই ন’খানা চিঠি বের করে দিলেন পাণ্ডেকে। পাণ্ডে চিঠিগুলো দেখে বললেন, বাংলা বলতে পারলেও আমি পড়তে পারি না। এগুলো কী?
কর্নেল তাকে সংক্ষেপে ঘটনাটা জানিয়ে একটা চিঠি পড়ে শোনালেন।
পাণ্ডে বললেন, ঝন্টুবাবু আমাদের জানাননি। তাহলে এতদিনে ধরে ফেলতুম কে ওঁর গেটে চিঠি রেখে আসে। শুনেছি, ঝন্টুবাবু সাহসী লোক।
কর্নেল বললেন, ঝুঁকি নিতে সাহস পাননি। দিদি এবং পাগল ভাইয়ের কথা ভেবেই চুপচাপ ছিলেন। লক্ষ করুন, এগুলো সবই পুরু আর্টপেপারে ছাপা ফটো কপি। প্রত্যেকটা মূল একটা চিঠির কপি।
আপনার কি সন্দেহ মাধববাবুর শ্যালকের প্রেসে এগুলো ছাপা হয়েছে?
সম্ভবত।
পাণ্ডে হাসলেন। আপনি নিশ্চয় কোনও বিশেষ কারণে এই সন্দেহ করেছেন?
হ্যাঁ। ব্যাঙবাবুর কারণে।
রমেশ পাণ্ডে অবাক হয়ে বললেন, ব্যাঙবাবু? তাকে কি আপনি চেনেন?
কর্নেল জবাব দিতে যাচ্ছিলেন, এইসময় রামপ্রসাদ ট্রেতে কফি আর স্ন্যাক্স আনল। সে চলে গেলে কর্নেলের ইশারায় আমি দরজা ভেতর থেকে বন্ধ করে দিলুম।
কর্নেল তিনটে কাপে কফি ঢালতে-ঢালতে বললেন, ব্যাঙবাবু গড়ের জঙ্গলে ডেরা পেতেছে। সম্ভবত ওখানে উত্তর-পশ্চিম কোণে কোনও একটা ঘর এখনও টিকে আছে। সেই ঘরে ব্যাঙবাবু মাঝে-মাঝে গিয়ে থাকে, তা স্পষ্ট। আজ দুপুরে ব্যাঙবাবুর এই ছবিটা টেলিলেন্সের সাহায্যে দুর থেকে তুলেছি। আপনি দেখুন। তারপর বলুন মগলনালকে আপনি আপনার প্রয়োজনে গ্রেফতার করতে পারবেন কি না। কারণ, সে নাকি স্থানীয় এক প্রভাবশালী নেতার ডানহাত।
ছবিটা দেখে পাণ্ডে বললেন, বর্ণনার সঙ্গে মিলে যাচ্ছে। মগনলালের সঙ্গে ব্যাঙবাবু তাহলে যোগাযোগ করেছে?
হ্যাঁ। দুজনে মুখোমুখি বসে কথা বলছিল। পরে মগললালের ছবিও তুলেছি। এই দেখুন।
রমেশ পাণ্ডে একটু চুপ করে থেকে বললেন, মগললালকে গ্রেফতার করা যায়। কিন্তু তাকে আটকে রাখা যাবে না। তবে-কর্নেল কফিতে চুমুক দিয়ে বললেন, বলুন?
রমেশ পাণ্ডে গলার ভেতর থেকে বলেন, মগনলালের গার্জেনের এক প্রতিদ্বন্দ্বী আছে। তিনিও প্রভাবশালী। তিনি একবার বলেছিলেন, কোনও সুযোগে এনকাউন্টারে মগনলালের মৃত্যু ঘটানো হোক। কিন্তু আমার বিবেকে বাধে। যদি সত্যিই কোনও সাংঘাতিক ক্রাইমের সময় সুযোগ মেলে, তাহলে অবশ্য আলাদা কথা। কিন্তু মগনলাল ধূর্ত লোক। সে ব্যবসায়ীদের কাছে চাঁদা আদায় করে। অনেক সময় ডাকাতিও করে। কিন্তু ঘটনাস্থলে সে থাকে না। তার নামে তিনটে খুনের অভিযোগ আছে। তাকে জামিন দেওয়া হয়েছে। যদি খুনের সময় মুখোমুখি তাকে পেতুম, গুলি করে মেরে এনকাউন্টারে মৃত্যু বলে চালানো যেত।
কর্নেল বললেন, না-না। নরহত্যার প্রশ্ন ওঠে না। অপরাধীর আইনমাফিক বিচারই কাম্য। আমি আপনাকে কখনই এমন প্রস্তাব দেব না। বরং এমন কাজের বিরোধিতাই করব। যাই হোক, ব্যাঙবাবুর গড়ের জঙ্গলে মাঝে-মাঝে গিয়ে থাকার উদ্দেশ্য, সিংহ রাজাদের পূর্বপুরুষের বিগ্রহ খুঁজে বের করে তা বিদেশে পাচার করা। বিগ্রহ ওই জঙ্গলে ধ্বংসস্তূপের তলায় কোথাও চাপা পড়েছিল।
রমেশ পাণ্ডে বললেন, আমার মতে আজ রাতেই গড়ের জঙ্গলে হানা দিয়ে ব্যাঙবাবুকে গ্রেফতার করা দরকার। তার নামে এখনও হুলিয়া ঝুলছে।
কর্নেল হাসলেন। অথচ ব্যাঙবাবু মাথায় পরচুলা আর মুখে নকল দাড়ি পরে দিব্যি ধার্মিক সাধুসন্তের চেহারা নিয়ে সিংহগড়ে বাস করেন। মাঝে মাঝে তীর্থযাত্রায় বাইরে যাবার ছলে গড়ের জঙ্গলে লুকিয়ে থাকেন। বিগ্রহের খোঁজে সেখানে ব্যর্থ খোঁড়াখুঁড়ি করেন। তবে না। রাতে ওঁর ডেরা যদি খুঁজে পান আপনারা, জঙ্গলে উনি গা-ঢাকা দিয়ে পালিয়ে যাবেন। তার চেয়ে কাল সকাল সাতটা নাগাদ হানা দেওয়াই ভালো। প্রচুর ফোর্স দরকার। সারা গড়ের জঙ্গল ঘিরে রেখে হানা দিতে হবে।
পাণ্ডে চিন্তিত মুখে বললেন, সিংহগড় থানায় বেশি ফোর্স নেই। এস. পি. সায়েবকে বলে ধরমপুরা আর লখিমপুরা থানা থেকে ফোর্স আনাতে হবে। রাতের মধ্যে ফোর্স আসা দরকার। শুধু একটু অসুবিধা। গড়ের জঙ্গলের একটা রাফ ম্যাপ আগে তৈরি করে রাখা উচিত ছিল।
আমি করেছি। বলে কর্নেল ঘরে ঢুকে কিটব্যাগ থেকে একটা ভাজকরা কাগজ নিয়ে এলেন। সেটা খুলে বললেন, স্মৃতি থেকে আজ দুপুরে খাওয়ার পর এটা এঁকেছি। একেবারে নির্ভুল না হলেও মোটামুটি একটা রাফ ম্যাপ এটা। যেখানে মন্টুবাবুর বডি পাওয়া গিয়েছিল এবং যেখানে তাকে হত্যা কর হয়েছিল, সেই জায়গাটা ম্যাপে আছে।
পাণ্ডে ম্যাপটা দেখতে-দেখতে বললেন, পশ্চিমেও একটা প্রবেশ পথ দেখছি।
হ্যাঁ। ও পথে আদিবাসীরা শিকারে যায়।
আচ্ছা কর্নেল সরকার, যেখানে মন্টুবাবুকে খুন করা হয়েছিল, ওখানে স্টার চিহ্ন কেন?
ওখানে একটা পাঁচকোনা পাথর আছে লক্ষ্য করেননি? একটা কোনা অবশ্য ভাঙা।
না। লক্ষ করিনি। আসলে তখন খুনের মোটিভ নিয়েই চিন্তাভাবনা করছিলুম।
ওটা মোগল আমলের চবুতরার ছাদের অনুকরণে তৈরি। এমনভাবে ধসে পড়েছে যে কোণগুলো সহজে চোখে পড়ে না। ঘাস আর ঝোপে ঢাকা পড়েছে কিছুটা।
রমেশ পাণ্ডে উঠে দাঁড়ালেন। তা হলে চলি। ফিরে গিয়ে এস. পি. সায়েবের সঙ্গে যোগাযোগ করে সব ব্যবস্থা রাতের মধ্যেই করে ফেলছি। আপনি এবং জয়ন্তবাবু আমাদের সঙ্গে থাকবেন।
