অমরজিৎ ওরফে ঝন্টুবাবু বললেন, বনবিহারী থানার হাজত থেকে দিদিকে খবর পাঠিয়েছিল। দিদি যায়নি। আমি গিয়েছিলুম। ফেরার পথে বাংলোয় আপনাদের সঙ্গে দেখা করতে গিয়ে শুনেছিলুম আপনারা বেরিয়েছেন।
কর্নেল বললেন, তা হলে বংলোয় চলুন। সেখানে বসে কথা হবে।
ঝন্টুবাবু বললেন, থাক। দেখা যখন হয়ে গেল, তখন কথাটা বলে চলে যাই। দিদি মন্টুর মৃত্যুতে ভেঙে পড়েছে। তাকে একা রেখে এসেছি। তো কথাটা বলি। থানার হাজতে আমাকে দেখে বনবিহারী কান্নাকাটি করে বলল, দাদা, আমাকে বাঁচান। বিনা দোষে আমাকে পুলিশ ধরেছে। ওকে জিগ্যেস করলুম, তুমি নাম বদলেছ কেন? বনবিহারী বলল, আগের দুষ্কর্মের জন্য সে অনুতপ্ত। সৎ ভাবে বেঁচে থেকে ব্যবসাবাণিজ্য করার জন্য কোর্টে অ্যাফিডেভিট করে সে নাম বদলেছে। এখানে এসেছিল সে স্থানীয় ব্যবসায়ীদের কাছে অর্ডার সংগ্রহ করতে মাধব তাকে আশ্বাস দিয়েছিল। আমাদের সঙ্গে সময়মতো সে দেখা করতে যেত।
গড়ের জঙ্গলে কেন গিয়েছিল বলেনি?
বনবিহারী বলল যে, আগে এখানে এসে সে কিচনির গল্প শুনেছিল। এখন তার লাইসেন্সড ফায়ার আর্মস আছে। তাই সাহস করে সেখানে কিচনি খুঁজতে গিয়েছিল। কিচনির দেখা সে পেয়েছে। চারটে গুলি ছুঁড়েও চিনিকে সে মারতে পারেনি। আমি বললুম, এ বয়সে ছেলেমানুষি এখনও যায়নি তোমার? মন্টুর সাংঘাতিক মৃত্যুর কথাও তাকে বললুম। তা শুনে সে বলল, এর প্রতিশোধ সে নেবে, যদি আমি তাকে পুলিশের হাত থেকে ছাড়াতে পারি। তখন ওকে জিগ্যেস করলুম, কে মন্টুকে খুন করেছে সে কি জানে? বনবিহারী বলল যে, সে জানে। কিন্তু তাকে থানা থেকে ছাড়িয়ে আনলে তবেই সে সব কথা খুলে বলবে। আমি পুলিশকে অনেক অনুরোধ করলুম। জামিন হতে চাইলুম। কিন্তু পুলিশ তাকে ছাড়বে না। মন্টুর খুনের অন্যতম আসামী করা হয়েছে তাকে। তাই কাল তাকে কোর্টে তুলবে।
কর্নেল জিজ্ঞেস করলেন, আর কিছু বলেছে সে?
ঝন্টুবাবু একটু চুপ করে থেকে বললেন, হ্যাঁ। একটা কথা বনবিহারী বলছিল। কথাটা বুঝতে পারিনি। কে নাকি তাকে ঠকিয়েছে। তার অনেকগুলো টাকা গচ্চা গেছে। এর প্রতিশোধ সে নেব। পুলিশ তার সঙ্গে বেশিক্ষণ কথা বলতে দিল না। তাই এ ব্যাপারে কিছু জিগ্যেস করার সুযোগ পাইনি।
ঠিক আছে। আপনি বাড়ি যান। আমি পুলিশের সঙ্গে যোগাযোগ করে দেখি, কী করা যায়।
ঝন্টুবাবু চলে গেলেন। আমরা বাংলোতে ফিরলুম। কর্নেল বললেন, তুমি ঘরে গিয়ে বোসো। আমি মিঃ পাণ্ডেকে টেলিফোনে পাই কি না দেখি।
দোতলায় আমাদের রুমের দরজা খুলে ব্যালকনিতে গিয়ে বসলুম। কিছুক্ষণ পরে কর্নেল ফিরে এসে বললেন, রমেশ পাণ্ডে আসছেন। একসঙ্গে কফি খাওয়া যাবে।
তখনও দিনের আলো ছিল। কর্নেল বাইনোকুলারে গড়ের জঙ্গল দেখতে-দেখতে বললেন, মগনলাল আবার শিকারে বেরিয়েছে। সেই টাড় জমিতে লালঘুঘুর ঝক খুঁজছে। লালঘুঘুর মাংস নাকি সুস্বাদু। কিন্তু ওই পাখিগুলো মগনলালের চেয়ে ধূর্ত। ব্যস। উড়ে পালিয়ে গেল। ওকে গুলি ছোঁড়ার সুযোগই দিল না। মগললাল হতাশ হয়ে কঁচা রাস্তায় হেঁটে যাচ্ছে।
বললুম, ব্যাঙবাবুর কাছে যাচ্ছে।
কর্নেল বাইনোকুলার রেখে হাসলেন। সিংহ রাজাদের বিগ্রহ উদ্ধারে ব্যাঙবাবু মগনলালের সাহায্য নিয়েছেন। তাঁর পূর্বপুরুষ সিংহ রাজাদের কর্মচারী ছিলেন। কাজেই ওই বিগ্রহের কথা বংশপরম্পরায় তাদের জানার কথা।
আমার ধারণা, বিগ্রহ গড়ের জঙ্গলেই লুকানো আছে।
কর্নেল চোখ বুজে দাড়িতে হাত বুলিয়ে বললেন, বিগ্রহের রত্নালঙ্কার বিক্রি করেছিলেন ঝন্টুবাবুর ঠাকুরদার বাবা। তাই বলে বিগ্রহ লুকিয়ে রাখবেন কেন? লুকিয়ে রাখার পিছনে কোনও যুক্তি নেই।
তাহলে সেই বিগ্রহ গেল কোথায়?
এর সোজা এবং যুক্তিসঙ্গত উত্তর হল, বিগ্রহ ধ্বংস্তূপে চাপা পড়েছিল।
চিন্তা করো জয়ন্ত। ঝন্টুবাবুর ঠাকুরদার বাবা দুর্গপ্রাসাদ ছেড়ে চলে এসেছিলেন কেন? মেরামতের অভাবে প্রাসাদ ভেঙে পড়েছিল। তার মৃত্যুর পর ঝন্টুবাবুর ঠাকুরদার পক্ষে ওই ধ্বংসস্তূপ সরিয়ে বিগ্রহ উদ্ধারের ক্ষমতা ছিল না। অমন বিশাল ধ্বংস্তূপ-কল্পনা করো, তখন জঙ্গল গজায়নি। শুধু বিশাল দুর্গপ্রাসাদের ধ্বংসস্তূপ একটা টিলার মতো উঁচু হয়ে আছে। তা সরাতে প্রচুর টাকা খরচ করে মজুর লাগানো দরকার। শুধু মজুর নয়, দক্ষ উৎখননকর্মী এবং ক্রেন দরকার ছিল। গত একশ বছরে প্রাকৃতিক কারণে গড়ের জঙ্গলের সেই চেহারা বদলে গেছে। বিশেষ করে ১৯৩৪ সালে বিহারে ভয়ঙ্কর ভূমিকম্প হয়েছিল। তার ফলে ভূপ্রকৃতির গঠন বদলে গিয়েছিল। সেই ভূমিকম্পের চিহ্ন গড়ের জঙ্গলে লক্ষ করেছি। এখানে থেকে মুঙ্গের পর্যন্ত এলাকা ভূমিকম্পে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছিল। ধারিয়া নদীর গতিপথ বদলে গিয়েছিল।
কর্নেল ভূমিকম্প নিয়ে সমানে বকবক করতে থাকলেন। ওঁর এই স্বভাব। আমি অসমতল সবুজ প্রান্তর আর দিগন্তে পর্বৰ্মলার দিকে তাকিয়ে প্রকৃতির সৌন্দর্য দেখছিলুম। এসময় দরজায় কেউ নক করল। কর্নেল বললেন, কম ইন।
দরজা ভেজানো ছিল। দেখলুম, সাদা পোশাকে রমেশ পাণ্ডে ঢুকলেন। কর্নেল বললেন, এখানে চলে আসুন মিঃ পাণ্ডে। এখনই কফি এসে যাবে নিচে বলে এসেছি ছ’টা নাগাদ কফি পাঠাতে।
পাণ্ডে এসে ব্যালকনিতে বসলেন। একটু হেসে বললেন, আপনি অফসেট বা লেজার প্রিন্টিং প্রেসের কথা জিগ্যেস করছিলেন। আমাদের সোর্স খবর দিয়েছে, পাটনায় মাধববাবুর শ্যালক চন্দ্রনাথবাবুর ওই প্রেস আছে।
