তার কাঁধের ওপর দিয়ে দেখলুম, হাফপ্যান্ট-গেঞ্জি পরা একটা মোটাসোটা লোক বেঁটে একটা গাছের ছায়ায় বসে সিগারেট টানছে। তার মুখোমুখি আর একটা লোক বসে হাত নেড়ে কিছু বলছে। এই লোকটা ওর চেয়ে লম্বা। পরনে প্যান্ট আর খয়েরি রঙের শার্ট। হাতে একটা বন্দুক এবং কাঁধে একটা ব্যাগ।
প্রায় হাত তিরিশ-পঁয়ত্রিশ দূরে এবং আমাদের থেকে অনেকটা নিচে ওরা বসে আছে। কিছুক্ষণ পরে বন্দুকধারী লোকটা উঠে দাঁড়াল। সে আমাদের দিকে উঠে আসছে দেখে কর্নেল ফাটল থেকে সরে আমাকে ইশারায় উল্টোদিকের আড়ালে লুকোতে বললেন। কর্নেল লুকিয়ে পড়লেন ঘন ঝোঁপের আড়ালে। লোকটা কাঁধে বন্দুক নিয়ে শিস দিয়ে গান করতে-করতে ফাটল পথে নেমে গেল এবং গড়খাইয়ে পড়ে থাকা পাঁচিলের ওপর দিয়ে দ্রুত ওপারে পৌঁছুল। একটু পরে পশ্চিমের মাঠে ঝোঁপঝাড় আর পাথরের আড়ালে সে অদৃশ্য হয়ে গেল।
কর্নেল আবার ফাটলের দিকে এগিয়ে গেলেন এবং আমিও ওঁকে অনুসরণ করলুম। নিচের লোকটাকে এবার হেঁটে যেতে দেখলুম উত্তর-পশ্চিম কোণে টিকে থাকা ভাঙা ঘরটার দিকে। ততক্ষণে কর্নেল ক্যামেরায় টেলিলেন্স ফিট করে তার ছবি তুলে নিয়েছেন। আমার কানের কাছে মুখ এনে উনি ফিসফিস করে বললেন, চিনতে পারলে কি ব্যাঙবাবুকে?
চমকে উঠে বললুম তাই তো। মোটা বেঁটে গোলগাল চেহারা। মাথায়—
চুপ।–বলে কর্নেল বাইনোকুলারে উত্তর-পশ্চিম দিকে দেখতে থাকলেন। কিছুক্ষণ পরে বললেন, চল। এই যথেষ্ট, ফেরা যাক খিদে পেয়েছে।
কাঁচা রাস্তায় পৌঁছে কর্নেল বাইনোকুলারে চোখ রেখে বললেন, বন্দুকওয়ালা লোকটা ওই টাড়ে গুঁড়ি মেরে বসে আছে।
একটু ভয় পেয়ে বললুম, আমাদের লক্ষ করে গুলি ছুঁড়বে না তো?
কর্নেল হাসলেন। না। লোকটা লালঘুঘু শিকার করতে চায়। দেখা যাক। লালাঘুঘুরা বেজায় ধূর্ত।
কর্নেল হন্তদন্ত হয় হাঁটতে থাকলেন। টাড় জমিটার একটু দূরে পৌঁছেছি, সেইসময় লোকটা বন্দুক থেকে গুলি ছুড়ল। এক ঝাক লালঘুঘু উড়ে গড়ের জঙ্গলের দিকে চলে গেল। কর্নেল ক্যামেরা বাগিয়ে একটা ফুলেভরা ঝোপে প্রজাপতির ছবি তুলতে গেলেন। তখন লোকটা আমাদের দেখতে পেল। সে ব্লাড় থেকে নেমে রাস্তায় দাঁড়াল।
কর্নেল কোনও প্রজাপতিকে অনুসরণ করছেন, এই ভঙ্গিতে ক্যামেরা তাক করে গুঁড়ি মেরে বসলেন। দেখলুম, ক্যামেরায় টেলিলেন্স ফিট করাই আছে। তার মানে লোকটার ছবি তোলাই তার উদ্দেশ্য।
একটু পরে শাটার টিপলেন কর্নেল পরপর দুবার। লোকটা অবাক হয়ে তাকে দেখছিল। কাছে গেলে সে বলল, ক্যা সাব? আপ ফাটরাঙ্গাকি তসবির উঠাতা হ্যায়?
কর্নেল কিটব্যাগ থেকে প্রজাপতি ধরা জাল বের করে বললেন, বহতন হুঁশিয়ার ফাটরাঙ্গা। নেটমে নেহি পাকড় যাতি তো ক্যা করেগা?
ইসমে ক্যা ফায়দা?
হবি হ্যায় ভাই, হবি। আপকা ব্যয়সা শিকার কি হবি হ্যায়।
আপ কাঁহাসে আতা হ্যায় সাব?
কলকত্তাসে। আপ হেঁয়াকা রহনেওয়ালা হ্যায়?
হাঁ।
আমরা তার সঙ্গে হাঁটছিলুম। কর্নেল তার সঙ্গে গল্প জুড়ে দিলেন। তারপর গড়ের জঙ্গলের কিচনির কথা তুললেন। সে ভয় দেখিয়ে বলল, কিচনি দেখলে লোক পাগল হয়ে যায়। কিচনি মানুষকে আছড়ে মারে। সরকারি বাংলোর কাছে পৌঁছে কর্নেল তার নাম জিজ্ঞেস করলে সে শুধু বলল, মগনলাল। তারপর বন্দুক কাঁধে নিয়ে শিস দিয়ে গান করতে-করতে চলে গেল।…
স্নানাহারের পর কর্নেল চুরুট শেষ করে বললেন, তুমি গড়িয়ে নাও জয়ন্ত। আমি বাথরুমকে ডার্করুম করে ফিরে একটা অংশ কেটে ওয়াশ ডেভলাপ করে ফেলি। বাকি ফিল্মগুলো বাঁচিয়ে কাজটা করতে হবে।
রোদে হেঁটে ক্লান্ত ছিলুম। স্নানাহারের পর ভাতঘুম আমাকে পেয়ে বসল। সেই ঘুম ভাঙল কর্নেলের ডাকে। উনি বললেন, উঠে পড়ো জয়ন্ত চারটে বাজে।
ব্যাঙবাবু আর মগনলালের ছবি চমৎকার উঠেছে। দেখবে এস।
ছবিগুলো দেখে বললুম, মিঃ পাণ্ডেকে এবার জানানো উচিত।
জানাব। কফি আসুক কফি খেয়ে বেরুব।
রামপ্রসাদ কফি দিয়ে গেল। কফি খেয়ে সাড়ে চারটে নাগাদ আমরা বেরুলুম। কর্নেল সাবেক বসতি বাঙালিটোলার দিকে যাচ্ছেন দেখে জিগ্যেস করলুম, ঝন্টুবাবুর বাড়ি গিয়ে কী হবে? পুলিশকে জানাতে দেরি হলে ব্যাঙবাবু কেটে পড়তে পারে।
কর্নেল বললেন, পুলিশ পরে। আগে ঝন্টুবাবুকে দরকার।
অমরজিৎ সিংহের সঙ্গে পথে দেখা হয়ে গেল। উনি কর্নেলের কাছে আসছিলেন। কর্নেল নির্জন রাস্তায় দাঁড়িয়ে প্রথমে তাকে মগনলালের ছবি দেখালেন। অমরজিৎ বললেন, এর ছবি কোথায় তুললেন? এর নাম মগনলাল। সাংঘাতিক লোক। পুলিশও একে সমীহ করে চলে। এখানকার এক রাজনৈতিক নেতার ডান হাত।
কর্নেল এবার ব্যাঙবাবুর ছবিটা বের করে বললেন, এঁকে চেনেন কি?
অমরজিৎ অবাক হয়ে বললেন, আরে। ইনি তো কমলবাবু, ডাক্তার। মাধবের বাবা।
কর্নেল হাসলেন। এঁর হরিদ্বারে থাকার কথা। অথচ ইনি এখানেই আছেন। এঁর আরেকটা নাম ব্যাঙবাবু। জানেন কি?
অ্যাঁ? বলে অমরজিৎ নড়ে উঠলেন। হ্যাঁ, হ্যাঁ। মনে পড়ছে। ছোটবেলায় আমরা ওঁকে ব্যাঙবাবু বলে আড়ালে ঠাট্টা করতুম। ব্যাঙের মতো হাঁটাচলা দেখে এ পাড়ায় অনেকেই কমলজেঠুকে ব্যাঙ ডাক্তার বলতেন বটে।…
.
সাত
অমরজিৎ সিংহকে কর্নেল আর কোনও কথা খুলে বললেন না। তার সব প্রশ্ন এড়িয়ে গিয়ে শুধু বললেন, যথাসময়ে জানতে পারবেন। এবার বলুন আমার কাছে কী বিশেষ কারণে যাচ্ছিলেন?
