রমেশ পাণ্ডের জন্য কফি এল। স্থানীয় আইন-শৃঙ্খলা নিয়ে তিনি কিছুক্ষণ বকবক করলেন। একসময় কর্নেল জিজ্ঞেস করলেন, সিংহগড়ে প্রাচীন মূর্তি বা ভাস্কর্য পাচারের কোনও চক্র কি কখনও ধরা পড়েছিল মিঃ পাণ্ডে?
হ্যাঁ। গতবছর একটা চক্র আমরা খুঁড়িয়ে দিয়েছিলুম। এলাকার বিভিন্ন মন্দির থেকে প্রাচীন বিগ্রহ চুরি করে ট্রাকে পাচার করা হচ্ছিল। দলে পাঁচজন লোক ছিল। চারজন ধরা পড়েছিল। তারা জেল খাটছে এখনও। একজন ধরা পড়েনি। সেই কিন্তু রিং লিডার। তার আসল নাম ধোলাই দিয়ে সাগরেদের কাছে আদায় করতে পারিনি। তারা বলেছিল, তাকে ব্যাঙবাবু বলে জানে। সেই ব্যাঙবাবু নাকি বাঙালি। তবে সে কোথায় থাকে, তা তারা জানে না।
ব্যাঙবাবু? কর্নেল কেন যেন একটু চমকে উঠলেন। ব্যাঙা ডাকনাম শুনেছি। কিন্তু ব্যাঙবাবু তো অদ্ভুত নাম!
পাণ্ডে বললেন, বুঝুন কর্নেল সরকার। থার্ড ডিগ্রি ধোলাই কী জিনিস নিশ্চয় জানেন। সেই ধোলাই খেয়েও তারা ব্যাঙবাবু’ ছাড়া অন্য নাম বলেনি। আমার ধারণা, লোকটা বাইরে থাকত। পাটনা হোক, কি কলকাতা হোক। তার চেহারার বর্ণনা আদায় করেছিলুম। বেঁটে, গোলগাল লোক। কাঁচা পাকা চুল। বয়সে বৃদ্ধ। কিন্তু তার গায়ে নাকি প্রচণ্ড জোর। তারা বারতিনেক রাতের বেলায় তাকে বাঙালিটোলার একটা পোড়োবাড়িতে দেখেছিল বাড়ি সার্চ করে আমরা কোনও সূত্র পাইনি। দিনরাত ওত পেতে থেকেও তার পাত্তা মেলেনি। বলে পাণ্ডে একটু হাসলেন। তো মূর্তি পাচারের কথা কেন বলুন তো?
কর্নেল বললেন, পাগল মন্টুবাবুকে অত্যাচার করে মেরে ফেলায় এই প্রশ্নটা মাথায় এসেছে। মন্টুবাবু কি কোনও প্রাচীন দামি বিগ্রহের খোঁজ রাখতেন?
হ্যাঁ। আপনারা প্রশ্নে যুক্তি আছে। রমেশ পাণ্ডে কফি দ্রুত শেষ করলেন। উঠে দাঁড়িয়ে বললেন, আপনাকে অসংখ্য ধন্যবাদ কর্নেল সরকার। আমার মাথায় এটা আসা উচিত ছিল। মন্টুবাবু সিংহগড় রাজবংশের লোক। তার পড়ে পূর্বপুরুষের কোনও বিগ্রহের খবর জানা সম্ভব ছিল–যা তার দাদা জানতে পারেননি। মন্টুবাবুকে হত্যার একটা মোটিভ পাওয়া যাচ্ছে। আচ্ছা, চলি। প্রয়োজনে পরস্পর যোগাযোগ রাখব।
রমেশ পাণ্ডে চলে গেলে কর্নেল আপন মনে বললেন, ব্যাঙবাবু।
বললুম, গড়ের জঙ্গলে তোলা কিচনির ছবিটা কিন্তু ব্যাঙের মতোই।
কর্নেল হাসতে-হাসতে উঠে দাঁড়ালেন। চল, বেরুনো যাক। এই খেলাটা সেই ব্যাঙের বলেই মনে হচ্ছে। তবে আপাতত ব্যাঙবাবুর চেয়ে ব্যাঙজাতীয় ওই জন্তুটা আমার কাছে গুরুত্বপূর্ণ।
সরকারি বাংলোর পশ্চিমে অসমতল সেই মাঠের রাস্তায় গিয়ে বললুম, আবার গড়ের জঙ্গলে? কর্নেল একই জায়গায় বারবার গিয়ে শুধু এই বিদঘুঁটে জন্তুটার ছবি তুলে কী হবে? জন্তুটা আর যাই করুক, পাগল মন্টুবাবুকে সে তো খুন করেনি।
কর্নেল বললেন, বুঝতে পারছি। তুমি বনবিহারী ওরফে হীরালালের মতো ওই জন্তুটাকে ভয় পাচ্ছ।
রামপ্রসাদ বলছিল, এখানকার সব মানুষই ওর ভয়ে গড়ের জঙ্গলে ঢোকে না।
কিন্তু আদিবাসীরা ওখানে শিকার করতে ঢোকে। মন্টুবাবুর লাশ তারাই দেখতে পেয়েছিল।
এ থেকে বোঝা যাচ্ছে, জন্তুটা আদিবাসীদের দেখা দেয় না। কেন দেখা দেয় না, তার কারণ অনুমান করা যায়। আদিবাসীদের বিষাক্ত তীরকে ভয় পায় জন্তুটা। তাদের লক্ষভেদও অব্যর্থ। জন্তুটা যেভাবেই হোক, এটা বোঝে।
হাঁটতে-হাঁটতে সেই উঁচু টাড় জমিটার কাছে পৌঁছে কর্নেল বললেন, আজ আমরা গড়ের পশ্চিম দিকটা দেখব। আমার ধারণা, দুর্গপ্রাসাদের ধ্বংসাবশেষ গড়খাইয়ের জলে পড়ে সম্ভবত ওদিকে একটা রাস্তা তৈরি করেছে। কারণ, এই পথটা এঁকেবেঁকে পাহাড়ের নিচে একটা আদিবাসীদের গ্রামে পৌঁছেছে। ওদিক থেকে গড়ের জঙ্গল অনেক কাছে। ওরা হয়তো ওদিক দিয়েই জঙ্গলে ঢোকে।
কিছুটা এগিয়ে চোখে পড়ল, কাঁচা রাস্তাটা বাঁদিকে হঠাৎ বাঁক নিয়ে গড়ের জঙ্গলের কাছে গেছে। তারপর ডাইনে বাঁক নিয়ে চড়াইয়ে উঠে একটা ছোট্ট গ্রামে ঢুকেছে। গ্রামটা একটা টিলার কাঁধে। কিন্তু বাংলো থেকে চোখে পড়ে না।
কর্নেল রাস্তার বাঁক থেকে দক্ষিণে ঝোঁপঝাড়ে ভর্তি মাঠের দিকে হাঁটতে থাকলেন। একটু পরে আমরা পশ্চিমের গড়খাইয়ের ধারে পৌঁছুলুম। কর্নেলের অনুমান সত্য। দুর্গপ্রাসাদের খাড়া পাঁচিলের একটা অংশ এখানে দেখা যাচ্ছে। পাথরের ইটের ফাঁকে গুল্ম লতা গজিয়েছে। গড়খাইয়ে প্রচুর পাথর পড়ে আছে বটে, কিন্তু সেগুলোতে পা ফেলে যাওয়া অসম্ভব। কর্নেল আরও কিছুটা এগিয়ে গিয়ে থমকে দাঁড়ালেন। বললেন, বাহ! এইরকম কিছুই আশা করেছিলুম।
একটা পাথরের বিশাল পাঁচিল আড়াআড়ি ভাবে গড়খাইয়ে ভেঙে পড়েছে। পাঁচিলটার দৈর্ঘ্য গড়খাইয়ের চেয়ে বেশি। তবে জায়গায়-জায়গায় একটু অংশ জলে ডুবে আছে। ব্যালান্স রেখে হাঁটলে সহজে ওপারে পৌঁছানো যায়। কর্নেল পায়ের কাছটা দেখিয়ে বললেন, এই দেখ। দিব্যি একটা পায়ে চলা পথের চিহ্ন আছে। শরৎকাল বলে পথটা ঘাসে কিছুটা ঢাকা পড়েছে। এপথেই আদিবাসীরা শিকার করতে ঢোকে।
পাঁচিলটা প্রস্থে অন্তত পাঁচ-ছ’ফুট। কিন্তু দুটো পাশ ভেঙে মাত্র এক-দেড় ফুট জলের ওপর উঁচিয়ে আছে। কর্নেল আগে এবং আমি পেছনে ব্যালান্স রেখে সাবধানে ওপারে গেলুম। তারপর চওড়া একটা ফাটলের মতো পাথরের ফাঁক দিয়ে এগিয়ে হঠাৎ কর্নেল গুঁড়ি মেরে বসলেন এবং আমাকেও বসিয়ে দিলেন।
