কিন্তু হীরালালবাবুর আচরণ সন্দেহজনক।
কর্নেল একটু চুপ করে বললেন, জয়ন্ত, আজ সকালে হীরালালবাবু গড়ের জঙ্গলে আর একটা গুলি কিচনিকে লক্ষ করে ছুঁড়েছিলেন। আমি কাছাকাছি ব্লাড় জমিটার পাশে ছিলুম। উনি জঙ্গল থেকে পড়ি কি মরি করে পালিয়ে এসে এক রাউন্ড ফায়ার করেছিলেন।
বললুম, তাহলে কে মারল মন্টুবাবুকে? রহস্য যে জট পাকিয়ে গেল।
কর্নেল বলেন, তাছাড়া সমস্যা হল, একই ক্যালিবারের ফায়ার আর্মস অন্যেরও থাকতে পারে। কাজেই রহস্য সত্যিই জটিল হল।
.
ছয়
রামপ্রসাদ রাতের খাবার রেখে গিয়েছিল। কর্নেল তাকে বলেছিলেন, আমরা আজ দেরি করে খাব। তুমি বরং সকালে এসে এঁটো থালাবাটি আর ট্রে নিয়ে যেও।
রাত সাড়ে দশটায় কর্নেল বাথরুমে ঢুকে আলো জ্বেলে দিয়েছিলেন। লক্ষ করেছিলুম, দড়িতে ক্লিপ এঁটে চারটে ছবি ঝোলানো আছে। তখনও ছবিগুলো শুকোয় নি। আমরা খেয়ে নিয়েছিলুম। তারপর রাত এগারোটা নাগাদ কর্নেল ছবির প্রিন্টগুলো নিয়ে এসে টেবিলল্যাম্পের আলোয় আমাকে কিচনির ছবি তিনটে দেখিয়েছিলেন।
পাশের ঝোঁপের উচ্চতা আন্দাজ করে বোঝা গিয়েছিল, জন্তুটা অন্তত পাঁচফুট উঁচু। অবিকল প্রকাণ্ড ব্যাঙের মতো দেখতে। মাথায় কঁকড়া চুল আছে। বসে আছে ঠিক ব্যাঙের মতো। পাশ থেকে তোলা ছবি। তাই শুধু দেখা যাচ্ছিল একটা চোখ ঠেলে বেরিয়ে আছে। অজানা কোনও প্রাণী হওয়াই সম্ভব।
পরদিন ভোরে কর্নেল বেরিয়েছিলেন। আমার ঘুম ভেঙেছিল সাতটা নাগাদ। কলিং বেল বাজিয়ে রামপ্রসাদকে ডেকে আজ বেডটি আনিয়ে নিলুম। কর্নেল সকাল-সকাল ফিরে এলেন। বললেন, আজ বেড়ানো হল না। সিংহবাড়ি গিয়েছিলুম। পরমেশ্বরীকে হীরালালের ছবি দেখালুম। উনি ছবি দেখে অবাক হয়ে বললেন, এ তো তার দেবর বনবিহারী। গোঁফ রেখেছে। দেখতে মোটাসোটাও হয়েছে। খুব দুর্ধর্ষ ছেলে ছিল। রেলের চোরাই লোহালক্কড় বিক্রির অভিযোগে দুবার ধরা পড়েছিল। তার স্বামী ভাইকে অনেক তদ্বির করে বাঁচিয়েছিলেন। তার সঙ্গে এ বাড়িতে সে কয়েকবার এসেছে। অমরজিৎবাবুও সায় দিয়ে বললেন, ছবিটা দেখে তার চেনা লাগছে। মাধবের সঙ্গে বনবিহারীর আলাপ হয়েছিল এখানেই। মন্টু, মাধব আর বনবিহারী একসঙ্গে ঘুরে বেড়াত। ওঁরা দুজনেই খুব অবাক হয়েছেন। কেন বনবিহারী তাদের বাড়ি না এসে বাংলোয় উঠেছে? কেনই বা সে হীরালাল নাম নিয়েছে? তাকে পুলিশ খুনের দায়ে গ্রেফতার করেছে শুনেও দুজনে অবাক। মন্টুকে কেন সে খুন করবে? যাই হোক, অমরজিৎ এবং পরমেশ্বরীকে চুপচাপ থাকার পরামর্শ দিয়ে এলুম।
জিগ্যেস করলুম, ওঁদের কিচনির ছবির কথা বলেননি?
কর্নেল হাসলেন। চেপে যাও জয়ন্ত। কিচনি সম্পর্কে ভুলেও মুখ খুলবে না।
ন’টায় ব্রেকফাস্ট খাওয়ার পর কর্নেলের কথামতো বেরুনোর জন্য তৈরি হচ্ছি, সেইসময় দরজায় কেউ নক করল। দরজা খোলা ছিল কর্নেল বললেন, কাম ইন।
ঘরে ঢুকলেন রমেশ পাণ্ডে। পরনে পুলিশের পোশাক নেই। প্যান্ট-শার্ট পরে এসেছেন। তিনি একটা চেয়ার টেনে বসে বললেন, বুলেট নেলটা কাল সন্ধ্যায় স্পেশাল মেসেঞ্জার মারফত পাটনায় ফরেন্সিক ল্যাবে পাঠিয়েছিলুম। কিছুক্ষণ আগে ট্রাঙ্ককলে ব্যালাস্টিক মিসাইল এক্সপার্ট রঘুবীর সিনহা জানালেন, বুলেটটা থ্রি নট থ্রি। তবে ওটা পয়েন্ট আটত্রিশ ক্যালিবারের রিভলবার থেকে ছোঁড়া হয়েছে। এই অবস্থায় হীরালাল বাবুকে আটকে রাখার মানে হয় না। তার রিভলভারটার লাইসেন্স আছে। ব্যবসায়ী লোক। সঙ্গে টাকা-পয়সা নিয়ে ঘোরেন। তাই
কর্নেল তাঁর কথার ওপর বললেন, ভদ্রলোকের আসল নাম কিন্তু বনবিহারী রায়। উনি ভিকটিম মন্টুবাবুর দিদি পরমেশ্বরী দেবীর দেবর। আপনি অমরজিৎবাবু এবং পরমেশ্বরীদেবীর কাছে গেলে এ খবর পেয়ে যাবেন। আমি সকালে হীরালালবাবুর ছবি নিয়ে তাদের কাছে গিয়েছিলুম।
পাণ্ডে বিস্মিত হয়ে বললেন, আপনি হীরালালের ছবি তুলেছিলেন?
হ্যাঁ। কর্নেল হাসলেন। গড়ের জঙ্গলে ওঁর যাতায়াত দেখে সন্দেহ হয়েছিল। তাই কাল লনে ফুলে বসা প্রজাপতির ছবি তোলার ছলে ওঁর ছবি তুলেছিলুম। আমার সঙ্গে ফটো প্রিন্টের পোর্টেবল সরঞ্জাম আছে। ছবিটা আপনাকে দিচ্ছি। পাটনায় এই ভদ্রলোকের ব্যাকগ্রাউন্ড সম্পর্কে খোঁজ খবর নিতে পারেন।
ছবিটা পকেটে রেখে রমেশ পাণ্ডে একটু হেসে বললেন, কর্নেল সরকারের ব্যাকগ্রাউন্ডটাও কাল রাতে জেনে গেছি। আমাদের সবরকম সহযোগিতা পাবেন। আপনি নিজের পথে হাঁটুন। আমরা আমাদের পথে হাঁটি। আশা করি, এক জায়গায় পরস্পর মুখোমুখি হতে পারব।
কর্নেলের কথায় কলিং বাজিয়ে রামপ্রসাদকে ডেকে কফির অর্ডার দিলুম। রমেশ পাণ্ডে বললেন, সিংহগড়ে পয়েন্ট আটত্রিশ ক্যালিবারের লাইসেন্সড রিভলভার কারও নেই। যদি থাকে সেটা বেআইনি। আপনি নিশ্চয় জানেন, বিহার মুল্লুকে বেআইনি অস্ত্র প্রচুর আছে। আমরা বহু ক্ষেত্রে অসহায়। রাজনীতিকদের চাপে সব জেনেও হাত-পা গুটিয়ে বসে থাকতে হয়।
কর্নেল বললেন, আচ্ছা মিঃ পাণ্ডে, সিংহগড়ে অফসেট বা লেজার প্রিন্টিং প্রেস আছে?
সিংহগড়ে? নাহ কর্নেল সরকার। তবে সাবেক আমলের ট্রেডল মেশিনের প্রিন্টিং প্রেস আছে। বিজ্ঞাপন, পাঁউরুটির মোড়ক ইত্যাদি ছাপা হয়। এখানে ওসব আধুনিক টেকনলজির প্রিন্টিং প্রেসে কী ছাপবে?
