ইন্সপেক্টর রমেশ পাণ্ডে নাইলনের দড়িগুলো, সিগারেটের টুকরো এবং সাবধানে বিছুটির ডালগুলো খবরের কাগজ ব্যাগ থেকে বের করে মুড়ে নিলেন। তারপর বললেন, চলুন। ফেরা যাক।
কর্নেল বলেন, আপনারা এখোন। আমি এই জঙ্গলে অর্কিড আছে কি না খুঁজে দেখি। তাছাড়া দুর্লভ প্রজাতির প্রজাপতিও এখানে দেখতে পাওয়া সম্ভব।
পাণ্ডে হাসলেন। সাবধান কর্নেল সরকার। গড়ের জঙ্গলে নাকি কিচনি আছে, জলের প্রেতিনী।
কর্নেলও হাসতে-হাসতে বললেন, দেখা গেলে তো ভালো হয়। ছবি তুলব।
কিন্তু সাবধান। এখানে নাকি সাপের খুব উপদ্রব আছে।
বলে রমেশ পাণ্ডে কনস্টেবলদের সঙ্গে নিয়ে চলে গেলেন। ভদ্রলোক দেখতে রোগাটে হলেও খুব স্মার্ট মনে হল।
উনি চলে যাওয়ার পর জিগ্যেস করলুন, আপনার পরিচয় কি উনি জানেন?
আমি কর্নেল নীলাদ্রি সরকার। অবসরপ্রাপ্ত সামরিক অফিসার। এই পরিচয়ই যথেষ্ট। ওঁকে আমার নেমকার্ড দিয়েছি। যদি বেশি উৎসাহী হন, তাহলে কলকাতায় ট্রাঙ্ককল করে লালবাজার পুলিশে হেটকোয়ার্টারে ডিটেকটিভ ডিপার্টমেন্টে খবর নেবেন। তাতে আমার বেশি সুবিধে হবে।
কর্নেল বাইনোকুলারে আবার কিছুক্ষণ চারদিক খুঁটিয়ে দেখলেন। তারপর পা বাড়িয়ে আস্তে বললেন, কিচনি সত্যি এখানে আছে। কিন্তু আমার অবাক লাগছে, কিচনি কেন মন্টুবাবুকে রক্ষা করতে আসেনি! মন্টুবাবু বলেছিলেন, কিচনির সঙ্গে তার নাকি ভাব হয়েছে।
বোগাস। আপনিও কী দেখতে কী দেখছেন। ভালুক-টালুক হয় তো।
কর্নেল হঠাৎ থেমে ইশারায় আমাকে চুপ করতে বললেন। তারপর বাঁ-দিকে একটা স্কুপের আড়ালে হাঁটু মুড়ে বসে ক্যামেরায় কীসের ছবি তুললেন। পরপর তিনবার ক্যামেরার শাটার ক্লিক করল।
তারপর সরে এসে আস্তে বলেলেন, চলো। কেটে পড়া যাক।
গড়ের জঙ্গল থেকে বেরিয়ে আগের রাস্তায় হাঁটতে-হাঁটতে জিগ্যেস করলুম, অমন চুপিচুপি কীসের ছবি তুললেন এবার বলুন।
কিচনির।
ভ্যাট।
বিশ্বাস করা না করা তোমার ইচ্ছে। এক মিনিট। এখনও আলো আছে। ফিল্মের রিলটাতে আর দু-তিনটে ছবি তোলা যায়। রিলটা শেষ করে আজ রাতেই ওয়াশ ডেভালাপ প্রিন্ট করে ফেলব।
কর্নেল তার স্যুটকেসে পোর্টেবল স্টুডিও সরঞ্জাম এনেছেন। বাইরে কোথাও গেলে ওটা সঙ্গে নিয়ে যান। বাথরুমকে ডার্করুমে পরিণত করেন। ব্লাড় জমিটার ওপর যেতে-যেতে কর্নেল হাঁটু মুড়ে বসে মুখে হুস শব্দ করলেন। অমনি এক ঝাঁক পাটকিলে রঙের পাখি উড়ে গেল। কর্নেল পর-পর শাটার টিপে উঠে দাঁড়ালেন। হঠাৎ ওঁর মুখে কেমন বিরক্তির ছাপ লক্ষ করে বললুম, কী? ছবি উঠবে না মনে হচ্ছে নাকি?
কর্নেল বলেন, না জয়ন্ত। ছবি উঠবে। আসলে, সিংহ পরিবারের দেবতার অভিশাপের মতো আমার জীবনেও যেন এই একটা অভিশাপ। যেখানে এই লালঘুঘুর ঝাক দেখেছি, সেখানেই খুনোখুনিতে আমাকে জড়িয়ে পড়তে হয়েছে। কাল সকালে এখানে এই লালঘুঘুর ঝক দেখেছিলুম। ছবি তোলার সুযোগ পাইনি। কিন্তু বরাবরকার মতো মনে-মনে একটু আঁতকে উঠেছিলুম। তুমি কুসংস্কার বলবে। বলো। কিন্তু এটা হয়।….
বাংলোয় ফিরে যথারীতি ব্যালকনিতে বসে আমরা কফি খেলুম। তারপর কর্নেল বললেন, বাথরুমে যেতে হলে যাও জয়ন্ত। এবার ঘণ্টা তিনেকের জন্য বাথরুম ডার্করুম হবে।
বাথরুমকে ডার্করুম বানিয়ে কর্নেল ঢুকে গেলেন। ঘরের আলো নিভিয়ে দিয়ে গেলেন। দরজা ভেতর থেকে বন্ধ রইল। আমি ব্যালকনিতে বসে সময় কাটাতে আরও এক পেয়ালা কফি সাবাড় করলুম। পটে আরও কফি লিকার ছিল।
কিছুক্ষণের মধ্যেই কর্নেল বাথরুম থেকে বেরিয়ে এবার টেবিলল্যাম্প জ্বেলে আমার কাছে এসে বসলেন। বললেন, চারটে নেগেটিভ প্রিন্ট করতে দিলুম। হীরালালবাবুর ছবি ভালোই উঠেছে। ফুলের সামনে হীরালাল। আর কিচনির ছবি আশানুরূপ না হলেও মোটামুটি উঠেছে। জায়গাটাতে পুরো রোদ ছিল না। তিনটেই পাশ থেকে তোলা।
বললুম, তাহলে ভূতপেত্নি নয়। কোনও জন্তু!
নিশ্চয়। কর্নেল হাসলেন। পেত্নি হলে কি আর ছবি উঠত?
এই সময় দরজায় কেউ নক করল। কর্নেল উঠে গিয়ে বললেন, কে?
রামপ্রসাদের সাড়া এল। হামি রামপ্রসাদ আছি সার। আপনার টেলিফোন আসল। তাই বড়াসাব বলল, কর্নিলসাবকো খবর দো।
কর্নেল দরজা খুলে বললেন, চলে যাচ্ছি। জয়ন্ত, দরজা আটকে দাও। সাড়া না পেলে দরজা খুলো না।
কর্নেল বেরিয়ে গেলেন। দরজা আটকে ঘরেই বসলুম। আমার একটা লাইসেন্স করা ফায়ার আমর্স আছে। বাইরে গেলে সঙ্গে নিই। এবার তাড়াহুড়ো করে চলে এসেছিলুম। অস্ত্রটা সঙ্গে থাকলে সাহস বেড়ে যেত। কিন্তু এখন আর আক্ষেপ করে লাভ নেই।
মিনিট পনেরো পরে কর্নেলের সাড়া পেয়ে দরজা খুলে দিলুম। উনি দরজা বন্ধ করে ব্যালকনিতে গিয়ে বললেন, মিঃ পাণ্ডের টেলিফোন। হীরালাল রায়কে অ্যারেস্ট করেছেন। আচমকা মাধববাবুর বাড়িতে হানা দিয়েছিলেন ওঁরা। হীরালালবাবুর কাছে একটা পয়েন্ট পঁয়ত্রিশ ক্যালিবারের রিভলভার পাওয়া গেছে। সিক্স রাউন্ডার ফায়ার আর্মস দুটো গুলি ভরা আছে। বাকি চারটে ফায়ার করা হয়েছে। চিনির কৈফিয়তে সন্তুষ্ট হতে পারেননি মিঃ পাণ্ডে। বললুম, হীরালালবাবুকে কাল আমরা তিনটে গুলি ছুঁড়তে দেখেছিলুম। তাহলে চতুর্থটা মন্টুবাবুর মাথায় ঢুকেছে।
কর্নেল বললেন, আমি মিঃ পাণ্ডেকে বললুম, এখানে ফরেন্সিক এক্সপার্ট বা ব্যালাস্টিক মিসাইল এক্সপার্ট নেই। ডাক্তারের অনুমানের ওপর নির্ভর না করে বুলেট নেলটা পাটনায় ফরেন্সিক এক্সপার্টের কাছে পাঠান।
