কর্নেল আরও খানিকটা এগিয়ে গিয়ে বললেন, এখানেও রক্তের ছাপ দেখা যাচ্ছে। জয়ন্ত, তুমি বিশেষ করে পেছনে আর দুপাশে লক্ষ রাখবে।
উনি খুঁড়ি মেরে রক্তের ছাপ অনুসরণ করছিলেন। আমি সতর্ক দৃষ্টে পিছনে এবং দুপাশে লক্ষ রেখে হাঁটছিলুম। একখানে আবার একটা পাথরের স্ল্যাব দেখা গেল। বেশ চওড়া। কয়েকটা কোণ আছে পাথরটার। নক্ষত্রের প্রতীক বলা চলে। কর্নেল বললেন, এটা বোধ হয় দুর্গপ্রাসাদের ছাদে কোনও জায়গার ওপর থামের মাথায় বসানো ছিল। মোগল আমলের স্থাপত্যে চবুতরার মাথায় এ ধরনের ছাদ থাকত। হ্যাঁ, ভাঙা থামের চিহ্নও লক্ষ করছি। তার চেয়ে গুরুত্বপূর্ণ, এখানেই রক্তের ছাপ শেষ হয়েছে। জয়ন্ত, আমার সন্দেহ সত্য প্রমাণিত হল।
কী সন্দেহ?
মন্টুবাবুকে খুন করেছে কেউ। আমার মনে আগে থেকেই এই সন্দেহটা থেকে গেছে। মন্টুবাবু সম্ভবত এমন কিছু গোপন কথা জানতেন, তা ওঁর কাছে জানার জন্য ওঁকে পীড়ন করায় উনি পাগল হয়ে যান।
বলেন কী! মাধববাবু তো–
কর্নেল আমার কথার ওপর বললেন, মাধববাবু মিথ্যা বলতেও পারেন। হ্যাঁ। ওই দেখ এই পাথরের ওপাশে ছেঁড়া নাইলনের দড়ির কয়েকটা টুকরো পড়ে আছে। জয়ন্ত। কাল সারারাত এবং আজ সকাল পর্যন্ত মন্টুবাবুকে দড়ি বেঁধে এখানে ফেলে রাখা হয়েছিল।
বলে কর্নেল পাথরটার শেষদিকে গিয়ে ঝুঁকে বসলেন। সিগারেটের টুকরো পড়ে আছে। এখানে। মন্টুবাবুর লাশে বুকের কাছে আর গালে পোড়া দাগই আমি দেখেছিলুম। তখন মনে হয়েছিল, ওগুলো ময়লা বা কাদার ছোপ। কর্নেল মুখ তুলে সামনে একটা ঝোঁপের দিকে তাকালেন। বললেন, ওই দেখ জয়ন্ত। ওগুলো বিছুটির ঝোঁপ। পায়ে বিছুটিপাতা লাগলে প্রচণ্ড যন্ত্রণা হয়। কয়েকটা বিছুটি গাছ পড়ে আছে লক্ষ করো। হাতে গ্লাভস পরে কেউ পাগলের ওপর অকথ্য পীড়ন করেছে। শেষে ধৈর্য হারিয়ে মেরে ফেলেছে।
আমি বিছুটির জঙ্গলের দিকে তাকিয়ে ছিলুম। সেই কোথাও চাপা থপ থপ শব্দ হল। কর্নেলও শব্দটা শুনতে পেয়েছিলেন। তখনই উঠে দাঁড়িয়ে শব্দটা লক্ষ করে বাইনোকুলার তুললেন। বললেন, কী একটা কালো প্রকাণ্ড জন্তুর পিঠ দেখতে পেলুম। মাথায় লম্বা চুলও আছে। সেই কিচনি। থাক। বিরক্ত করব না। থানা থেকে সি আই ডি ইন্সপেক্টর রমেশ পাণ্ডের আসার কথা। এতক্ষণ এসে পড়া উচিত ছিল। জিপে আসার অসুবিধে নেই। পৌনে তিনটে বেজে গেল।
কর্নেল ঘড়ি দেখে শিমুল গাছটার তলায় গেলেন। ওঁকে অনুসরণ করলুম। জায়গাটা উঁচু বলে পূর্বদিকে তোরণের ধ্বংসস্তূপ পর্যন্ত দেখা যাচ্ছিল। কর্নেল চুরুট ধরিয়ে বাইনোকুলারে আবার চারদিক দেখতে থাকলেন। কিছুক্ষণ পরে জিপের শব্দ এল কানে। কর্নেল ঘুরে দেখে বললেন, এসে গেছেন রমেশ পাণ্ডে।
চারজন সশস্ত্র কনস্টেবলের সঙ্গে রোগাটে চেহারার এক পুলিশ অফিসার সাবধানে ভাঙা ব্রিজের পাথরে পা রেখে গড়ের জঙ্গলে ঢুকলেন। কর্নেল হাত নেড়ে ডাকলেন, মিঃ পাণ্ডে। এখানে আসুন।
পুলিশের দলটি বুটের শব্দে জঙ্গল কাঁপিয়ে এগিয়ে এল। রমেশ পাণ্ডে বললেন, একটু দেরি হয়ে গেল কর্নেল সরকার। ডেডবডির পোস্টমর্টেমের প্রাইমারি রিপোর্ট পেয়ে কোয়ার্টারে ফিরে খাওয়াদাওয়া করে বেরুতে–যাই হোক। আপনি এতক্ষণ নিশ্চয়ই কিছু সূত্র পেয়ে গেছেন।
কর্নেল তাকে রক্তের ছোপগুলো দেখাতে-দেখাতে সেই খাঁজকাটা পাথরটার কাছে গেলেন। নিজের মতামত দিয়ে বললেন, মর্গের রিপোর্ট কী বলছে বলুন?
রমেশ পাণ্ডে বললেন, আপনি ঠিকই বলেছেন। ডেডবডিতে অত্যাচারের চিহ্ন আছে। তবে মারা হয়েছে গুলি করে। মাথার পেছনে গুলি করে পাথর দিয়ে থ্যাতলানো হয়েছে। পিঠে এবং কোমরেও ভোতা জিনিস দিয়ে আঘাত করা হয়েছে। যাতে মনে হয় উঁচু জায়গা থেকে আছাড় খেয়ে পড়ে মারা গেছে লোকটা। মাথার ভেতর হাড়ের খাঁজে বুলেটনেল আটকে ছিল। পয়েন্ট পঁয়ত্রিশ ক্যালিবারের রিভলভার থেকে পয়েন্ট ব্ল্যাঙ্ক রেঞ্জে গুলি করা হয়েছিল। দৈবাৎ গুলিটা ঘুরতে-ঘুরতে হাড়ের খাঁজে আটকে গিয়েছিল। মাথা ছুঁড়ে বেরিয়ে যাওয়ার চান্স ছিল। তা হলে ডাক্তার অন্য রিপোর্ট লিখে বসতেন। আসলে অত খুঁটিয়ে পরীক্ষার ব্যবস্থা নেই এখানকার হাসপাতালে। হ্যাঁ, ডাক্তারের মতে, ভোরের দিকে মারা হয়েছিল। রাইগর মর্টিস সবে শুরু হয়েছে, এমন সময়ে বডি ডাক্তারের হাতে দেওয়া হয়।
কর্নেল বললেন, আপনাকে এক ভদ্রলোকের কথা বলেছিলুম।
পাণ্ডে হাসলেন। পেছনে লোক লাগিয়ে রেখেছি। এবার গিয়ে ওঁর অস্ত্রটা চাইব। লাইসেন্সড ফায়ার আর্মস কি না এবং কত ক্যালিবার, তাও দেখব। কিন্তু একজন পাগলকে এমন করে খুন করার কোনও মোটিভ খুঁজে পাচ্ছি না। আপনার কী ধারণা?
কর্নেল বললেন, ভিকটিমের দাদা অমরজিৎ সিংহ কোনও আভাস দিতে পারেননি?
না। আসার সময় ওঁর সঙ্গে দেখা হল। হাসপাতালে বডির ডেলিভারি নিতে যাচ্ছিলেন। উনি শুধু বললেন, দেবতার অভিশাপ ছাড়া কোনও কারণ খুঁজে পাচ্ছেন না।
কর্নেল হাসলেন। গুলি করে মারাও কি দেবতার অভিশাপ?
পাণ্ডে চাপা স্বরে বললেন, ব্যাকগ্রাউন্ডটা তদন্ত করলে জানা যাবে। সম্পত্তি নিয়ে ভাইয়ে-ভাইয়ে কোনও গন্ডগোল ছিল কি না। মাধব বোস ভিকটিমের বন্ধু ছিলেন। এখন ভদ্রলোক বড় ব্যবসায়ী। তার কাছেও যাব আমরা।
