তাঁর নাম কী? কোথায় উঠেছেন তিনি?
হীরালাল রায়। সরকারি বাংলোতে উঠেছেন। আজ তাকে আমার বাড়িতে চলে আসতে বলেছি।
কর্নেল উঠে দাঁড়ালেন। আপনার বন্ধুর সঙ্গে আমার তাহলে আলাপ হয়েছে। উনি কিচনি দেখে নাকি রিভলভার বের করে গুলি ছুঁড়েছিলেন।
হীরালাল রায়ও এক পাগল। বলে মাধববাবু ভুরু কুঁচকে তাকালেন। ওঁর রিভলভার আছে জানতুম না।
একটা কথা। আজ সকালে অমরজিৎবাবুর সঙ্গে দেখা হয়েছে। তিনি বললেন, মন্টুবাবু রাতে বাড়ি ফেরেননি। তাকে কোথাও খুঁজে পাওয়া যাচ্ছে না।
পাগলের ব্যাপার। কোথাও আছে। ফিরবেখন।
আপনার বাবা ডাক্তার। তার সঙ্গে আলাপ করতে পারলে খুশি হতুম।
বাবা হরিদ্বার গেছেন। একেকজন একেক রকমের পাগল। বাবা ধর্মপাগল।
উঠে আসার সময় লক্ষ করলুম, মাধববাবু বেজায় গম্ভীর হয়ে গেছেন। বাইরে গিয়ে কথাটা কর্নেলকে বললুম। কর্নেল বললেন, বন্ধু রিভলভার সঙ্গে নিয়ে ঘোরেন, এই ব্যাপারটা সম্ভবত ওঁকে চিন্তিত করেছে। যাই হোক, চলো, আমরা আপাতত বাংলোয় ফিরি।…
বাংলোর লনে রঙবেরঙের ফুলগাছ। তাতে প্রজাপতি ওড়াউড়ি করে বেড়াচ্ছিল। কর্নেল হঠাৎ প্রজাপতির ছবি তুলতে ব্যস্ত হয়ে উঠলেন। সেই সময় দেখলুম, একটা ব্রিফকেস এবং কাঁধে মোটা একটা ব্যাগ ঝুলিয়ে হীরালালবাবু বেরিয়ে আসছেন। তিনি থমকে দাঁড়িয়ে কর্নেলের ছবি তোলা দেখে চলে গেলেন।
কর্নেল ছবি ভোলা বন্ধ করে এগিয়ে এলেন। তারপর একটু হেসে চাপা স্বরে বললেন, কাজ হয়ে গেল। ভাগ্যিস ভদ্রলোককে বেরিয়ে আসতে দেখেছিলুম।
জিজ্ঞেস করলুম, কিন্তু কী কাজ হয়ে গেল?
প্রজাপতির ছবির সঙ্গে হীরালাল রায়ের ছবি তুললুম। রোদে স্ন্যাপশট। ছবিটা ভালই হবে।
আমরা দোতলায় নিজেদের ঘরে ফিরে পোশাক বদলে দক্ষিণের ব্যালকনিতে গিয়ে বসলুম। প্রায় সাড়ে বারোটা বাজে। কর্নেল বাইনোকুলারে গড়ের জঙ্গল দেখতে-দেখতে হঠাৎ বলে উঠলেন, সর্বনাশ। যা সন্দেহ করেছিলুন, তাই হয়েছে মনে হচ্ছে। হ্যাঁ, ঝন্টুবাবুকেও দেখতে পাচ্ছি। একদল লোক তাঁর সঙ্গে গড়ের জঙ্গল থেকে–হ্যাঁ। ওরা একটা মাচায় চাপিয়ে মড়া বয়ে আনছে। জয়ন্ত। পাগল মন্টুবাবু মারা পড়েছেন।
কর্নেলের হাত থেকে বাইনোকুলার নিয়ে দেখলুম, সত্যি তাই। গাছের ডাল কেটে মাচা বানিয়ে একদল লোক সেটা বয়ে আনছে। উজ্জ্বল রোদে দেখা যাচ্ছিল মন্টুবাবুকে। মাচায় চিত হয়ে আছেন। আগে হেঁটে চলেছেন তার দাদা ঝন্টুবাবু।
কর্নেল বললেন, জয়ন্ত। আমি এখনই আসছি। তুমি ঘর ছেড়ে নড়ো না। সাবধান।…
.
পাঁচ
কর্নেল ফিরে এলেন প্রায় একঘণ্টা পরে। কলিং বেল টিপে রামপ্রসাদকে ডেকে খাবার আনতে বললেন। তারপর বাথরুমে গিয়ে হাত-মুখে জল দিয়ে ভোয়ালেতে মুছে বললেন, তুমি কি স্নান করেছ?
বললুম, না। স্নান করব না। ঘটনাটা আগে বলুন।
কর্নেল চেয়ার টেনে বসে বললেন, কয়েকজন আদিবাসী গড়ের জঙ্গলে খরগোস শিকারে ঢুকেছিল। তারা পাগল মন্টুর ক্ষতবিক্ষত মড়া দেখতে পেয়ে ঝন্টুবাবুকে খবর দিয়েছিল। আশ্চর্য ব্যাপার, উড়ো চিঠিতে যে শিমুল গাছের কথা আছে, তার তলায় পড়েছিলেন মন্টুবাবু। আমি বাংলো থেকে যাবার সময় কেয়ারটেকারের ঘর থেকে থানায় টেলিফোন করে গিয়েছিলুম। ঝন্টুবাবুর ধারণা, গাছ থেকে আছাড় খেয়ে পড়ে গেছে। ওঁকে বুঝিয়ে বললুম, তবু পোস্টমর্টেম করা দরকার। পুলিশকেও জানানো দরকার যাই হোক, শিগগির জিপে চেপে পুলিশ এসে গিয়েছিল। সেই মাচায় চাপিয়েই বডি মর্গে নিয়ে গেল। আদিবাসীরা সিংহগড়ের রাজবংশের প্রতি খুব অনুগত দেখলুম। তবে এখন ওসব কথা থাক। খিদে পেয়েছে।
ট্রেতে খাবার এনে টেবিলে রেখে রামপ্রসাদ বলল, সার! আজ কিচনি এক বাবুকো মার ডালা। উয়ো এক পাগল আদমি থা। পহেলা কিচনি দেখকার বাবু পাগল হো গয়া। দুসরা বার কিচনি উসকো মার ডালা।
কর্নেল বললেন, শুনেছি রামপ্রসাদ।
রামপ্রসাদ ভয়ার্ত মুখে বলল, আপনারা নতুন আসিয়েছেন সার। কভি কিচনিকি কিলামে মাত ঘুসিয়ে। উয়ো বহত খতরনাক জাগাহ আছে।…
খাওয়ার পর কর্নেল ব্যালকনিতে বসে চুরুট ধরালেন। আমি অভ্যাস মতো বিছানায় গড়িয়ে নিচ্ছিলুম। চোখের পাতায় ঘুমের টান এসেছিল। কর্নেলের ডাকে চোখ খুলতে হল। উঠে পড়ো জয়ন্ত। বেরুব।
উনি সেজেগুজে তৈরি। আমি প্যান্ট-শার্ট পরে তৈরি হয়ে নিলুম। তারপর কাল বিকেলে যে রাস্তা ধরে গড়ের জঙ্গলে গিয়েছিলুম, সেই রাস্তায় হেঁটে চললুম।
আধঘণ্টার মধ্যে গড়ের জঙ্গলে পৌঁছে গেলুম আমরা। কর্নেল বাইনোকুলারে শিমুল গাছটা খুঁজে বের করে বললেন, কালকের লাঠি দুটো রাস্তায় ফেলে গিয়েছিলুম। আসার সময় দেখতে পেলুম না। দাঁড়াও। আগে দুটো লাঠি দরকার।
কালকের মতো গাছের লম্বা ডাল কেটে লাঠি তৈরি করে আমরা ধ্বংসস্তূপের ভেতর দিয়ে এগিয়ে চললুম। শিমুল গাছটার তলায় গিয়ে দেখি, পাথরের ওপর শুকনো রক্তের ছাপ এখনও রয়ে গেছে। শিমুল গাছটা শরৎকালে খুব ঝাপালো হয়ে আছে। কিন্তু কাটাভর্তি গুঁড়ি বেয়ে কারও পক্ষে এই গাছে চড়া সম্ভব নয়।
কর্নেল খুঁটিয়ে চারপাশটা দেখে নিয়ে পা বাড়ালেন। তারপর ঘাসের দিকে ঝুঁকে বললেন, এই ঘাসগুলো কাত হয়ে গেছে। রক্তের ছাপও দেখতে পাচ্ছি। বোঝা যাচ্ছে, কেউ মন্টুবাবুর লাশ টেনে নিয়ে গিয়ে শিমুল গাছের তলায় রেখেছিল।
