ধন্যবাদ। আবার এসে খাব। বলে কর্নেল উঠলেন। অমরজিৎবাবু, আপনার ভাইকে যদি দুপুর অব্দি খুঁজে না পান, আমাকে যেন জানাবেন। আর হ্যাঁ, পরমেশ্বরীদেবীকে জিজ্ঞেস করতে ভুলে গেছি। গড়ের জঙ্গলে জলের পেত্নি কিচনি সম্পর্কে আপনার কী ধারণা?
পরমেশ্বরী গম্ভীর মুখে বললেন, ঝন্টু নাকি দেখেছিল। তবে আমার ধারণা, ওর চোখের ভুল। আসলে গড়ের জঙ্গলে গুপ্তধনের গুজবের মতো এও একটা গুজব। বিহারের গ্রামাঞ্চলে কিচনির ওপর লোকের অগাধ বিশ্বাস।…
রাস্তায় হাঁটতে-হাঁটতে কর্নেল বললেন, কোনও রহস্যময় ঘটনার উৎস খুঁজতে হলে আগে পুরো ব্যাকগ্রাউন্ড স্পষ্ট জানা চাই। মোটামুটি একটা ব্যাকগ্রাউন্ড জানা হয়ে গেল। চল। এবার টাউনশিপে যাওয়া যাক।
সরকারি বাংলোর নিচের চত্বরে সাইকেল রিকশা পাওয়া গেল। কর্নেল রিকশাওয়ালাকে বললেন, গান্ধী মার্কেট। জলদি জানা পড়েগা ভাই।
কয়েকটা চড়াই উতরাই এবং পোড় জমি, ঝোঁপজঙ্গল পেরিয়ে আমরা টাউনশিপে পৌঁছুলুম। রিকশাওয়ালা কুড়ি টাকা ভাড়া চেয়েছিল। সেটা ন্যায্য ভাড়া বলতে হবে। গান্ধী মার্কেট আধুনিক ধাঁচের বাজার। তার মানে, সাধারণ মানুষের জন্য এ বাজার নয়।
বিজয়া ভ্যারাইটি স্টোর্স বিশাল দোকান। কর্নেল তার ক্যামেরার জন্য দু-রিল কালার ফিল্ম কিনলেন। তারপর ফার্মেসির কাউন্টারে গিয়ে কয়েকটা অ্যানালজেসিক ট্যাবলেট কিনে কর্মচারীটিকে বললেন, প্রোপাইটার মাধববাবুর সঙ্গে একটু দেখা করতে চাই। তিনি কি আছেন?
কর্নেলের সায়েবি চেহারা এবং দাড়ি দেখে কর্মচারীটির মনে সম্ভবত ভক্তি জেগেছিল। সে বলল, উয়ো দেখিয়ে। উনহি মাধবজি আছেন। এ ভারুয়া, সাবলোঁগকো মাধবজিকা পাশ লে যা।
এক তরুণ আমাদের দোকানের ভেতর এদিক-ওদিক গলিখুঁজি ঘুরিয়ে মালিকে কাছে পৌঁছে দিল। গোল টেবিলের এক কোনায় ক্যাশিয়ার কম্পিউটারের সামনে বসে আছেন। অন্য কোনায় দুটো টেলিফোনের সামনে আরামদায়ক আসনে পঁয়ত্রিশ-ছত্রিশ বছর বয়সি প্যান্ট-স্পোর্টিং গেঞ্জি পরা এক ভদ্রলোক বসে দুটো টেলিফোনেই পালাক্রমে কথাবার্তা বলছেন। আমাদের দেখে ইশারায় তিনি সামনের চেয়ারে বসতে বললেন।
আমরা বসলুম। একটা পরে টেলিফোন রেখে তিনি বললেন, হাউ ক্যান আই হেল্প ইউ সার?
অমরজিৎবাবুর বর্ণনার সঙ্গে মিলছে না। টো টো করে বনেবাদাড়ে ঘোরা মন্টুবাবুর ঘনিষ্ঠ বন্ধুটির একটা ছবি মনে দাঁড় করিয়েছিলুম। ছবিটা মুছে গেল। কর্নেল তার নেমকার্ড দিয়ে বললেন,
অমরজিৎ সিংহের কাছে আপনার পরিচয় পেয়ে আলাপ করতে এলুম।
মাধববাবু কার্ডটা দেখে রেখে দিলেন। তারপর হাসি মুখে বললেন, আমি কি আপনার মতো মানুষের আলাপের যোগ্য? বলুন, হট না কোল্ড–
ধন্যবাদ। বেশিক্ষণ সময় নেব না। আপনি ব্যস্ত মানুষ।
চাপে পড়ে ব্যস্ত হয়েছি। নইলে আমি একসময় ছিলুম টো-টো কোম্পানিতে।
তার হাসির সঙ্গে কর্নেলও হাসলেন, হ্যাঁ। ঝন্টুবাবু বলেছিলেন। আপনি তার ভাই মন্টুবাবুর বন্ধু। দুজনে বনেজঙ্গলে পাখির খোঁজে বেড়াতেন। তো মন্টুবাবু হঠাৎ পাগল হয়ে গিয়েছিলেন।
খুব ট্র্যাজিক ঘটনা। বেচারা এত ভালো, ভদ্র আর সরল ছেলে ছিল। ছোটবেলা থেকে আমার বন্ধু সে।
আমার জানতে আগ্রহ হচ্ছে। ডিসেম্বরে গড়ের জঙ্গলে গিয়ে কী এমন ঘটেছিল যে মন্টুবাবু—
হাত তুলে কর্নেলকে থামিয়ে মাধববাবু বললেন, আমি নিচে দাঁড়িয়ে ছিলুম। মন্টু একটা পাথরের স্ল্যাবে উঠে ফঁদ পাততে যাচ্ছিল। পা স্লিপ করে পড়ে অজ্ঞান হয়ে যায়। অনেক চেষ্টার পর তার জ্ঞান ফেরে। তারপর প্রলাপ বকতে শুরু করে। আমার বাবা ডাক্তার। তিনি পরে ওকে পরীক্ষা করে বলেছিলেন মাথার ভেতর কোনও নার্ভে চোট লেগে ওর মস্তিষ্ক বিকৃতি ঘটেছে। এনিওয়ে, আপনার এ ব্যাপারে আগ্রহের কি বিশেষ কোনও কারণ আছে?
আছে। কার্ডে আপনি দেখেছেন, আমি একজন নেচারিস্ট। নেচার–অর্থাৎ প্রকৃতিতে অনেক রহস্যময় জিনিস আছে। আমি সেই রহস্যের পিছনে ছুটে বেড়াই। মন্টুবাবু প্রকৃতির মধ্যে গিয়ে হঠাৎ পাগল হয়েছিলেন। সেই রহস্য আমাকে আগ্রহী করেছে।
সিংহ ফ্যামিলির সঙ্গে কি আপনার আগে থেকে আলাপ ছিল?
না। সদ্য কাল আলাপ হয়েছে। অর্কিড় সংগ্রহও আমার হবি। তো অমরজিৎবাবুর বাড়ির উল্টোদিকে একটা উঁচু গাছের মাথায় বিরল প্রজাতির একটা অর্কিড় দেখেছিলুম। হঠাৎ একটা গাছ থেকে ঝাঁপ দিয়ে পড়ে এক পাগল আমার এই তরুণ বন্ধুটিকে কাতুকুতু দিয়ে অস্থির করছিল।
মাধববাবু হাসলেন। হ্যাঁ। পাগল হওয়ার পর মন্টু এমন করে বেড়াচ্ছে শুনেছি।
কর্নেল বললেন, অমরজিৎবাবু দৌড়ে এসে একে বাঁচান। সেই সূত্রে তাঁর সঙ্গে আলাপ হয়েছে। ছোটভাইয়ের পাগল হওয়ার ঘটনা তার কাছেই শুনেছি। আপনার সঙ্গে মন্টুবাবুর বন্ধুত্বের কথা এবং কীভাবে মন্টুবাবু পাগল হন, সবই বলেছেন তিনি। তা আমার মনে হয়েছে, গড়ের জঙ্গলে কোনও রহস্যময় প্রাকৃতিক শক্তির পাল্লায় পড়েই কি মন্টুবাবু পাগল হয়েছিলেন? যেহেতু আপনি ঘটনাস্থলে ছিলেন, তাই আমার আপনার সবটা শোনার আগ্রহ জেগেছে।
ওই তো বললুম। তেমন কোনও অলৌকিক দৃশ্য আমি দেখিনি।
গড়ের জঙ্গলে কিচনি সম্পর্কে আপনার কী ধারণা?
মাধববাবু কথায়-কথায় হাসেন। হাসতে-হাসতে বললেন, কে জানে মশাই। গড়ের জঙ্গল নিয়ে কত অদ্ভুত গুজব চালু আছে। আমি কিচনি-টিচনি দেখিনি। তবে সম্প্রতি পাটনা থেকে আমার এক ব্যবসায়ী বন্ধু এখানে এসেছেন। তিনি কাল বিকেলে গড়ের জঙ্গলে বেড়াতে গিয়ে নাকি স্বচক্ষে কিচনি দেখে পালিয়ে এসেছেন।
