.
চার
কর্নেল অভ্যাসমতো ভোরে বেরিয়েছিলেন। সাড়ে আটটায় ফিরে এসে বললেন, তুমি আজ সকাল-সকাল উঠেছ দেখছি।
একটু হেসে বললুম, হয়তো হীরালালবাবুর ভয়ে। আপনি দরজা ভেজিয়ে দিয়ে যান। সেই সুযোগে লোকটা হানা দিতে পারত।
কর্নেল কিটব্যাগ, ক্যামেরা ও বাইনোকুলার রেখে বললেন, হীরালালবাবুকে দূর থেকে দেখেছি।
কোথায়?
গড়ের জঙ্গলের চারদিকে চরকির মতো ঘুরে বেড়াচ্ছিলেন সঙ্গে এক ভদ্রলোক ছিলেন অবশ্য।
মন্টুবাবুর সঙ্গে দেখা হয়নি?
নাহ। বলে কর্নেল বাথরুমে ঢুকে গেলেন।
কিছুক্ষণ পরে নিচের ক্যান্টিনে গিয়ে ব্রেকফাস্ট সেরে আমরা বেরিয়ে পড়লুম। সাবেক বসতি এলাকায় যাবার পথে গাছের দিকে লক্ষ রেখেছিলুম। আচমকা পাগল মন্টুবাবু ঝাঁপ দিয়ে পড়ে কাতুকুতু না দেন। জামা নোংরা করে ফেলাটা কাতুকুতুর চেয়ে বিচ্ছিরি।
অমরজিত্যাবু গেটের সামনে দাঁড়িয়ে ছিলেন। আমাদের দেখে খাতির করে ভেতরে নিয়ে গেলেন। কিন্তু তাকে গম্ভীর দেখাচ্ছিল। হল ঘরে গিয়ে বললেন, মন্টু রাতে বাড়ি ফেরেনি। দিদি খুব উদ্বিগ্ন হয়ে পড়েছে। আমারও ব্যাপারটা ভালো ঠেকছে না। মন্টু যেখানেই থাক, সন্ধ্যার পর বাড়ি ফিরে আসে। খোঁজ নিতে বেরিয়েছিলুম ভোরবেলায়। কেউ তাকে দেখেনি।
আমাদের দোতলায় নিয়ে গেলেন অমরজিৎ। তার শোবার ঘরের বারান্দায় পুরনো বেতের চেয়ারে বসালেন। তার দিদি পরমেশ্বরী এসে আমাদের নমস্কার করে থামে হেলান দিয়ে দাঁড়ালেন। মুখে উদ্বেগের ছাপ স্পষ্ট।
কর্নেল বললেন, মন্টুবাবু রাতে বাড়ি ফেরেননি শুনলুম!
পরমেশ্বরী একটু চুপ করে থেকে বললেন, গাছ থেকে পড়ে যেতেও পারে। ওর ওই দুর্বল শরীর। আবার কেউ ওকে মেরে ফেলতেও পারে।
কেন?
আপনি ঝন্টুর কাছে উড়ো চিঠিগুলো তো দেখেছেন?
হুঁ। কর্নেল একটু ইতস্তত করে বললেন, আপনাকে কয়েকটা প্রশ্ন করতে চাই। সেজন্যই এসেছি।
বলুন।
আপনার তো পাটনায় বিয়ে হয়েছিল। সেখানকার হীরালাল রায় নামে কোনও ব্যবসায়ীকে চেনেন?
না তো। পাটনা থেকে কবে চলে এসেছি। এমন হতে পারে, হয়তো চিনলেও ভুলে গেছি। কেন এ কথা জিগ্যেস করছেন?
ভদ্রলোক গড়ের জঙ্গলে কাল থেকে সন্দেহজনকভাবে ঘোরাঘুরি করে বেড়াচ্ছেন।
অমরজিৎ বললেন, গুপ্তধনের গুজবে অনেক নির্বোধ ওখানে গিয়ে খোঁড়াখুঁড়ি করে। সরকার জায়গাটা দখল করেছেন এই মাত্র। শুনেছিলুম, প্রত্নবিভাগ ওখানে উৎখনন করে ইতিহাসের উপাদান খুঁজে দেখবেন। এখনও সেই প্ল্যান নাকি ফাইলচাপা আছে।
কর্নেল নিভে যাওয়া চুরুট ধরিয়ে বললেন, যাই হোক, পরমেশ্বরী দেবীকে আমার দ্বিতীয় প্রশ্ন। আপনাদের বাড়িতে যে মন্দির আছে, সেখানে শিবলিঙ্গ আছে। আপনি কি জানেন, অতীতে ওই মন্দিরে অন্য কোনও বিগ্রহ ছিল?
না। ছোটবেলা থেকে শিবলিঙ্গ দেখে আসছি। তবে–বলে পরমেশ্বরী হঠাৎ থেমে গেলেন।
কর্নেল তীক্ষ্ণদৃষ্টে তার দিকে তাকিয়ে বললেন, হুঁ। বলুন।
ঠাকুমার কাছে শুনেছি, ঠাকুরদার বাবার আমলে সিংহগড় প্রাসাদে শিবের বিগ্রহই ছিল। সেই বিগ্রহের রত্নালঙ্কার বিক্রি করে বংশে অভিশাপ লেগেছিল।
অমরজিৎ বললেন, আমি কিন্তু কোথাও শিবের বিগ্রহ–মানে মূর্তি দেখিনি। শুনেছি দক্ষিণ ভারতে নটরাজরূপী বিগ্রহ আছে। উত্তর ভারতে হরপার্বতীর যুগ্ম বিগ্রহ দেখেছিলুম।
কর্নেল বললেন, উড়ো চিঠিতে বিগ্রহ দাবি করা হয়েছে। লিঙ্গরূপী বিগ্রহ হলে তা এতদিন উড়ো চিঠি লেখার বদলে উপড়ে নিয়ে যেত লোকটা। আচ্ছা পরমেশ্বরীদেবী, মাধববাবুর বাবা বা ঠাকুরদাকে কি আপনি দেখেছেন?
হ্যাঁ। ওঁদের সঙ্গে আমাদের পারিবারিক বন্ধুত্ব ছিল। মাধবের পূর্বপূরুষ আমাদের পূর্বপুরুষের কর্মচারী ছিলেন।
মাধবের সঙ্গে আপনার ছোটভাইয়ের ঘনিষ্ঠতা ছিল?
হ্যাঁ। স্কুল থেকে ওরা সহপাঠী। এখানে কলেজ ছিল না। আমাদের আর্থিক অবস্থাও ভালো ছিল না। তাই মন্টুকে আর পড়ানো সম্ভব হয়নি। মাধব পাটনা কলেজে ভর্তি হয়েছিল। কিন্তু বি এ-তে ফেল করেছিল। তারপর আর পড়াশোনা করেনি।
অমরজিৎ বললেন, আমিও কলেজে পড়ার সুযোগ পাইনি। এখন অবশ্য এখানে কলেজ হয়েছে।
কর্নেল বললেন, মাধবের বাবা বেঁচে আছেন?
পরমেশ্বরী বললেন, হ্যাঁ। ওর বাবা কমলকুমার বোস হাসপাতালে কম্পাউন্ডারি করতেন রিটায়ার করে নিজেই ডাক্তার হয়েছিলেন।
অমরজিৎ বললেন, হাতুড়ে ডাক্তার। তবে গরিবদের ডাক্তার হিসাবে সুনাম ছিল। এখন বয়স হয়েছে। ধর্মে মতি হয়েছে। তীর্থ ভ্রমণের বাতিক আছে। তার ছেলে মাধব স্টেশনারি দোকানের সঙ্গে ওষুধের দোকানও করেছে। তাই মায়ের নামে বিজয়া ভ্যারাইটি স্টোর্স খুলেছে। আমার অবাক লাগে, মাধব মন্টুর মতোই টো টো করে ঘুরে বেড়াত। কয়েক মাসের মধ্যে ব্যবসা করে আঙুল ফুলে কলাগাছ হয়েছে।
কর্নেল পরমেশ্বরীদেবীকে বললেন, হীরালাল রায়ের কথাটা স্মরণ করার চেষ্টা করবেন।
পরমেশ্বরী বললেন, হ্যাঁ। আমার স্বামী রেলের কর্মী ছিলেন। কত লোকের সঙ্গে আলাপ ছিল। বন্ধুদের কোয়ার্টারে ডেকে এনে ছুটির দিনে খাওয়াতে ভালবাসতেন।
আমার পক্ষে সম্ভব হলে হীরালালবাবুর একটা ছবি তুলে আপনাকে দেখাব।
চেনা হলে নিশ্চয় চিনতে পারব।
আমি তাহলে উঠি।
পরমেশ্বরী ব্যস্ত হয়ে বললেন, এক কাপ চা অন্তত খেয়ে যান কর্নেলসায়েব।
