.
অমরজিৎ নড়ে বসলেন। হ্যাঁ। হ্যাঁ। দিদিও ঠিক এই কথা বলেছিলেন। মোট কথা, এমন কিছু ঘটে থাকলে তা আমাদের জন্মের আগেই ঘটেছিল।
আমি বললুন, আপনাদের কোনও জ্ঞাতি–মানে নিকটাত্মীয় কেউ নেই এখানে?
অমরজিৎ বললেন, নাহ, আর নিকটাত্মীয় বলতে ঠাকুরমার দাদার বংশধররা আছে। তাদের সঙ্গে আমাদের কস্মিনকালে যোগাযোগ নেই। শুনেছি আমার ঠাকুরমা পাটনার মেয়ে ছিলেন।
কর্নেলের দিকে তাকালুম। উনি চোখ বুজে চুরুট টানছেন।
অমরজিৎ বললেন, আর যদি নিকটাত্মীয় ধরেন, জামাইবাবুর দাদা এবং ছোটভাই। তারাও পাটনার লোক। তবে তাঁদের এসব কিছুই জানার কথা নয়।
কর্নেল চোখ খুলে বললেন, এছাড়া আর কোনও ঘটনা ঘটেছে?
না। কিন্তু আমার ভাবতে অবাক লাগে, গড়ের জঙ্গলে গত ডিসেম্বরে মন্টু কোনও পাথরে পা হড়কে গিয়ে আচমকা পাগল হল কেন? দিব্যি সুস্থ শান্ত ভদ্র ছিল মন্টু। মাধব ওর সঙ্গে ছিল। সেও খুব অবাক হয়েছিল।
ওর সেই বন্ধু মাধব এখন কোথায় আছেন?
মাধব এখানেই আছে। সিংহগড় টাউনশিপে বড় একটা দোকান করেছে। যে বাড়ির উঠোনে গরুচরানো রাখালটাকে ডেকে আপনি গাছে চড়িয়েছিলেন, ওটাই মাধবদের বাড়ি। বাড়িটা এখন খালি পড়ে আছে। ওরা টাউনশিপে নতুন বাড়ি করেছে।
মাধবের সঙ্গে একবার দেখা করতে চাই। ওঁর ঠিকানাটা বলুন।
অমরজিৎ বললেন, গান্ধী মার্কেট বললে যে-কোনও রিকশাওয়ালা পৌঁছে দেবে। ওখানে বিজয়া ভ্যারাইটি স্টোর্স বেশ বড় দোকান। মাধবকুমার বোস। ডাকনাম বাবু।
কর্নেল বললেন, চিঠিগুলো আমার কাছে রাখতে আপত্তি আছে?
আজ্ঞে না। আপনি যদি এর একটা কিনারা করতে পারেন, আতঙ্ক থেকে রক্ষা পাই। আর–দিদি বলছিল, কাল দয়া করে যদি দুপুরবেলা এই গরিবের বাড়িতে দুমুঠো খান
সে হবেন। আপনার দিদির হাতে সময় মতো চেয়ে খাব। কাল সকালে আপনার দিদির সঙ্গে একটু কথা বলতে চাই।
অবশ্যই। দিদিও আপনার সঙ্গে কথা বলতে চায়।
আমরা সাড়ে নটার মধ্যে যাব। বলে কর্নেল ঘরে ঢুকে খামটা তার ব্যাগে ঢোকালেন। তারপর ব্যালকনিতে ফিরে এসে বসলেন। আচ্ছা অমরজিৎবাবু, গড়ের জঙ্গলে কিচনি বা জলের প্রেতিনী আছে বলে এখানে গুজব শুনলুম। এ বিষয়ে আপনার কী ধারণা?
অমরজিৎবাবুর মুখে ভয়ের ছাপ ফুটে উঠল। আস্তে বললেন, হ্যাঁ। ওখানে একটা ভয়ঙ্কর প্রাণী বলুন বা ভূতপেত্নি যাই বলুন, আছে সেকথা সত্যি।
আপনি দেখেছেন?
অমরজিৎ চাপা গলায় বললেন, মন্টু পাগল হওয়ার পর কাকে মানসিক হাসপাতালে তাকে ভর্তি করে দিয়ে এসে একদিন খেয়ালবশে গড়ের জঙ্গলে গিয়েছিলুম। মন্টু কি কিচনি দেখে ভয় পেয়ে পাগল হয়ে গেছে? কিচনি বলে সত্যি কি কিছু আছে? মনে এই প্রশ্নটা তোলপাড় করছিল। খুলেই বলছি কর্নেলসায়েব। আমার এখানে একটু বদনাম আছে। ডানপিটে সাহসী জেদি স্বভাবের জন্যও বটে, আবার মারকুটে বলেও বটে। অনেক বদমাশকে আমি এ যাবৎ ধোলাই দিয়েছি। শরীরে ক্ষত্রিয়ের রক্ত বইছে। যাই হোক, গড়ের জঙ্গলে ইচ্ছেমতো ঘোরঘুরি করে বেড়াচ্ছিলুম। হঠাৎ চোখে পড়ল, খানিকটা দূরে একটা ঝোঁপের আড়ালে কী একটা প্রকাণ্ড কালো জন্তু বসে আছে। ভালুক বলে মনে হয়েছিল। কিন্তু না। বিশাল একটা ব্যাঙের মতো প্রাণী। মাথায় লম্বা চুল। দুটো লাল চোখ ঠেলে বেরিয়ে এসেছে। জন্তুটা চলতে শুরু করলে থপ থপ শব্দ হচ্ছিল। তারপর হঠাৎ সেটা অদৃশ্য হয়ে গেল। আমার আর সাহস হল না দাঁড়িয়ে থাকতে। খুঁড়ি মেরে পালিয়ে এলুম। তারপর মাথার জেদ চেপে গিয়েছিল। এখানকার জেলে এবং আদিবাসীদের মধ্যে সাহসী লোক জোগাড় করে অস্ত্রশস্ত্র নিয়ে গড়ের জঙ্গলে পরদিন হাঁকা লাগালুম। হাঁকা বোঝেন তো সার?
হ্যাঁ। শিকারের জন্য জঙ্গল তোলপাড় করা।
ঢাক-ঢোল-শিঙে বাজিয়ে হাঁকা শুরু হল। বিকেল পর্যন্ত তন্নতন্ন খোঁজা হল। কিন্তু কোথায় সেই বিদঘুঁটে জন্তুটা? তার পাত্তাই পেলুম না।
ঠিক আছে। কাল সকালে তা হলে যাচ্ছি। খাওয়ার আয়োজন নয়। দিদিকে বলবেন।
অমরজিৎ উঠে দাঁড়িয়ে বললেন, তাহলে চলি?
আমরা এগিয়ে দেব কি বাড়ি অবদি? ওদিকটায় তো আলো নেই।
অমরজিৎ হাসলেন। টর্চ আছে। তবে কর্নেলসায়েব কি আমার কথা মন দিয়ে শোনেননি। ঝন্টু সিংহের নাম শুনেই গুণ্ডা বদমাস লেজ তুলে পালিয়ে যায়। আচ্ছা, চলি। নমস্কার।
কর্নেল দরজা খুলে ওঁকে বিদায় দিয়ে এসে আস্তে বললেন, করিডরে হীরালালবাবু দাঁড়িয়েছিলেন। আমি দরজা খুলতেই ঘরে ঢুকে গেলেন।
বললুম, তাহলে আমাদের সাবধানে থাকা দরকার।
কর্নেল সে কথায় কান দিলেন না। বললেন, চিঠিগুলো তো তুমি দেখেছ। কী মনে হল?
সবগুলো দেখিনি।
কর্নেল হাসলেন। ঘরের উজ্জ্বল আলোয় পরীক্ষা করে দেখবে চলো। তারপর বলবে।
ঘরে ঢুকে কর্নেল খামটা আমাকে দিলেন। চিঠিগুলো বের করে খুঁটিয়ে দেখলুম। তারপর বললুম, একই ভাষা। একই হাতের লেখা।
আর কিছু?
আর কিছু–মানে, কোনও বৈশিষ্ট্যের কথা বলছেন?
হ্যাঁ।
লোকটা বাঙালি এবং শিক্ষিত।
কর্নেল মিটিমিটি হেসে বললেন, জয়ন্ত। এই চিঠিগুলো একটা চিঠির ফোটো কপি। মূল চিঠিটা লোকটার কাছে আছে। সে প্রতি মাসে একটা করে ফোটো কপি পাঠাচ্ছে।
অবাক হয়ে বললুম, তাই তো। কাগজগুলো মোটা। অক্ষরগুলোও হুবহু একরকম। যেন জেরক্স কপি।
জেরক্স কপির রঙ কালো হয়। এগুলো লাল। এ থেকে বোঝা যায়, লোকটার নিজস্ব প্রিন্টিং মেশিন আছে। সেই মেশিনটা সম্ভবত অর্ডার দিয়ে বিদেশ থেকে আনা হয়েছে। স্পেশাল কোনও মেশিন। যাই হোক, এটা একটা গুরুত্বপূর্ণ পয়েন্ট। জয়ন্ত আমার কাজটা এবার সহজ হয়ে গেল।…
