কর্নেল হাসলেন। আগে কিচনির দর্শন পাই এবং তার ফটো তুলি, তবে তো?
হীরালালবাবু চলে গেলেন। ততক্ষণে আলো জ্বেলে দিয়েছিল রামপ্রসাদ। আমরা চুপচাপ কফি খেতে থাকলুম। একটু পরে কর্নেল আস্তে বললেন, ভদ্রলোকের কথা শুনে কী মনে হল জয়ন্ত?
সত্যি কথাই বললেন। কিছু গোপন করলেন না।
হ্যাঁ। তবে একজন ব্যবসায়ী লোকের পক্ষে এ ধরনের অ্যাডভেঞ্চার কতটা স্বাভাবিক এটাই প্রশ্ন।
ব্যবসায়ী হলে কি কেউ অ্যাডভেঞ্চারার হতে পারে না?
পারে হয় তো। কিন্তু—
কিন্তু কী?
কর্নেল চুপচাপ কফি খাওয়ার পর চুরুট ধরিয়ে বললেন, একটা অস্বাভাবিকতা থেকে যাচ্ছে। ব্যবসায়ী লোক। ব্যবসার কাজে সিংহগড়ে এসেছেন। কাজেই পরিচিত লোকজন আছে। সত্যি কিচনি দেখার জন্য গড়ের জঙ্গলে গেলে হীরালালবাবুর পক্ষে সঙ্গীসাথী নিয়ে যাওয়াই স্বাভাবিক ছিল। একা গিয়েছিলেন কেন? কর্নেল চুরুটের ধোঁয়া ছেড়ে আপন মনে বললেন, নাহ। ব্যাপারটা গোলমেলে মনে হচ্ছে। তাছাড়া ওঁর বয়স। উনি যুবক নন যে এ ধরনের অ্যাডভেঞ্চারে উৎসাহ থাকবে। ওঁর বয়স পঞ্চাশের বেশি বলেই মনে হল। এ বয়সে-নাহ জয়ন্ত। খটকা থেকে যাচ্ছে। তাছাড়া আমরা ওঁকে নেমকার্ড দিলুম। কিন্তু উনি আমাদের ওঁর নেমকার্ড দিলেন না। আজকাল ব্যবসায়ীরা পকেটে নেমকার্ড নিয়ে ঘোরে।
কর্নেলের ব্যাখ্যায় যুক্তি ছিল। তবে এ নিয়ে ওঁর মাথা ঘামানোর অর্থ হয় না। স্পোর্টিং গেঞ্জি এবং প্যান্ট পরা শক্ত সমর্থ গড়নের মানুষ হীরালাল রায়। সঙ্গে লাইসেন্স করা রিভলভারও আছে। রিভলভার–
অ্যাঁ? নিজের চিন্তায় নিজেই অবাক হয়ে মুখ দিয়ে শব্দটা বের করে ফেললুম।
কর্নেল বললেন, কী হল জয়ন্ত?
আচ্ছা কর্নেল, কোনও ব্যবসায়ী রিভলভার রাখতে পারেন, যদি শত্রুর ভয় থাকে তবেই। তাই?
কর্নেল শুধু বললেন, হুঁ।
কিংবা যে ব্যবসায়ী দামি জিনিসের কারবার করেন, সঙ্গে প্রচুর টাকাকড়ি থাকে, তিনি আত্মরক্ষার জন্য–
কথায় বাধা পড়ল। রামপ্রসাদ এসে সেলাম দিয়ে বলল, এক বাবুসাব আসলেন সার। আপনাদের সঙ্গেতে দেখা করবেন।
পাঠিয়ে দাও তাকে। আর একটা বাড়তি কাপপ্লেট দিয়ে যাও। পটে এখনও কফি আছে।
রামপ্রসাদ যাঁকে নিয়ে এল, তিনি অমরজিৎ সিংহ। পরিচ্ছন্ন ধুতি-পাঞ্জাবি পরে এসেছেন। হাতে একটা ছড়িও আছে। নমস্কার করে ব্যালকনিতে একটা চেয়ারে বসলেন তিনি।
কর্নেল বললেন, গড়ের জঙ্গলে বিকেলে বেড়াতে গিয়েছিলাম। সেখানে আপনার ভাইকে দেখলুম।
অমরজিৎ বললেন, ওকে আটকে রাখতে পারি না। বেঁধে রাখলে দিদি বকাবকি করে। ওই গড়ের জঙ্গলে ঢুকে কী দেখে আতঙ্কে পাগল হয়ে গিয়েছিল। এবার প্রাণটা হারাবে। কী করব বলুন?
রামপ্রসাদ একটা কাপপ্লেট দিয়ে গেল। কর্নেল বললেন, জয়ন্ত। দরজাটা ভেতর থেকে বন্ধ করে দিয়ে এস।
দরজা বন্ধ করে দিয়ে এসে বসলুম। কর্নেল অমরজিৎবাবুকে কফি তৈরি করে দিয়ে বললেন, আপনি কীসব ঘটনার কথা বলবেন বলেছিলেন। এবার স্বচ্ছন্দে বলতে পারেন।
অমরজিত্যাবু কফি খেতে-খেতে বললেন, মন্টু পাগল হওয়ার পর থেকে ন’মাসে মোট ন’খানা উড়ো চিঠি পেয়েছি। একই কথা। একই কাগজে লাল কালিতে লেখা। সঙ্গে এনেছি। দেখাচ্ছি। মাথামুণ্ডু কিছু বুঝতে পারি না।
বলে পাঞ্জাবির ভেতর পকেট থেকে একটা খাম বের করলেন উনি। খামটা হলুদ রঙের। কর্নেলের হাতে দিয়ে আস্তে বললেন, চিঠিগুলো প্রতি ইংরেজি মাসের মাঝামাঝি ভোরবেলা গেটের ভেতর ভাঁজ করে কেউ ফেলে দিয়ে যায়। দিদিরি পরামর্শে এ নিয়ে পুলিশের কাছে যাইনি। পড়ে দেখলেই বুঝবেন।
কর্নেল খাম থেকে ভাঁজ করা চিঠিগুলো বের করলেন। চোখ বুলিয়ে আমাকে একটা চিঠি দিলেন দেখলুম, সম্বোধনহীন চিঠিতে আঁকাবাঁকা বড় বড় অক্ষরে লেখা আছে–
দেবতার অভিশাপ থেকে বাঁচতে হলে শীঘ্র তাকে
উদ্ধার করে গড়ের জঙ্গলে ঈশান কোণে
শিমুলতলায় গোপনে রেখে এস। রাখার পর আর
পিছনে তাকিও না। তাহলে আবার অভিশাপ
লাগবে। সাবধান। এই কথা যেন কেউ জানতে
না পারে। জানালে অনিবার্য মৃত্যু।
কর্নেল ন’খানা চিঠিতে চোখ বুলিয়ে ভাঁজ করে খামে ভরে বললেন, আপনাদের গৃহদেবতা কী?
অমরজিৎ বললেন, শিব। আমাদের বাড়িতে ছোট একটা মন্দিরে শিবলিঙ্গ আছে। দিদি তার পুজোআচ্চা নিজেই করে। আগে একজন ব্রাহ্মণ পুজারি ছিলেন। অর্থাভাবে তাকে বিদায় দিতে হয়েছিল। আমরা ক্ষত্রিয়। কিন্তু দিদির মতে, ক্ষত্রিয়েরও পুজোর অধিকার আছে। যাই হোক, এসব নিয়ে আমার মাথাব্যথা নেই। কিন্তু চিঠিগুলো অদ্ভুত। কোন দেবতাকে উদ্ধার করতে হবে বা কীভাবে করতে হবে, জানি। তিনি কোথায় আছেন, তাও জানি না।
কর্নেল বললেন, আপনি বলছিলেন, আপনার ঠাকুরদার বাবা নাকি গৃহদেবতার অলঙ্কার বিক্রি করার ফলে অভিশাপ লেহেছিল। কিন্তু শিবলিঙ্গে তো রত্ন বা অলঙ্কার পরানো হয় না।
অমরজিৎ গম্ভীর মুখে বললেন, ঠাকুরমার মুখে শোনা কথা। তবে তখন আমি নিতান্ত বালক। তাই এ প্রশ্ন মাথায় আসেনি। পরে এসেছিল। তারপর এই চিঠি পাওয়ার পর দিদির সঙ্গে আলোচনা করেছি। দিদি বলেন, জন্মাবধি আমরা বাড়ির মন্দিরে শিবলিঙ্গ দেখে আসছি।
চোখ বুজে সাদা দাড়িতে হাত বুলিয়ে বললেন, আচ্ছা, এমন তো হতে পারে। আপনার ঠাকুরদার বাবার মৃত্যুর আগে ওই মন্দিরে অন্য কোনও বিগ্রহ ছিল। সেটা হঠাৎ হারিয়ে গেলে আপনাদের ঠাকুরদা শিবলিঙ্গ প্রতিষ্ঠা করেছিলেন।
